গাইবান্ধায় ৮ বছর পর বন্দি জীবন থেকে মুক্তি পেল মিনতি

Gaibandha_Photo_Minoty_গাইবান্ধা থেকে আঃ খালেক মন্ডল স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে খবর পেয়ে গাইবান্ধার বোনারপাড়া থেকে পায়ে বেড়ি দেওয়া অবস্থায় মিনতি রানী (২২) নামের এক যুবতীকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। পুলিশ জানায়, আট বছর ধরে পায়ে বেড়ি দিয়ে ওই মেয়েকে বেঁধে রাখা হয়েছে এমন খবর পাওয়ার পর গতকাল রবিবার মিনতিকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁকে উদ্ধারের পর বেরি খুলে গাইবান্ধা আধুনিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সম্প্রতি গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার বোনারপাড়া বাজার সংলগ্ন শিমুল তাইড় মাস্টারপাড়া গ্রামে গিয়ে স্থানীয় সাংবাদিকরা মিনতি রানীর (২২) বন্দিদশার করুণ চিত্র দেখতে পান। স্থানীয় সাংবাদিকরা বলেন, দীর্ঘ আট বছর ধরে তাঁর পায়ে শিকল দিয়ে রেখেছে তাঁর পরিবার। দুই পায়ের গোড়ালী থেকে উপরের অংশে লোহার ঘর্ষণে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় জখমের। বিষয়টি তারা স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের কানে দিলে তাঁকে উদ্ধারের ব্যবস্থা করা হয়। পরিবারের সদস্যরা জানায়, সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় মেয়েটির ওপর অশুভ আত্মার কুদৃষ্টি পড়ায় সে হঠাৎ একদিন অসুস্থ হয়ে পড়েন। দরিদ্র ও অশিক্ষিত মা-বাবা, চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে কবিরাজদের শরণাপন্ন হয়ে তাবিজ-কবজ, পানিপড়া আর ঝাড়ফুকের মাধ্যমে তাঁকে ভালো করার চেষ্টা চালান। চিকিৎসার অভাবে মেয়েটি ধীরে ধীরে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। যখন তখন দৌড়ে বাড়ির বাইরে চলে যান সে । যার ফলে তাঁকে নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে পরিবারটি। মিনতির মা জয়ন্তী রাণী জানান, মেয়েটির সম্ভ্রম রক্ষার কথা বিবেচনা করে তাঁর পায়ে ডান্ডাবেড়ির মতো করে শেকল বেঁধে দেওয়া হয়। এভাবেই কেটে যায় আট বছর। বাবা শ্রী সিনধিয়া রাম জানান, দুই ছেলে, দুই মেয়ে নিয়ে তাঁদের স্বামী স্ত্রীর সংসার। মিনতি সবার ছোট। বোনারপাড়া বাজারের ফুটপাতে হলুদ বিক্রি করে এত বড় সংসার টানা কঠিন কাজ। মিনতির চিকিৎসা করতে গিয়ে সব হারিয়ে এখন দেনায় জর্জরিত হয়ে পথে বসার জোগার তাঁর। মিনতির প্রতিবেশী ও সহপাঠি রুবেল মিয়া জানান, মিনতির সঠিক চিকিৎসা করা হলে হয়তো ভালো হয়ে যাবে। আবার হয়তো স্কুলে গিয়ে পড়াশোনা করতে পারবে। পায়ের বেড়ি খোলার পর মুক্তির শ্বাস ফেলে মিনতি মাথা নাড়তে নাড়তে বলেন, ‘আমি কি এখন ইচ্ছামতো হাঁটতে পারব। নিজের মতো চলতে পারব। আমি কি আবার স্কুলে গিয়ে পড়াশোনা করতে পারব।’ বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রিক্তু প্রসাদ বলেন, শুধু মিনতি রাণী নয় গ্রামে-গঞ্জে ভূত-প্রেত-কালীর আছরের নামে একটি চক্র অপ-চিকিৎসা করে আক্রান্তদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তিনি বলেন আর কারো যাতে মিনতি রানীর মতো পরিণতি না হয়, সে জন্য সমাজের মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। সাঘাটা উপজেলা নির্বাহী অফিসার আব্দুল আউয়াল জানালেন, বিষয়টি খুবই অমানবিক। ঘটনাটি জানার পর পরই সাঘাটা থানার ওসির সাথে কথা বলে তাঁকে উদ্ধারের যাবতীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হয়। তাঁর চিকিৎসার জন্য তাকে গাইবান্ধা আধুনিক সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। গাইবান্ধা জেলা সিভিল সার্জন ডা. আহাদ আলী বলেন, সঠিক ভাবে চিকিৎসা চালিয়ে গেলে মেয়েটিকে সুস্থ করা সম্ভব। তাঁর চিকিৎসায় কোনো ব্যঘাত হবে না। হাসপাতাল থেকে যা যা করা দরকার মিনতির জন্য তাই করা হবে। তবে দীর্ঘদিন তাঁর পায়ে বেড়ি দিয়ে রাখার কারণে সে মানসিকভাবে বেশ আঘাতপ্রাপ্ত। তাঁকে সুস্থ করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন হবে।