গাইবান্ধার চরাঞ্চলে শিক্ষকরা স্কুল ফাঁকি দেয়ায় প্রাথমিক শিক্ষার বেহাল দশা !

গাইবান্ধা থেকে আঃ খালেক মন্ডল ঃ গাইবান্ধা জেলার চরাঞ্চলে শিক্ষকরা দেরিতে স্কুলে পৌছানো এবং সময়ের পুর্বেই ছুটি দেয়া বা ক্লাশ ফাঁকি দেয়ায় প্রাথমিক শিক্ষার বেহাল দশা হয়েছে বলে অভিযোগ gaibandhaউঠেছে। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের অব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষকদের অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতায় চরের স্কুল গুলোতে শিক্ষার অচল অবস্থা বিরাজ করছে। স্কুল ফাঁকি দেয়া শিক্ষকরা সংশিষ্ট ক্লাষ্টার সহকারী শিক্ষা অফিসারদের অলিখিত মাসোহারা প্রদানের মাধ্যমে ম্যানেজ করে নিয়মিত বেতন ভাতা উত্তোলন করছেন। বেশিরভাগ শিক্ষক চরাঞ্চলে শিক্ষকতা করলেও তারা থাকেন মেইনল্যান্ডে বা উপজেলা জেলা শহরে। মেইনল্যান্ড থেকে নৌকা যোগে সকাল ১০টায় বের হয়ে বেলা ১২টায় বিদ্যালয়ে পৌছেন। আবার বেলা ২টায় স্কুল ছুটি দিয়ে নৌকা যোগে বাড়ি ফিরেন বলে জানা গেছে।

প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষক নেতাদের স্কুলে ফাঁকি দিয়ে অন্য শিক্ষকদের বদলী বাণিজ্য নিয়ে তদবির করাসহ অফিসে ঘুরঘুর করার অভিযোগ রয়েছে। আবার অনেক শিক্ষক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকুরি করলেও তাদের সন্তানদের লেখাপড়া করান স্থানীয় বিভিন্ন কেজি স্কুলে। বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির কয়েকজন সদস্য জানান, হেডমাষ্টাররা অফিসে কাজের কথা বলে বেশিরভাগ সময় নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। তাদের বিরুদ্ধে কথা বললে অনেক সময় আগামিতে কেমনে কমিটিতে আসেন এমন হুমকি দেয় বলে জানা গেছে। অভিভাবকরা জানায়, দূর্ণীতিবাজ শিক্ষা অফিসারদের শিক্ষকরা আবার কেমন হবে। তারা বছরে একদিন চরের স্কুল দেখতে আসেনা। সে সুযোগে শিক্ষকরা ক্লাশ ফাঁকি দেয়।

জেলা উপজেলায় শিক্ষা কমিটির আলোচনা সভা ও বিভিন্ন সভা সেমিনারে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বেহাল দশা নিয়ে নানান কথা উঠলেও রহস্যজনক  সমস্যার সমাধান হচ্ছেনা।

চরাঞ্চলের সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বেশীর ভাগ শিক্ষক বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থেকে পারিবারিক কাজে ব্যস্ত থাকেন। শিক্ষার্থীরা নিয়মিত শিক্ষকবিহীন বিদ্যালয়ে এসে খেলাধুলা করে বাড়ি ফিরছে বলে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। পালাক্রমে ২/১ জন শিক্ষক দেরিতে স্কুলে এলেও নির্ধারিত সময়ের আগেই স্কুল ছুটি দিয়ে চলে যান। কোন স্কুলে ২/৩ জন শিক্ষকের পরিবর্তে প্রক্সি শিক্ষক দিয়ে চালিয়ে নেয়। ফাঁকিবাজ শিক্ষক একদিন এসে মাসের হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এ ব্যাপারে চরাঞ্চলের কয়েকজন শিক্ষকের সাথে কথা হলে তারা জানান, আমরা সকাল থেকেই বিদ্যালয়ে পৌঁছার জন্য তৈরি হয়ে থাকি। কিন্তু খেয়ার নৌকা সকাল ১০টায় আসে, সাড়ে ১০টায় ছেড়ে যায়। সে কারণে বেলা ১১ বা সাড়ে ১১টার পুর্বে স্কুলে পৌছাঁনো সম্ভব হয়ে উঠেনা। আবার বেলা ৩টায় ওই পাড়ের খেয়া নৌকা ছেড়ে আসে তাই বেলা আড়াইটায় ছুটি দিয়ে খেয়াঘাটে আসতে হয়। নৌকা ফেল করলে ওইদিন পারাপারের আর ব্যবস্থা থাকেনা।

চর দীঘলকান্দি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংখ্যা ৫ জন। সম্প্রতি ওই স্কুলে বেলা ১২টায় গিয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আসাদুল্যাহ, সহকারী শিক্ষক শফিকুল অপরজন স্থানীয় এক মহিলা (প্রক্সি শিক্ষক)সহ ৩ জন শিক্ষককে দেখা যায়। প্রধান শিক্ষক জানান,সহকারী শিক্ষক আউয়াল মাঝে মধ্যে স্কুলে আসেন, আর ১জন শিক্ষিকা অনুপস্থিত রয়েছেন। ওই শিক্ষিকা সুরাইয়া আকতার নিজের সন্তানদের লেখাপড়া করানোর জন্য বগুড়ায় থাকেন। উপস্থিত ৫ম শ্রেণীর ছাত্র আনোয়ার রোল (১৮), নুর আলম রোল-(১৩), রাসেল-(১২), ৪তুর্থ শ্রেণীর ময়না, আমেনা, তৃতীয় শ্রেণীর জরিনা, সবুজ, বেল্লাল জানায় ওই শিক্ষিকাকে কোন দিন দেখেনি তার নামও জানে না। ওই স্কুলের ৮ম শ্রেণী পাশ প্রক্সি শিক্ষিকা শোভার সাথে কথা হলে তিনি জানান, ১ জন শিক্ষিকা স্কুলে আসেন না তার পরিবর্তে মাসিক ২ হাজার টাকায় পাঠদান করে আসছি।

চরের দুচারটে স্কুল ছাড়া সকল স্কুল গুলোর একই চিত্র । স্কুল ফাঁকি দেয়ার সুযোগ থাকায় অনেকেই চরে বদলী নিচ্ছেন। অপর দিকে সংশিষ্ট কর্মকর্তারাও মোটা অংকের সেলামী পেয়ে থাকেন। শিক্ষা অফিসারের কোনদিন চর এলাকায় পরিদর্শনে যাননা, প্রয়োজনে পরিদর্শন খাতা অফিসে নিয়ে স্বাক্ষর করেন।

এছাড়াও রয়েছে শিক্ষকদের উপবৃত্তি প্রদানে অনিয়ম, বিদ্যালয় উন্নয়নের অর্থ লোপাট ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশু অধিকার লংঘনসহ নানা কারণে চরের প্রাথমিক শিক্ষায় অচল অবস্থা বিরাজ করছে। মেইনল্যান্ডের চেয়ে চরাঞ্চলে ঝড়ে পরা শিক্ষার্থী বেশি বলে অনেকেই জানান।

সংশিষ্ট অফিস সূত্রে জানা যায়, ইতিমধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকের শূন্যপদ পূরণ করা হলেও আগের তুলনায় চরে শিক্ষার মান আরো হ্রাস পাচ্ছে। অর্থের বিনিময়ে শিক্ষকদে স্কুলে না যাওয়ার সুযোগ দেয়া প্রসঙ্গে সাঘাটা উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার রাবেয়ার কাছে জানতে চাইলে তিনি অর্থ গ্রহনের কথা অস্বীকার করে বলেন, শিক্ষক স্কুলে না যাওয়ার বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে অবিহিত করেছি এবং বেতন বন্ধের সুপারিশ করেছি। এর পরও বেতন বন্ধ না হয় সেখানে আমার করণীয় কি আছে ? অপর সহকারী শিক্ষা অফিসার প্রভাষ চন্দ্র বলেন, রাজনৈতিক কারণে ওই সব শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

উপজেলা শিক্ষা অফিসার ইয়াকুব হোসেন খান বলেন, শিক্ষকরা স্কুল ফাঁকি দেয় ও বদলী লোক (প্রক্সি শিক্ষক) দিয়ে বিদ্যালয়ের ছাত্র/ছাত্রীদের পাঠদান করানো হয় এটা আমার জানা নেই।