এসএসসিতে বেশি নম্বর দেয়ার নির্দেশনা ছিল

26041_f2বিডি রিপোর্ট 24 ডটকম : সদ্যপ্রকাশিত এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার উত্তরপত্রে বেশি নম্বর দিতে লিখিত নির্দেশ দেয়া হয়েছিল পরীক্ষকদের। প্রধান পরীক্ষক ও পরীক্ষকদের আলাদাভাবে  বোর্ডের পক্ষ থেকে এ নির্দেশনা দেয়া হয়। কোন শিক্ষার্থী ২৮ নম্বর পেলেও তাকে পাস নম্বর ৩৩ দিতে বলা হয়। এছাড়া এ+ ও এ গ্রেডসহ বিভিন্ন গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রে উত্তরপত্র সহানুভূতির সঙ্গে মূল্যায়ন করতে বলা হয়। গত ১৭ই মে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়। এ পরীক্ষায় রেকর্ড সংখ্যক শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পায় এবং পাস করে। এ নিয়ে সমালোচনা শুরু হয় চারদিকে। পরীক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের লিখিত নির্দেশ দেয়া হয়েছিল বেশি নম্বর দিতে। এছাড়া মৌখিকভাবেও দেয়া হয় নির্দেশ। কোন পরীক্ষার্থী ফেল করলে কেন ফেল করলো তার জবাবদিহির জন্যও তৈরি থাকতে বলা হয়। পরীক্ষকদের বলা হয়- কোন শিক্ষার্থী ১০০ নম্বরের মধ্যে ২৮ পেলেই তাকে পাস নম্বর ৩৩ দিতে হবে। মৌখিকভাবে নির্দেশ দেয়া হয় কোন শিক্ষার্থী ২৫ বা ২৬ পেলেও তাকে ২৮ দিয়ে পাস করিয়ে দিতে।  এছাড়া কোন কোর্সে ৩৮ পেলে ৪০, ৪৮ পেলে ৫০, ৫৮ পেলে ৬০, ৬৮ পেলে ৭০ এবং ৭৮ পেলে ৮০ করতে সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করতে বলা হয়। গত ১৭ই মে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়। এবার ৮টি সাধারণ বোর্ডসহ ১০টি বোর্ড মোট ১৪ লাখ ২৬ হাজার ৯২৩ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে পাস করে ১৩ লাখ ৩ হাজার ৩৩১ জন। পাসের হার ৯১.৩৪ ভাগ। যা গত বছরের চেয়ে ২.৩১ ভাগ বেশি। গত বছর পাসের হার ছিল ৮৯.০৩ ভাগ। এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে রেকর্ড সংখ্যক ১ লাখ ৪২ হাজার ২৭৬ জন। গত বারের চেয়ে এবার জিপিএ ৫-এর সংখ্যা ৫১ হাজার ৫০ জন বেশি। ২০১৩ সালে জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৯১ হাজার ২২৬ জন শিক্ষার্থী। এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন করতে পরীক্ষকদের যে সব নির্দেশনা দেয়া হয়েছে মধ্যে ৮টি বিষয়ের নির্দেশনা মানবজমিন-এর কাছে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে বাংলা প্রথম ও দ্বিতীয় পত্র, ইংরেজি প্রথম এবং দ্বিতীয়পত্র, গণিত, পদার্থ, রসায়ন, সাধারণ বিজ্ঞান। ইংরেজি প্রথম পত্রে মূল্যায়নে ২১টি নির্দেশনা দেয়া হয়। এর মধ্যে ১১ নম্বরের (ডি) নির্দেশনায় পরীক্ষার্থী কোন কোর্সে ৩৮ পেলে ৪০, ৪৮ পেলে ৫০, ৫৮ পেলে ৬০, ৬৮ পেলে ৭০ এবং ৭৮ পেলে ৮০ করতে সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করতে বলা হয়। ১৮ নম্বর নির্দেশনায় কোন পরীক্ষার্থী কোন কোর্সে ৩২, ৩৯, ৪৯, ৫৯, ৬৯ ও ৭৯ পেলে ওই উত্তরপত্র পুনরায় পরীক্ষা করে নম্বর বাড়িয়ে দিতে বলা হয়। অর্থাৎ ৩২ পেলে ৩৩, ৩৯ পেলে ৪০, ৪৯ পেলে ৫০, ৫৯ পেলে ৬০, ৬৯ পেলে ৭০ এবং ৭৯ পেলে ৮০ নম্বর দিতে বলা হয়। ১৯ নম্বর নির্দেশনায় ২৮, ২৯, ৩০, ৩১ এবং ৩২ নম্বর ত্যাগ করে বাড়িয়ে দিতে অর্থাৎ ৩৩ নম্বর দেয়ার কথা বলা হয়। নির্দেশনা শেষে আবার স্টার চিহ্ন দিয়ে ৩২, ৩৯, ৪৯, ৫৯, ৬৯ ও ৭৯ নম্বরকে দয়া ও সতর্কভাবে পুনরায় পরীক্ষা করে উচ্চতর গ্রেড করতে বলা হয়। গণিতের উত্তরপত্র মূল্যায়নের বিষয়ে পরীক্ষকদের জন্য ‘গণিত বিষয়ের বিশেষ নিয়মাবলি’ দেয়া হয় ১৫টি। ১৫ নম্বর নিয়মাবলিতে বলা হয়- যে সকল উত্তরপত্রে প্রাপ্ত নম্বর সর্বনিম্ন পাস নম্বরের কাছাকাছি যেমন- ২৮, ২৯, ৩০, ৩১ বা ৩২ সেসব ক্ষেত্রে প্রয়োজনবোধে উপরের নিয়মাবলি শিথিল করে পুনরায় মূল্যায়ন করে পাস নম্বর দেয়ার চেষ্টা করতে হবে। প্রধান পরীক্ষক কর্তৃক প্রদত্ত পরীক্ষকদের জন্য ২৫টি নির্দেশনা দেয়া হয়। ২৪ নম্বরের খ) নির্দেশনায় বলা হয় কোন উপ-নম্বর ৩৯, ৪৯, ৫৯, ৬৯ ও ৭৯ ধারী খাতাগুলো সহানূভূূতির সঙ্গে বিবেচনা করবেন।  এছাড়া বাংলা, সাধারণ বিজ্ঞান, পদার্থ, রসায়নসহ বিভিন্ন বিভাগের উত্তরপত্র মূল্যায়নে একই ধরনের নির্দেশনা দেয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পাসের হার ও জিপিএ-৫ বাড়ানো হচ্ছে। অথচ শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা বাড়ছে না। প্রবীণ এই শিক্ষাবিদ বলেন, এতে শিক্ষার্থীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভাল ফল করছে অথচ দেখা যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় এসব শিক্ষার্থী গণহারে ফেল করছে। এতে লাভ কি হলো অধ্যাপক আহমদ বলেন, যোগ্যতা বাড়াতে না পারলে ১০০ ভাগ শিক্ষার্থী পাস করলেই লাভ কি? কোন লাভ নেই। উত্তরপত্র মূল্যায়নে নম্বর বাড়িয়ে দেয়ার নির্দেশনার বিষয়ে নটর ডেম কলেজের অধ্যক্ষ ড. ফাদার হেমন্ত পিউস  রোজারিও মানবজমিনকে বলেন, এটা কখনওই যুক্তিযুক্ত নয়। এটা তো গ্রেস নম্বর নয়। এছাড়া গ্রেস দিতে চাইলে তা ঘোষণা দিয়েই দিতে হবে। ড. হেমন্ত বলেন, শিক্ষার্থীদের কি এমন মেধা হয়ে গেল যে গত বছরের চেয়ে এবার ৫১ হাজার ৫০ জন বেশি শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়ে গেল? তিনি বলেন, পাসের হার বাড়ছে। জিপিএ-৫ বাড়ছে। কিন্তু শিক্ষার গুণগত মান দিনদিন কমছে। এটা জ্যামিতিক এবং গাণিতিক দুই হারেই কমছে। অধ্যক্ষ বলেন, জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীরা ক্লাসে সঠিকভাবে এক লাইন বাংলা লিখতে পারে না। ইংরেজি তো অনেক পরে। তাহলে লাভ কি হলো? শিক্ষার মান তো বাড়ছে না।  ঢাকা বোর্ডের পদার্থ বিজ্ঞানের একজন প্রধান পরীক্ষক বলেন, উত্তরপত্রে বেশি নম্বর দিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, উত্তরপত্র বিতরণের সময় বোর্ডের পক্ষ থেকে বলা হয়- শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা হয় এমনভাবে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করতে হবে যাতে কেউ ফেল না করে। ওই পরীক্ষক আরও বলেন, পরীক্ষার কেন্দ্রেও এখন নকল ও দেখাদেখি হয় অবাধে। আগে বহিষ্কার করা হতো এখন সেটাও করা হয় না। ঢাকা বোর্ডের ইংরেজি বিভাগের একজন প্রধান পরীক্ষকের নেতৃত্বে ৪২০০ উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা হয়। এর মধ্যে একজনও ফেল করেনি। এটা কি করে সম্ভব জানতে চাইলে ওই পরীক্ষক বলেন, কোন শিক্ষার্থী ফেল করলে নানা হয়রানির শিকার হতে হয়। আগামীতে উত্তরপত্র না-ও পাওয়া যেতে পারে। কোন পরীক্ষক ১০০ এর মধ্যে ১০০ দিয়ে দিলেও কোন জবাব দিতে হয়না। নম্বর বেশি দিলে কোন জবাব নেই। কম নম্বর পেলে জবাব দিতে হয়। তিনি বলেন, উত্তরপত্র সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। নম্বর দেয়া হচ্ছে কেবল। এতে পাস ও জিপিএ-৫ বাড়ছে। ঢাকা বোর্ডের ইসলাম শিক্ষা বিষয়ের একজন প্রধান পরীক্ষক বলেন, এখন স্বাধীনভাবে উত্তরপত্র মূল্যায়নের সুযোগ নেই। কিভাবে জিপিএ বাড়ানো যায় সে ভাবেই আমাদেরকে নির্দেশনা দেয়া হয়।
শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য: শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ১৭ই মে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা প্রমাণিত হয়েছে। ফলাফলের বিভিন্ন সূচকেই ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। মন্ত্রী বলেন, ইংরেজি, বিজ্ঞান, গণিতের মতো বিষয়গুলো শিক্ষার্থীদের কাছে সবসময় চ্যালেঞ্জিং ছিল।  এজন্য এসব বিষয়ে বিশেষ নজর দেয়া হয়েছে। প্রায় আট হাজার স্কুলে গণিত ও ইংরেজি বিষয়ে বিশেষ ক্লাস নেয়া হয়েছে। এতে পশ্চাৎপদ স্কুলগুলোতেও ফলাফলে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। মন্ত্রী বলেন, ভাল ফলের আরেকটি কারণ হলো- কঠিন বিষয়গুলোতে এবার অন্যান্য বছরের চেয়ে ভাল করেছে শিক্ষার্থীরা।
বোর্ডের বক্তব্য: আন্তঃ শিক্ষা বোর্ড সমন্বয় সাব-কমিটির সভাপতি ও ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তাসলিমা বেগম বলেন, বেশি নম্বর দিতে হবে এমন নির্দেশনা দেয়া হয় না। তবে শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করতে বলা হয়। যাতে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। তিনি বলেন, তিনটি কারণে এবার এসএসসি পরীক্ষার ফল ভাল হয়েছে। প্রথমত পরীক্ষার সময় কোন গোলযোগ ছিল না। দ্বিতীয়ত- ২১টি বিষয় সৃজনশীল পদ্ধতিতে পরীক্ষা হওয়ায় ভাল নম্বর পেয়েছে শিক্ষার্থীরা। তৃতীয়ত, সেকায়েপ প্রকল্পের আওতায় ইংরেজি, গণিত, রসায়ন ও পদার্থ বিজ্ঞানে অতিরক্ত ক্লাস নেয়ায় গ্রামের শিক্ষার্থীরা ভাল করেছে।