দুদক-টিআইবি চ্যালেঞ্জ-পাল্টা চ্যালেঞ্জ

25707_f2বিডি রিপোর্ট 24 ডটকম : দুর্নীতি বিরোধী রাষ্ট্রীয় সংস্থা দুদক আরেক দুর্নীতি বিরোধী সংস্থার টিআইবির সঙ্গে বিতর্কে জড়িয়েছে। দুই সংস্থার পক্ষ থেকে পাল্টাপাল্টি চ্যালেঞ্জ ছোড়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি বিরোধী সংস্থার পক্ষ থেকে এ ধরনের চ্যালেঞ্জ ছোড়ার সমালোচনা করছেন অনেকে। দুদক কমিশনার সাহাবুদ্দিন চুপ্পু টিআইবির মুখোশ উন্মোচনের ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, সংস্থাটির আয়-ব্যয় ও অর্থের উৎস খুঁজে দেখা হবে। তার এ বক্তব্যের জবাব দিয়েছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। বলেছেন, আমি তার বক্তব্যে হতবাক ও বিব্রত হয়েছি। তিনি যে ভাষা ব্যবহার করেছেন তাতে তিনি নিজেই নিজেকে বিব্রত করেছেন। সরকারের অনুমোদনের বাইরে টিআইবি কোন অর্থ গ্রহণ করতে পারে না, ব্যয়ও করতে পারে না। আমাদের  কোন মুখোশ  নেই, মুখ আছে। পরিচয় একটাই আমরা টিআইবি।  রাজধানীর  হোটেল অবকাশে ‘জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল: বাস্তবায়নের অগ্রগতি’ শীর্ষক এক গবেষণা  প্রতিবেদন উপস্থাপন অনুষ্ঠানে তিনি  এভাবেই দুদকের বক্তব্যের জবাব দেন। এর আগে বুধবার দুদক কমিশনার মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু টিআইবির সমালোচনা করে বলেন, টিআইবি বিদেশ থেকে টাকা এনে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে তথাকথিত গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাদের এসব কাজের স্বচ্ছতা কি? সময় এলে টিআইবির মুখোশ উন্মোচন করা হবে। এ বক্তব্যের জবাবে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সময় হলে কেন? আজকেই মুখোশ উন্মোচন করুন। তদন্তে আমরাও সাহায্য করব। আর যদি সমালোচনার কারণেই এমন হয়, তবে বলব আরেকবার  ভেবে  দেখুন। তিনি বলেন, দুদক প্রতিষ্ঠার  পেছনে টিআইবিরও ভূমিকা আছে। দুদক  প্রতিষ্ঠার দাবি আমরাই করেছিলাম। এর মূল খসড়াও আমরা করে দিয়েছিলাম। এছাড়া  শিল্পকলায় যেসব কমিটিকে দুদক পুরস্কৃত  করেছে তা আমাদের দুর্নীতি বিরোধী নাগরিক কমিটির আদলেই করা হয়েছে। ওই অনুষ্ঠান করার আগে দুদক তিনবার চিঠি লিখে আমাদের সহায়তা চেয়েছে। আমরা চাই প্রতিষ্ঠানটি আরও কার্যকর  হোক।  টিআইবির উদ্দেশে দুদক কমিশনার বুধবার প্রশ্ন রেখে বলেছিলেন, ‘আপনারা কতটা স্বচ্ছ?  বিদেশী টাকায় যে কাজ করছেন, তা কতটুকু গবেষণার কাজে লাগানো হচ্ছে? এর জবাবে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘টিআইবি বিদেশী অর্থায়নে চলে, আমরা এটা অস্বীকার করি না। এটা আমরা আগেও বলেছি। সরকারের সম্মতি ছাড়া টিআইবি একটি টাকাও গ্রহণ করে না, খরচও করে না, করতে পারে না। সরকারের কাছে আমরা জবাবদিহি করি। আমাদের ওয়েবসাইটে আয়-ব্যয়ের হিসাব আছে। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক দুদকের কমিশনার সাহাবুদ্দিনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে এ ধরনের বক্তব্য  বেমানান। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দুদক কমিশনার নিয়োগের জন্য যে তালিকা করা হয় তা চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্ত পৌছতে গুণগত দিকগুলো বিবেচনায় আনা হয় না। ওদিকে গতকাল টিআইবি প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে দুদক আইন সংশোধনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়েছিল। দুদকের তদন্তে সরকারের হস্তক্ষেপ রয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবও রয়েছে। তবে তার তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা কঠিন। জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল-এ সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙবখলা বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি  বলেন, জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল বাস্তবায়নের যে প্লাটফর্ম তৈরি হয়েছে তা যথাযথ ও কার্যকর করার লক্ষ্যে সরকার, বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনসহ সবাইকে বিশেষ উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে। ওদিকে, সরকার কর্তৃক প্রণীত জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলের ঘাটতিসমূহ দূর করে এর সফল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দলিলটিকে পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন উপযোগী করে তোলার আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি। একই সঙ্গে আর্থিক বরাদ্দ ও নিয়মিত প্রতিবেদন প্রণয়নের বিধান রেখে নৈতিকতা কমিটির কার্যক্রমকে প্রশাসনিক কার্যক্রমের আওতায় আনার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। জানুয়ারি থেকে মে ২০১৪ সময়কালে সংগৃহীত তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে প্রণীত এই গবেষণা প্রতিবেদনে  বলা  হয়, জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি ‘জাতীয় শুদ্ধাচার উপদেষ্টা পরিষদ’ এবং অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি ‘নির্বাহী কমিটি’ রয়েছে। এছাড়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রশাসনিক ও বাস্তবায়ন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় শুদ্ধাচার বাস্তবায়ন ইউনিটের নির্দেশনায় সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানে নৈতিকতা কমিটি গঠন ও একজন ‘ফোকাল পয়েন্ট’ নির্ধারণ করা হয়েছে। জাতীয় শুদ্ধাচার বাস্তবায়ন ইউনিট সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে শুদ্ধাচার বাস্তবায়নের নির্দেশনা প্রেরণ করেছে, ফোকাল পয়েন্ট ও মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং জেলা পর্যারে সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে শুদ্ধাচার সম্পর্কে মতবিনিময় করেছে। তাছাড়া শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার ও প্রশাসনিক উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, রাষ্ট্রীয় ১০টি প্রতিষ্ঠানের শুদ্ধাচার কৌশল বাস্তবায়নের স্বল্পমেয়াদি কার্যক্রমে কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে।  যেমন- ন্যাশনাল ওয়েব পোর্টাল ও ই-সার্ভিস সিস্টেম চালু, দশম সংসদের প্রথম অধিবেশনে সব স্থায়ী কমিটি গঠন, নির্বাচন কমিশনের প্রায় সব জেলায় সার্ভার সিস্টেম প্রবর্তন এবং এ সংক্রান্ত সোস্যাল পারফর্মেন্স অডিট চালুর উদ্যোগ গ্রহণ, দুদক-এর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতি প্রতিরোধে মনিটরিং সেল গঠন এবং বিভিন্ন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
পাশাপাশি অরাষ্ট্রীয় ৬টি প্রতিষ্ঠানের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পদ্ধতি বা প্রক্রিয়া এখনও প্রণীত না হওয়ায় রাজনৈতিক দল, বেসরকারি খাতের শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, এনজিও, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং  গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট কোন নৈতিকতা কমিটি গঠিত হয়নি এবং ফোকাল পয়েন্ট নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তবে এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর উদ্যোগে এনজিও ও সুশীল সমাজ খাতের কর্মপরিকল্পনা তৈরিতে কয়েকটি এনজিও কাজ করলেও এখনও কোন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব হয়নি। উল্লিখিত ৬টি অরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বর্তমান অবস্থা মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চার দৃষ্টান্ত কম, রাজনৈতিক দলের আচরণবিধি প্রণয়নের উদ্যোগ নাই, ব্যবসায় স্বনিয়ন্ত্রণ থাকলেও অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও সরকারের সঙ্গে যোগসাজশ রোধে কোন পদক্ষেপ নেই এবং জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে তথ্য কমিশনের নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় ও দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ না করা, সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে ঝুঁকির সম্মুখীন হতে হয় ইত্যাদি।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, কৌশলপত্রে কয়েকটি ঘাটতি রয়েছে যা হলো- দুর্নীতিরোধে অগ্রাধিকারমূলক কার্যক্রমের অনুপস্থিতি; জাতীয় সততা ব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান- তথ্য কমিশন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনীকে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি ইত্যাদি। এছাড়া ন্যায়পাল নিয়োগ না করা। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইনের আনীত সংশোধনীর ওপর হাইকোর্টের রহিতকরণ নির্দেশনা জারি সত্ত্বেও সংশোধনের উদ্যোগ না নেয়া। তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে সরকারি কার্যালয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় অনুল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হওয়া। নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ এখনও বাস্তবায়িত না হওয়ায় সরকারের বিভিন্ন ইতিবাচক পদক্ষেপ সত্ত্বেও অংশীজনদের প্রত্যাশা অনুযায়ী জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।
এতে আরও বলা হয়, জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলটি সফলভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ার পেছনে চ্যালেঞ্জসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- সুপারিশের সঙ্গে কর্মপরিকল্পনার সামঞ্জস্যহীনতা। কর্মসম্পাদনের নির্ধারিত সময়সীমা সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত নয়। অংশীজনদের মধ্যে শুদ্ধাচার সম্পর্কিত সচেতনতার অভাব। শুদ্ধাচার কৌশলটি বাস্তবায়নে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের অভাব। নৈতিকতা কমিটি গঠন ও ফোকাল পয়েন্ট নিযুক্ত না হওয়া। এখতিয়ার না থাকার কারণে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিনা অনুমতিতে নিয়মিত সভা করতে না পারা এবং নৈতিকতা কমিটি কর্তৃক প্রতিবেদন প্রণয়ন ও প্রেরণে দীর্ঘসূত্রতা।
জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলটির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় টিআইবি’র উত্থাপিত ১০ দফা সুপারিশসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো: সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সকল অংশীজনের মধ্যে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল সম্পর্কে ব্যাপক প্রচারণা। যেসব প্রতিষ্ঠানে নৈতিকতা কমিটি ও শুদ্ধাচার বাস্তবায়ন কমিটি গঠিত এবং ফোকাল পয়েন্ট নির্ধারিত হয়নি তা দ্রুত শেষ করা। আর্থিক বরাদ্দ এবং নিয়মিত প্রতিবেদন প্রণয়নের বিধান রেখে নৈতিকতা কমিটির কার্যক্রমকে প্রশাসনিক কার্যক্রমের আওতায় নিয়ে আসা। জাতীয় সততা ব্যবস্থার সব স্তম্ভ এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে যেমন, তথ্য কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী ও রাজস্ব বোর্ডকে কৌশলপত্রে অন্তর্ভুক্তকরণ।  রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মপরিকল্পনায় শুদ্ধাচারের প্রধান সূচক এবং দুর্নীতি রোধের বিষয়টিকে অগ্রাধিকরের ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্তকরণ এবং সব অরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে শুদ্ধাচার বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় পদ্ধতি চূড়ান্তকরণ।
এতে মূল প্রতিবেদনের সারাংশ উপস্থাপন করেন গবেষণা ও পলিসি বিভাগের প্রোগ্রাম ম্যানেজার সাধন কুমার দাস ও শাম্মী লায়লা ইসলাম। আরও উপস্থিত ছিলেন টিআইবি’র ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এম হাফিজউদ্দিন খান, উপ-নির্বাহী পরিচালক ড. সুমাইয়া খায়ের।