সারা দেশে দুর্যোগ দুর্ভোগ

1_80585বিডি রিপোর্ট 24 ডটকম : সারা দেশে শুক্রবার থেকে রোববার পর্যন্ত টানা বৃষ্টির কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরে জলাবদ্ধতার কারণে দুর্ভোগ পোহাতে হয় নাগরিকদের। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ করে দেয়া হয়। এছাড়া কোথাও কোথাও নদীর পানি বৃদ্ধি এবং পাহাড়ি ঢলে গ্রামীণ জনপদ তলিয়ে গেছে। এতে ক্ষতি হয়েছে বসতবাড়ি ও ফসলের বীজতলার। ভেসে গেছে ঘেরের মাছ। এদিকে বর্ষণে সেতু দুর্বল হওয়ায় প্রায় ৬ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর চট্টগ্রামের সঙ্গে ঢাকা ও সিলেটসহ সারা দেশের ট্রেন চলাচল শুরু হয়েছে। বন্দরের বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাস বন্ধ রয়েছে। এছাড়া নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে প্রায় ৮০০ পরিবারকে সরিয়ে নিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। এদিকে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক আবহাওয়া অধিদফতরের বরাদ দিয়ে জানান, আজ দুপুরের মধ্যে ঢাকাসহ সাত বিভাগে ভারি বর্ষণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেইসঙ্গে ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণের কারণে চট্টগ্রাম ও সিলেটের পাহাড়ি এলাকায় ভূমি ধসের সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সঙ্কেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। রাজধানীতে শনিবার রাত থেকে থেমে থেমে মাঝারি থেকে ভারি বর্ষণ হয়েছে। এতে রাজধানীর নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এতে অফিসগামী লোকজনকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। ব্যুরো, অফিস ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর-

চট্টগ্রাম : টানা বর্ষণে বিপর্যয় নেমে এসেছে চট্টগ্রামে। নগরীর স্কুলগুলোতে পরীক্ষা বন্ধ। রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ির সঙ্গে চট্টগ্রামের সড়ক যোগাযোগে নেমে এসেছে অচলাবস্থা। চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পণ্য খালাস বন্ধ রাখা হয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে (চসিক) খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম। এরই মধ্যে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন পাহাড়ের নিচে বসবাসরত প্রায় ৮০০ পরিবারকে নিরাপদে সরিয়ে নিয়েছে।

বন্দর নগরী চট্টগ্রামে টানা চার দিন ভারি ও মাঝারি বর্ষণ চলছে। আবহাওয়া অফিস তিন দিনে প্রায় ৭০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে। আরও ভারি বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে বলে এরই মধ্যে আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে। এতে নগরবাসীর সংশয় আরও বেড়েছে। এদিকে প্রায় ছয় ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর রোববার বিকাল ৫টা ৫ মিনিট থেকে চট্টগ্রামের সঙ্গে ঢাকা ও সিলেটসহ সারা দেশের ট্রেন চলাচল শুরু হয়েছে। সকালে ভাটিয়ারিতে রেললাইনের ৩৪ নম্বর সেতু দুর্বল হয়ে যাওয়ায় ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পণ্যভর্তি অর্ধশত জাহাজ দাঁড়িয়ে আছে। বন্দর কন্ট্রোল থেকে জানা গেছে, সাগরের বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাস বন্ধ রয়েছে। সকাল থেকেই নগরীর অধিকাংশ নিচু এলাকায় বন্ধ রাখা হয়েছে বিদ্যুৎ সরবরাহ। পিডিবির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ ইকবাল করিম জানান, যেসব বাড়িঘরে পানি ঢুকেছে, নিরাপত্তার কারণে সেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে। নগরীর অনেক এলাকার বাসাবাড়ির গ্যাসলাইনে ঢুকে গেছে পানি। নগরীর সিডিএ, মুরাদপুর, চকবাজার এলাকার অনেক একতলা বাড়ি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বর্ষণে পাহাড় ধসের আশঙ্কায় রয়েছে জেলা প্রশাসন। দুই দিন ধরে জেলা প্রশাসনের তিন ম্যাজিস্ট্রেট তৎপর রয়েছেন পাহাড়ের নিচ থেকে পরিবারগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরানোর কাজে। চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এসএম আবদুল কাদেরের নেতৃত্বে ১৫টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে প্রায় ৮০০ পরিবারকে সরানো হয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগরীতে কয়েকশ’ ভোগ্যপণ্যের গুদামে পানি ছুঁই ছুঁই করছে। এসব গুদামে রমজান উপলক্ষে আমদানি করা হাজার কোটি টাকার ভোগ্যপণ্য মজুদ আছে। বর্ষণ অব্যাহত থাকায় পণ্য নষ্টের আশঙ্কা করছেন আমদানিকারকরা। টানা বৃষ্টি সামাল দিতে গিয়ে দুই দিন ধরে অনেকটা স্থবির ব্যবসাপাড়া খাতুনগঞ্জ ও চাক্তাই।

খুলনা : সড়ক, ফুটপাথ ও ড্রেন বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে একাকার হয়ে গেছে। রোববার ভোরে টানা ৩ ঘণ্টার বৃষ্টিপাতে এ অবস্থার সৃষ্টি হয় শিল্প ও বন্দর নগরী খুলনায়। এতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে নগরবাসী। নগরীর অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যায়।

সিলেট : প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এরই মধ্যে আলীরগাঁও, পূর্ব জাফলং, পশ্চিম জাফলং ও রুস্তুমপুর ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

বরিশাল : কীর্তনখোলা নদীতে পানি বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই অবস্থায় রয়েছে। এ কারণে বরিশাল নগরীর নদীর তীরসংলগ্ন নিচু এলাকায় জলবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি চলছে অবিরাম বৃষ্টি। কখনও প্রবল, কখনও মাঝারি।

সিরাজগঞ্জ : সিরাজগঞ্জের রায়পুর রেলস্টেশনের সনি্নকটে মালবাহী একটি ট্রেনের দুটি বগি লাইনচ্যুত হয়েছে। এ কারণে সিরাজগঞ্জের সঙ্গে ঢাকা ও ঈশ্বরদীর ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।

কুষ্টিয়া : আষাঢ়ের টানা বর্ষণে কুষ্টিয়ার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শুক্রবার বিকাল থেকে শুরু হওয়া মুষলধারে বৃষ্টি রোববার পর্যন্ত চলে।

খাগড়াছড়ি : প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে খাগড়াছড়ি সদর উপজেলায় পাঁচটি ও দীঘিনালা উপজেলার মেরুং ইউনিয়নে অন্তত ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় দু’হাজার পরিবার। গৃহহীন দুই শতাধিক পরিবার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছে। বেইলি ব্রিজ তলিয়ে যাওয়ায় দীঘিনালার সঙ্গে রাঙামাটির লংগদু উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

বাগেরহাট : তিন দিনের টানা বর্ষণে বাগেরহাটের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় বসতবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়েছে। রোববার সকালে শহরের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সড়কে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এদিকে বৃষ্টিপাতের কারণে মংলা বন্দরে জাহাজে পণ্য বোঝাই ও খালাসের কাজ ব্যাহত হচ্ছে বলে জানান বন্দর কর্তৃপক্ষ।

ঝালকাঠি : টানা বর্ষণে ঝালকাঠির ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এসব গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এছাড়া বিষখালী নদীর জয়খালী, চিংড়াখালী, হেতালবুনিয়া ও মশাবুনিয়া এলাকায় ভাঙন দেখা দেয়ায় মানুষ আতঙ্কে রয়েছে।

টঙ্গী : টানা বর্ষণে টঙ্গীতে অনেক ঘরবাড়ি, শিক্ষা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা ও রাস্তাঘাট ডুবে গেছে। এতে প্রায় দুই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

নোয়াখালী : শুক্রবার থেকে বিরামহীন বর্ষণে নোয়াখালীর নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়েছে। জেলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হাতিয়া ও কোম্পানীগঞ্জ বেড়িবাঁধ এলাকায় অনেক পরিবার পানিবন্দি হয়েছে বলে জানা যায়।

কক্সবাজার : টানা বর্ষণে কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ার নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গেছে। ভেসে গেছে ফসলের উঠতি বীজতলা, ভেঙে গেছে অসংখ্য চিংড়ি ঘের, গৃহহীন হয়ে পড়েছে বেড়িবাঁধের বাইরে থাকা কয়েকশ’ পরিবার।