দিনাজপুরে অপহরণের ৫ দিনের মাথায় স্কুল ছাত্র মুরসালিনের লাশ উদ্ধার

DINAJPURমোঃ নুরুন্নবী বাবু, দিনাজপুর : দিনাজপুরে সোমবার ভোরে অপহরণের ৫ দিন পর স্কুলছাত্র মুরসালিনের লাশ পাওয়া গেল বাড়ীর ৪শ গজ অদূরে। হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে একই পরিবারের ৪ জনকে আটক করা হয়েছে। ঘাতক রশিদুলের বাবা ও মা চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট সৈয়দ কামাল হোসেনের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন।

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে দিনাজপুর সদর উপজেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নের মহব্বতপুর পূর্বপাড়ার মোকসেদুল ইসলামের পুত্র ও চেরাডাঙ্গী হাই স্কুলের ৯ম শ্রেণীর ছাত্র ছাইয়েদুল মুরসালিন (১৪)কে অপহরণ করার একদিন পর শুক্রবার ৫০ লক্ষ টাকা মুক্তিপন দাবী করে মোবাইল করা হয়। অপহরণের সাথে জড়িত থাকা সন্দেহে পুলিশ শনিবার একইপাড়ার রিক্সা চালক ওবায়দুরের পুত্র ও কেবিএম কলেজের এইচএসসি’র ছাত্র রশিদুল (১৯)কে গ্রেফতার করে।

অপহরণের ৫ দিনের মাথায় রোববার দিবাগত রাত ২ টায় মহব্বতপুর পূর্বপাড়ার আব্বাস আলীর বাড়ীর সামনে থেকে অপহৃত মুরসালিনের লাশ পড়ে থাকতে এলাকাবাসী দেখতে পায়। এলাকাবাসী জানায়, রিক্সা চালক মহবুর শহর থেকে রাত ১ টায় বাড়ী ফিরে খাওয়া-দাওয়া শেষে ঘুমানোর সময় অনেকগুলো কুকুরের চিৎকার শুনতে পেয়ে বাড়ী থেকে বের হয়ে দেখতে পান আব্বাস আলীর বাড়ীর দরজার সামনে খোলা জায়গায় মুরসালিনের লাশ পড়ে রয়েছে। পচন ধরা লাশের পড়নে ছিল কালো হাফ হাতা গেঞ্জি ও ফুলপ্যান্ট। হাত ও পা রশি দিয়ে বাধা ও গলায় পলিথিন জাতীয় জিনিস দিয়ে পেচানো ছিল। লাশ দেখতে পেয়ে গ্রামবাসী ৪শ গজ অদূরে মুরসালিনের বাবা দলিল লেখক মোকসেদুল ইসলামকে খবর দিলে হতভাগ্য পিতা ঘটনাস্থলে এসে সন্তানের লাশ শনাক্ত করেন। কোতয়ালী পুলিশকে রাত ৩ টায় খবর দিলে ওসি আলতাফ হোসেনসহ একদল পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে লাশের সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করে ময়না তদন্তের জন্য লাশ দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করেন। ময়না তদন্ত শেষে দুপুর ১২টায় লাশ স্বজনের নিকট হস্তান্তর করা হয়।

এদিকে আটক রশিদুলের বাসার একটি মাটির ঘরের মধ্যে দক্ষিণ দিকে গর্ত করে লাশ চাপা দিয়ে উপরে খড় দিয়ে ঢেকে রাখে। ঘটনার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ রশিদুলের বাবা রিক্সা চালক ওবায়দুর রহমান (৫৫), মা রওশন আরা (৪২), নানি মালেকা (৬৫) ও বোন ওয়াসিমা (১২)কে আটক করে ভোরেই কোতয়ালী থানায় নিয়ে যান। রশিদুলের ছোট ভাই রবিউল পালিয়ে যায়।

মুরসালিনের দুলাভাই মোরশেদুর রহমান অভিযোগ করেন, পুলিশকে সময়মতো খবর দেয়ার পরও পুলিশ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হওয়ার কারনেই মুরসালিন খুন হয়েছে। এজন্য পুলিশকেই দায়ী করেন তিনি। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে কোতয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আলতাফ হোসেন জানান, ঘটনাটি জানার পরপরই মুরসালিনকে উদ্ধারের চেষ্টা চালানো হয়েছে।

নিহত মুরসালিনের বাবা মোকসেদুল ইসলাম জানান, তার সাথে কারো কোন বিরোধ ছিল না। তিনি তার সন্তানের হত্যার বিচার দাবী করেন। লাশ উদ্ধারের খবর পাওয়ার পর অসংখ্য মানুষ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ফরিদুল ইসলাম ভোরেই ঘটনাস্থলে গিয়ে নিহতের পরিবারের সাথে দেখা করেন। দলিল লেখকের সন্তান হত্যার বিচার চেয়ে দিনাজপুর জেলা দলিল লেখক সমিতির ডাকে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত কর্মবিরতী পালন করা হয়। নিহতের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চেরাডাঙ্গী হাই স্কুলের শিক্ষক, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা মেধাবী ছাত্র মুরসালিনকে দেখতে আসেন। সোমবার দুপুর আড়াইটায় মহব্বতপুর শুকানদিঘি ঈদগাহ মাঠে নামাজে জানাজার পর তাকে পারিবারিক গোরস্তানে দাফন করা হয়। মুরসালিন ছিল ৩ ভাই-বোনের মধ্যে দ্বিতীয়।

মুরসালিন অপহরণ ও হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই নাজমুল আলম জানান, সোমবার বিকেলে হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত ওবায়দুর ও তার স্ত্রী রওশন আরা দিনাজপুরের চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট সৈয়দ কামাল হোসেনের খাস কামরায় ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন। এদিকে তদন্তকারী কর্মকর্তা অপহরণ ও হত্যার মূল আসামী রশিদুলকে ৫ দিনের রিমান্ডে এনে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে আবেদন করলে সোমবার শুনানি গ্রহণ করা হয়। আদালত আজ মঙ্গলবার রিমান্ডের ব্যাপারে আদেশ দিবেন। ঘাতক রশিদুলের নানি মালেক ও বোন ওয়াসিমাকে উপযুক্ত অভিভাবকের নিকট হস্তান্তর করা হবে বলে ওসি আলতাফ হোসেন জানান।##