সুনামগঞ্জের ছাতকের মানিকপুরের লিচু চাষীরা হতাশ

Sunamgonj Pic - 001অরুন চক্রবর্তী, সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি ঃ

সুনামগঞ্জের ছাতকের লিচুর গ্রাম নামে খ্যাত মানিকপুর-গোদাবাড়ির লিচু চাষীরা এবার হতাশায় ভোগছেন। আশানুরূপ উৎপাদন না হওয়ায় আর্থিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে চাষীরা। প্রচন্ড খড়া ও সেচের অভাবে অঙ্কুরেই ঝরে গেছে ৫০ভাগ লিচু। আরো ২০ভাগ লিচু ক্ষতিগ্রস্থ করেছে বাদুর জাতীয় পাখি। ফলে মানিকপুরের লিচু চাষীরা এবছর মারাত্মক আর্থিক ক্ষতি সম্মুখিন হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বৈশাখ-জৈষ্ঠ্য মাসের এমন সময়ে মানিকপুর গ্রামের মানুষ অন্যরকম উৎসব পালন করলেও এ বছর তাদের মধ্যে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। কাংখিত ফল উৎপাদন না হওয়ায় চাষীদের লিচু উৎসবের আনন্দে ভাটা পড়ে। তার উপর বাদুর জাতিয় পাখির কারনে আরো ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার আশংকায় লিচু পাকার আগেই অপেক্ষাকৃত কম মুল্যে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে চাষীরা। প্রতি বছর চৌমুহনি বাজারে সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে দীর্ঘ লাইনে লিচুর হাট বসে। এ বছর উৎপাদন কম হওয়ায় বাজারে এ দৃশ্য দেখা যায়নি। প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও বাদুর জাতিয় পাখির উপদ্রবে এবছর ফল উৎপাদনের হিসেবে চাষীদের মারাত্মক গড়মিল হয়ে গেছে।এ ক্ষতিপূরন করে ভবিষ্যতে ভাল ফল উৎপাদন করতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে কৃষি বিভাগের সহযোগিতা ও বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়ার জোরালো দাবী উঠে এসেছে চাষীদের মুখ থেকে। উপজেলার নোয়ারাই ইউনিয়নের মানিকপুর-গোদাবাড়িসহ পার্শ্ববর্তী কয়েকটি গ্রামের মাটি লিচু চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। মধুমাসের রসালো মিষ্টি ফল লিচু উৎপাদনের উপর নির্ভর করে এসব গ্রামের সহস্রাধিক পরিবার শতাধিক বছর ধরে লিচু উৎপাদন ও বিক্রি করে স্বাচ্ছন্দে জীবন-যাপন করে আসছে। প্রতি বছর এখানের বাগান থেকে কোটি টাকার লিচু উৎপাদন ও বাজারজাত করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট চাষিরা জানান। ছাতকের বিভিন্ন হাট-বাজার, দোয়ারা, বিশ্বনাথ, জগন্নাথপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, দিরাইসহ বিভিন্ন এলাকায় মানিকপুরের লিচু বিক্রি হচ্ছে। মানিকপুর লিচু বাগান ঘুরে চাষীদের সাথে আলাপচারিতায় তারা তাদের সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন।লিচু বাগানের মালিক আব্দুল মুমিন জানান, প্রতিকূল যোগাযোগ ব্যবস্থা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে এখানের লোকজন উৎপাদিত লিচু বাজারজাত করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। এ বছর খড়ার কারনে লিচু চাষীরা কাংখিত ফল উৎপাদন করতে পারেনি। গাছে-গাছে প্রচুর মুকুল আসলেও দাব-দাহে ধুসর বর্ন ধরে ঝরে পড়েছে শতকরা ৫০ভাগ। ফলে লিচু চাষীরা কাংখিত উৎপাদনে বঞ্চিত হয়ে আর্থিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। মানিকপুর ছাড়াও গোদাবাড়ি, কঁচুদাইড়, চাঁনপুর, বড়গল্লা, দোয়ারার টেংরা, লামাসানিয়া, লাম্ববেরগাঁও, পরমেশ্বরীপুর গ্রামেও লিচু চাষ হচ্ছে। বাগান মালিক আরব আলী জানান, শতাধিক বছর পূর্বে গৌরিপুর জমিদারের ছাতক-দোয়ারা ষ্ট্যাটের নায়েব হরিপদ রায় চৌধুরী ও শান্তিপদ রায় চৌধুরীর কাচারী বাড়ি মানিকপুর গ্রামে কয়েকটি লিচু

গাছ রোপন করেছিলেন। তখন থেকেই এ গ্রামের মানুষ ক্রমে-ক্রমে লিচু চাষে উৎসাহী হয়ে উঠলে এক সময় মানিকপুর লিচুর গ্রাম নামে পরিচিতি লাভ করে। লিচু উৎপাদনের সাথে জড়িত ও বাগান মালিক সাইদুর রহমান, সুন্দর আলী, জামাল উদ্দিন, কেরামত আলী, ফুল মিয়া, জয়নাল আবেদীন, কুদ্দুস মিয়াসহ লোকজন জানান, প্রতিবছরই যথা সময়ে লিচু গাছের পরিচর্যা দিয়ে ভাল ফলনের উপযোগী করে তোলা হয়। শ্রম ও পরিচর্যার মাধ্যমে ফলনও আশানুরূপ হয়ে থাকে। কিন্তু এবছর খড়ায় অর্ধেক ফল দানা বাঁধার আগেই ঝরে পগে। পাহাড়ী বাঁদুর ও চামচিকা জাতিয় পাখির উপদ্রবে আধাপাকা লিচু বিক্রি করতে বাধ্য হন চাষীরা। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এবং বৃষ্টি এলেই ঝাকে-ঝাকে এসব পাখি লিচু গাছে হানা দেয়। বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা থাকলে অন্তত পাখির উপদ্রব থেকে ফল রক্ষা করা যেত। নোয়ারাই ইউনিয়নে দায়িত্বরত উপজেলা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল হামিদ জানান, এবছর প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারনে অন্যান্য বছরের তুলনায় কম লিচু উৎপাদন হয়েছে। দাম একটু বাড়লেও উৎপাদন কম হওয়ায় চাষীরা আর্থিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। বিদ্যুৎ সংযোগ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করার জন্য এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবী এখনো অপূরনীয় রয়েছে। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আফজাল আবেদীন আবুল জানান, তার ইউনিয়নে প্রচুর লিচু উৎপাদন ও বাজারজাত করনের বিষয়টি তাকে গর্বিত করেছে। চাষীদের সাথে একাত্বতা ঘোষনা করে স্থানীয় সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিকের কাছে বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে জোর দাবী জানাচ্ছেন।##