হুমকির মুখে বঙ্গবন্ধুসেতু : টাঙ্গাইলের বালু দস্যুরা বেপরোয়া

Tangail-Bongobondu brige-2মু.জোবায়েদ মল্লিক বুলবুল, টাঙ্গাইল :

দেশের বৃহত্তর ও স্পর্শকাতর স্থাপনা বঙ্গবন্ধুসেতুর পূর্বপাড় টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার সিরাজকান্দি থেকে গোবিন্দাসী পর্যন্ত ৮টি স্থানে এবং বঙ্গবন্ধুসেতুর সন্নিকটে কালিহাতী উপজেলার বিন্নোদ লহরি, গোহালিয়াবাড়ী এলাকায় ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করায় অসময়ে যমুনায় ভয়াবহ ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে ভাঙ্গনের তীব্রতা ব্যাপক আকার ধারন করছে। ইতোমধ্যে ভাঙ্গনে ভূঞাপুরের গাবসারা ইউনিয়নের ৮টি গ্রামের প্রায় ৫০০ পরিবার গৃহহীন ও ১০০একর ফসলি জমি যমুনার পেটে বিলীন হয়ে গেছে।

অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে ঘরবাড়ি ভেঙ্গে ইতোমধ্যে অনেকে সহায়সম্বলহীন হয়ে পড়েছে। সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। এসব বালুদস্যুরা রাতারাতি হয়েছে কোটি কোটি টাকার মালিক। ইজারা না নিয়ে প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই চলছে এ বালু ব্যবসা। এসব বালু ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ নেয়াকে কেন্দ্র করে মাঝে মধ্যেই সরকারদলীয় লোকজনের মধ্যে ঘটছে হামলা মামলার ঘটনা। বিবিএ ও সেতু রক্ষণাবেক্ষণকারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের উর্ধতন কর্মকর্তারা ব্যক্তি স্বার্থ হাসিলে বেশি ব্যস্ত থাকায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের।

জানাগেছে, সরকারি হিসেবে টাঙ্গাইলে মোট ৪৩টি বালু মহাল রয়েছে। এরমধ্যে মাত্র ১২টি জেলা প্রশাসনের ইজারা রয়েছে। ৩১টি বালুমহলের কোন ইজারা নেই। এসব বালু মহাল থেকে আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতা প্রভাব খাটিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। দরপত্রে কাঙ্খিত অর্থ না আসায় ১২টি বালুমহল ইজারা দেয়া হয়নি। উচ্চ আদালতে জমি সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে রিট মামলা থাকায় স্থিতাবস্থা দেয়া হয়েছে ১২টি বালু মহাল। অপর ৫টি বালুমহলে স্যালোমেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করায় নদীর পার ভেঙ্গে যাওয়ায় ইজারা বন্ধ রাখা হয়েছে। জেলার হাতিয়া, আনালিয়াবাড়ি, বড় বাসালিয়া, শালিনা, পাছবেথইর, ছিলিমপুর, বাবুপুরা, খল্লদবাড়ি, কৃঞ্চপুর, বেনুকুশা, মেঘাখালি, ফটিকজানী, নথখোলা, একঢালা, পংবরটিয়া, করটিয়া, বেরবাড়ি, স্বল্পলাড়–গ্রাম, খানুরবাড়ি, কোনাবাড়ি, দোভায়া, গোপালগঞ্জ-দোভায়া, পলশিয়া, পাথাইলকান্দি, বাইতান, চরগাবসারা, মহেলা, পৌলী, এলেঙ্গা, হাকিমপুর, বাঁশি, ভুক্তা, বড়রিয়া, উত্তর তারটিয়া, বাউশাইদ, নন্দিপাড়া, তারাবাড়ি, জাঙ্গালীয়া এসব বালু মহল থেকে অবৈধভাবে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।

সরেজমিনে জানাগেছে, বঙ্গবন্ধুসেতুর পূর্বপাড়ে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার সিরাজকান্দি থেকে গোবিন্দাসী পর্যন্ত ৮টি পৃথক স্থানে স্থানীয় প্রভাবশালী আ. হাই, মো. ফিরোজ, আ. সামাদ, মাসুদ মেম্বার, হাবিব মাষ্টার, ফেরদৌস প্রামাণিক, মো. দুলাল চকদার ও আ. মতিন সরকার এবং কালিহাতী উপজেলার সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান হযরত আলী তালুকদার, প্রভাবশালী হান্নান হাজী, ছোট আ. হাই আকন্দ ও লিয়াকত আলী তালুকদারের নেতৃত্বে একাধিক স্পটে পৃথক ১০টি ঘাট স্থাপন করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে। বিবিএ ও সেতু রক্ষণাবেক্ষণকারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় উর্ধতন কর্মকর্তারা সেতু ও সেতু রক্ষাকারি বেরীবাঁধ সংলগ্ন এলাকা থেকে বালু উত্তোলন ও বালু সরবরাহ করার রাস্তা(ডাব) তৈরি করার মৌখিক অনুমতি দেন বলে বালু ব্যবসায়ীরা দাবি করেন। ওইসব বালু ঘাট থেকে প্রতিদিন ৭-৮ শ’ ট্রাকে বালু সরবরাহ করা হচ্ছে। ঘাটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অনেক সময় নিজেদের মধ্যে হামলা-মামলার ঘটনাও ঘটছে। এসব মহাল থেকে উত্তোলন করা বালু বিক্রি হচ্ছে রাজধানী ঢাকা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, জামালপুর, মানিকগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জসহ আশপাশের কয়েকটি জেলায়। সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতিট্রাক বালুতে লাভ হয় কমপক্ষে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিমাসে বালু মহাল থেকে তাদের আয় হয় কোটি টাকা। এখান থেকে সরকারকে রাজস্ব দিতে হয় না কানাকড়িও। অভিযোগ রয়েছে প্রশাসন, আওয়ামী লীগ নেতা ও দুই একজন এমপিকে নজরানা দিয়ে তারা হাতিয়ে নিচ্ছে অবৈধ বালু ব্যবসার কোটি কোটি টাকা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একজন বালু ব্যবসায়ী জানান, কালিহাতী উপজেলার বালু ঘাট থেকে আদায় করা চাঁদা ১ কোটি ২০ লাখ টাকা বর্তমানে হান্নান হাজীর কাছে জমা রাখা হয়েছে। ওই টাকা বিবিএ’র উপ-পরিচালক(ডিডি) মো. আশরাফ হোসেন খান সহ সংশ্লিষ্টদের মাঝে বন্টন করে দেয়া হবে।

অবৈধভাবে দিন-রাত বালু উত্তোলন করায় যমুনার ভয়াবহ ভাঙনে শুধুমাত্র ভূঞাপুর উপজেলার গাবসারা ইউনিয়নের চরবিহারী গ্রামের ৮০ টি, জুংগীপুর-রুলীপাড়া ১৫০, বেলটিয়া পাড়া ৫০, চাঁনগঞ্জ ৭৫, রেহাই গাবসারা ৭৫, রামপুর ৩০ এবং বিশ্বনাথপুর গ্রামের ২৫ টি পরিবার গৃহহীন ও ১০০ একর ফসলি জমি যমুনার গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। প্রতিদিনই ভূঞাপুর ও কালিহাতী উপজেলায় একের পর এক নতুন পরিবার গৃহহীন ও ফসলি জমি নদীর পেটে হারিয়ে যাচ্ছে। ভাঙ্গনের তীব্রতা এতোই বেশি যে লোকজন ঘর-বাড়ি সরানোরও সময় পাচ্ছেনা। অসময়ে এমন ভাঙ্গনে দিশেহারা হয়ে পড়েছে তারা। যমুনা নদীর তীরবর্তী নদী ভাঙ্গনকবলিত এলাকার লোকজন সম্প্রতি বিক্ষোভ মিছিল করে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেছে। ভাঙ্গনের শিকার এসব এলাকার লোকজন বঙ্গবন্ধুসেতু রক্ষা গাইড বাধেঁর পাদদেশে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন যাপন করছে। কেউ কেউ আতœীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। বিবিএ ও সেতু রক্ষণাবেক্ষণকারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় উর্ধতন কর্মকর্তাদের উদাসীনতায় সেতু সংলগ্ন গাইড বাধে ইতোমধ্যে ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। এতে দেশের বৃহত্তর স্থাপনা বঙ্গবন্ধুসেতু হুমকির মুখে পড়েছে। এছাড়া জেলার বিভিন্ন নদী থেকে বালু উত্তোলন করায় নদী পাড়ের পরিবারগুলো ভাঙ্গন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। অথচ এখন পর্যন্ত সরকারের তরফ থেকে কোন সাহায্যের হাত বাড়ানো হয়নি।

এ বিষয়ে টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. শোয়াইব আহমাদ জানান, মামলা সংক্রান্ত জটিলতায় অনেক বালু মহাল ইজারা দেয়া সম্ভব হয়নি। বালু উত্তোলনের ফলে নদী পাড়ের লোকজনের ফসলী জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এসব কারণেও কিছু কিছু মহাল ইজারা দেয়া হয়নি। তবে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।