খুলনাসহ উপকূলীয় এলাকায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সঙ্কট : খাবার পানির জন্য হাহাকার

khulnaখুলনা থেকে ডাঃ আওরঙ্গজেব কামাল ঃ নিরাপদ ও সুপেয় পানির জন্য হাহাকার চলছে খুলনাসহ উপকূলীয় এলাকায়। চৈত্র মাসের কাঠফাটা গরমের মধ্যে এ অঞ্চলের প্রায় ১০ লাখ মানুষ বর্তমানে তীব্র পানি সঙ্কটে দিননিপাত করছেন। সুপেয় পানির সন্ধানে প্রতিদিনই দূর দূরান্তে ছুটতে হচ্ছে তাদের। বর্তমানে বৃষ্টি হওয়ায় কিছুটা কষ্ট লাঘব হয়েছে জনসাধারনের। এ পরিস্থিতিতে বৃহৎ এ জনগোষ্ঠীর বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট নিরসনে অবিলম্বে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন খুলনার সচেতন মহল। অনুসন্ধানে জানা গেছে, গ্রীষ্ম মৌসুম শুরুর আগেই উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে খাবার পানির তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। জীবনদায়ী পানি এখানে দু®প্রাপ্য। পুকুরে, ভূ-গর্ভে, টিউবওয়েলে পানি নেই। সব প্রাকৃতিক উৎসেই পানির টান। এ যেন এক মহাবিপদের অশনি সংকেত! যে সব এলাকায় পানি রয়েছে তাও আবার অতি লবণাক্ত, কোনোভাবেই খাবার উপযোগী নয়। খুলনার দাকোপ, পাইকগাছা, কয়রা উপজেলা, বাগেরহাটের রামপাল, মংলা, মোড়েলগঞ্জ, শরণখোলা উপজেলা, সাতক্ষীরার আশাশুনি, শ্যামনগর, কালিগঞ্জ উপজেলার ভুক্তভোগীরা জানান, সুপেয় পানির জন্য তারা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছেন। সরকারের সংশিষ্ট সংস্থার কাছে চিঠিও দিয়েছেন। এলাকার নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা পানিসম্পদ সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে ডি.ও লেটারও পাঠিয়েছেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। এসব অঞ্চলে সরেজমিন ঘুরে ও এলাকার লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানের ভ্যাপসা গরম আর সেই সঙ্গে কাঠফাটা রোদে গ্রামাঞ্চলের খাবার, রান্নাবান্না ও গোসল করার একমাত্র পানির উৎস পুকুর, খালগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সঙ্কটে পড়েছেন তারা। সরকারি ও বেসরকারি ভাবেও সিডর-আইলা দুর্গত এলাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ না থাকায় এখন নর্দমা ও নদীর লবণাক্ত পানিই তাদের একমাত্র ভরসা। এ পানি পান করায় এলাকায় ঘরে ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে ডায়রিয়া, আমাশয়, পেটের পীড়াসহ পানিবাহিত নানা রোগ। সিডর-আইলার তান্ডবে বিধ্বস্ত এলাকাসহ উপজেলার বিভিন্ন স্থানের অধিকাংশ টিউবওয়েল ইতিমধ্যেই নষ্ট এবং অনেক টিউবওয়েলে এখনও পানি ওঠে না। যেসব এলাকার অগভীর নলকূপগুলোতে পানি উঠছে সেসব এলাকায় দেখা গেছে কাকডাকা ভোর থেকে শুরু করে মধ্যরাত পর্যন্ত পানি সংগ্রহের প্রতিযোগিতা। কয়রা উপজেলার এনজিও কর্মী মো. আব্দুলাহ জানান, এক কলস সুপেয় পানির জন্য ২-৩ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে হয়। তিনি মনে করেন, এ এলাকায় পানি সঙ্কট দূর করতে জরুরিভাবে সানফিল্টার ও টিউবওয়েল বসানোর পাশাপাশি পুরনো পুকুরগুলোর সংস্কার প্রয়োজন। দাকোপ উপজেলার সুতারখালী ইউপি চেয়ারম্যান গাজী আশরাফ হোসেন জানান,“ ১২টি সানফিল্টারের বরাদ্দ পেয়েছি, যা প্রয়োজনের তুলনায় অতি সামান্য। এগুলো দিয়ে ৯ হাজার পরিবারের পানির অভাব দূর করা সম্ভব নয়। দাকোপ উপজেলা স্বাস্থ্য উপ-প্রকৌশলী মুঞ্জুরুল আলম বলেন, “আইলার পর সুতারখালী ইউনিয়নে ৫০টি রেইনহারভেস্টিং ও ৫০টি সানফিল্টার স্থাপন করেছি, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য। তবে পর্যাপ্ত সানফিল্টার ও ট্যাংকি সরবরাহের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। শরণখোলা উপজেলার স্কুল শিক্ষক মো. সেলিম বলেন, “বৃষ্টি না হওয়ার ও পানিতে লবণাক্ততা অধিক মাত্রায় বেড়ে যাওয়ায় সুন্দরবনের কোলঘেঁষা এ অঞ্চলের শিশু, নারী, বৃদ্ধ, কিশোরীসহ কয়েক লাখ মানুষ বিশুদ্ধ পানীয় জলের অভাবে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন। এমনকি গোসল, রান্না বা কোনো কিছু ধোয়ার জন্যও পানি নেই। আর খাবার বিশুদ্ধ পানির কথা তো অনেক দূরে। সারা অঞ্চল জুড়ে এখন পানির হাহাকার চলছে। সাধারণত ফেব্র“য়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত খুলনার জেলার দাকোপ, কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলা, বাগেরহাট জেলার মংলা ও শরণখোলা উপজেলা এবং সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলায় তীব্র পানির সঙ্কট দেখা দেয়। উপকূলের এসব অঞ্চলে সরকার ও কিছু এনজিও খাবার পানির ব্যবস্থা করলেও চাহিদার তুলনায় তা অনেক কম। ফলে অনেক মানুষ নিরুপায় হয়ে নদীর নোনা জল পান করছে। এছাড়া অনেক এলাকায় বিভিন্ন দামে সুপেয় পানি বিক্রি হচ্ছে। খুলনা নাগরিক ফোরামের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট ফিরোজ আহমেদ জানান, ভৌগোলিকভাবে পলিগঠিত উপকূলীয় অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় খুলনার ভূগর্ভস্থ পানির পকেটগুলো বিচ্ছিন্ন ও ভিন্ন ভিন্ন লেয়ারে রয়েছে। প্রতিটি পকেটে পানির পরিমাণ এতোই কম যে ভিন্ন ভিন্ন এলাকায় একই লেয়ারে ও একই পকেট থেকে পানি পাওয়া যায় না। এ অঞ্চলের দক্ষিণ থেকে উত্তরাঞ্চলে পানির লেয়ার অপেক্ষাকৃত গভীর এবং পানির প্রাপ্যতার হার প্রতি কিলোমিটারে ৩৫ শতাংশ কম। এছাড়া খুলনার ৪৩ ভাগ এলাকা মাঝারি থেকে চরম মাত্রায় লবণাক্ত এবং সহনশীলতার তুলনায় ৩ থেকে ১০ গুণ বেশি আর্সেনিক ও আয়রন আক্রান্ত বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, “দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষদের জরুরিভাবে সুপেয় পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। উপকূলীয় এলাকা ও শহর এলাকায় পানির সঙ্কট নিরসনে পুকুর-জলাশয় সংরক্ষণ এবং দখলমুক্ত করতে হবে। বৃষ্টির পানি সংগ্রহের জন্য আধুনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বেলার খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল জানান, সুপেয় পানির জন্মগত অধিকার ধীরে ধীরে পানি বাণিজ্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে। একটি বড় ধরনের বিপর্যয় এড়াতে পানির প্রতি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য সবাইকে একটি প্যাটফর্মে আসা উচিত।