পুলিশকে মশার কয়েলও কিনে দেয় রাবি প্রশাসন !

rajsahi uniরাবি প্রতিনিধি : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থানকারী অন্তত দুই শতাধিক পুলিশ থাকার পরও থেমে নেই খুন, হামলা ও মারধরের ঘটনা। অথচ সেই পুলিশকেই আবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে গাড়ির তেল, নাস্তা, গোসলের বালতি, বসার চেয়ার-টেবিল এমনকি মশার কয়েলও কিনে দেয়া হয়। নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ পুলিশের পিছনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিপুল পরিমাণে অর্থ ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। তাদের অনেকেই আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো মুক্তবুদ্ধি চর্চার জায়গায় পুলিশের অবস্থান নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
সংশ্লিষ্ঠ সূত্র মতে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে অনেক সময় যে গাড়ি দেয়া হয়ে থাকে তার তেল থেকে শুরু করে সব রকমের খরচ বহন করতে হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে। তাছাড়া ক্যাম্পাসে কোনো হামলা, সংঘর্ষ বা খুনের ঘটনা ঘটলেই পুলিশের পিছনে বিপুল পরিমাণ অর্থও যোগান দিতে হয়। এছাড়াও বিভিন্ন চত্বরে পুলিশ সদস্যদের বসার জন্য চেয়ার-টেবিল থেকে শুরু করে নাস্তার খরচও দিতে হয় বিশ্ববিদ্যালয়কে। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেদের ১১টি হলে যে ৬৬জন পুলিশ সদস্য থাকেন তাদের পিছনে হল প্রশাসনেরও একটি মোটা অংকের টাকা খরচ করতে হয়। পুলিশকে মশার কয়েল থেকে শুরু করে গোসল করার জন্য বালতি-মগও কিনে দিতে হয় তাদের।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাদার বখশ হল প্রাধ্যক্ষ মো. শেরেজ্জামান বলেন, আমরা হলের পুলিশকে মশার কয়েল কিনে দেই। এছাড়াও তাদের পিছনে বিভিন্ন সময় আমাদের টাকা খরচ করতে হয়। হলে তল্লাশি করতে এলে পুলিশদের নাস্তার খরচও হল প্রশাসনকে বহন করতে বলা হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে। কয়েক দিন আগে ২৫জন পুলিশকে নাস্তা করাতে হয়েছে আমাদের।
তবে এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর তারিকুল হাসান বলেন, হল প্রশাসন যে পুলিশের পিছনে টাকা খরচ করে তা আমার জানা নেই। যদি করে থাকে তাহলে তা ঠিক নয় বলেও তিনি মনে করেন।

এদিকে পুলিশের পিছনে শিক্ষার্থীদের হল ফান্ডের টাকা খরচ করা নিয়ে প্রায়ই সুপারভাইজারদের সাথে প্রাধ্যক্ষের মতপার্থক্য দেখা দেয়। কয়েক বছর যাবত রাজনৈতিক বিবেচনায় হল প্রাধ্যক্ষ নিয়োগ হয় বলে তাদের অনেক কাজের বিরুদ্ধেই কথা বলে থাকেন হলের স্থায়ী চাকুরীজীবী সুপারভাইজাররা। হলে পুলিশের পিছনে টাকা খরচে সুপারভাইজাররা বাধা দিলেও তা মানছে প্রাধ্যক্ষরা।

ক্যাম্পাস সূত্রে জানা যায়, গত ২৯ এপ্রিল সকালে হলের সামনে ছাত্রলীগের মাসুদ হাসান ও টগর মোহাম্মদ সালেহী হামলার শিকার হয়েছেন। তারা যেখানে হামলার শিকার হয়েছেন তার ২০ হাত দূরে শহীদ জিয়াউর রহমান ও শহীদ হবিবর রহমান হলে অন্তত ১০জন পুলিশ ছিল। ছাত্রলীগের ওই নেতাদের মারধরের সময় তারা উচ্চস্বরে চিৎকারও করেছে। কিন্তু তাদের বাঁচাতে পুলিশ এগিয়ে আসেনি। এছাড়াও  মাসুদ ও টগর যখন হল থেকে বের হয় তাদের পিছনে পিছনে পুলিশের একটি ভ্যানও এসেছিল। তারা ওই রাস্তা দিয়ে চলে যাওয়ার তিন মিনিটের মাথায় এই বর্বর হামলার ঘটনা ঘটে। এর আগে গত ৪ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলে নিজ কক্ষে দুপুর ১টার সময় খুন হয় ছাত্রলীগ নেতা রুস্তম আলী আকন্দ। ওই সময়েও হল গেটে তিনজন পুলিশ কর্তব্যরত ছিল। এ ঘটনার এক মাস পার হলেও খুনিকে ধরতে পারেনি পুলিশ। এমন একটি চাঞ্চল্যকর খুনের ঘটনা ঘটলেও হল বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করেনি। দোষীদের ধরতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তেমন কোনো তৎপরতাও দেখায়নি। এ ঘটনায় ছাত্রলীগ চার দিন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ধর্মঘটও পালন করে।

এদিকে ২৩ এপ্রিল দুপুর ২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় টুকিটাকি চত্বরে ইতিহাস বিভাগের তৃতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী মারধরের শিকার হয়। এসময় পুলিশের একটি ভ্যান উপস্থিত থাকলেও তারা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে।  ২৬ এপ্রিল রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাদার বখ্শ হল শাখা শিবির সভাপতি ওয়ালিউল্লাহকে বেধড়ক পেটায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। ওই সময়ে হলে পুলিশ থাকলেও তারা এ ঘটনায় মাথা ঘামায়নি। ২৭ এপ্রিল দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন কাজলা গেট এলাকায় হিসাব বিজ্ঞান ও তথ্য ব্যবস্থা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ইসমাত জাহান সিগমাকে ক্ষুরের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করে দেয় স্থানীয় এক যুবক। যে স্থানে দিনের বেলা ঘটনাটি ঘটে তার কয়েক গজ দূরেই বসেছিল ৮জন পুলিশ। কাজলাতে পুলিশের একটি ফাঁড়িও রয়েছে। সেখানে একাধিক পুলিশ সদস্য থাকেন। কিন্তু তাদের সামনেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আহত করে পালিয়ে গেলেও পুলিশ কোনো তৎপরতা দেখায়নি।

এছাড়াও ২৮ এপ্রিল রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ মখদুম হলে ইসলামের ইতিহাস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ইমরান হোসেন নামের এক শিক্ষার্থী মারধরের শিকার হয়। পুলিশ সেখানে থাকলেও কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। সর্বশেষ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনফরমেশন এন্ড লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের তৃতীয় বর্ষের সাইফুল ইসলাম নামের এক শিক্ষার্থী স্থানীয়দের হাতে হামলার শিকার হয়। তার পাশেই বিনোদপুর গেটে ১০জন পুলিশ অবস্থান করলেও তাকে উদ্ধারের জন্য এগিয়ে আসেনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিকেলের পর ক্যাম্পাসের রাস্তায় চলার সময় মোটরসাইকেল দেখলেই আঁতকে উঠে শিক্ষার্থীরা। মোটরসাইকেল নিয়ে ক্যাম্পাসে ছিনতাই, ছাত্রীদের শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটছে অহরহ। দুর্বৃত্তরা অপরাধ ঘটিয়ে দ্রুত সটকে পড়ছে মোটরসাইকেল নিয়ে। এ দুর্বৃত্তদের বেশিরভাগ স্থানীয় বখাটে হলেও তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না। ফলে এধরনের ঘটনা বন্ধ হচ্ছে না। রাবি’র মন্নুজান হলের কয়েকজন আবাসিক শিক্ষার্থী বলেন, ক্যাম্পাসে ছিনতাই, শ্লীলতাহানিসহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় বিকেলের পর ক্যাম্পাসে বের হতে ভয় লাগে। নিজেদের ক্যাম্পাসে এভাবে নিরাপত্তাহীনতায় থাকা খুবই দুঃখজনক। এ ব্যাপারে পুলিশ কঠোর পদক্ষেপ নিলে এরকম হতো না।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের জুবেরি মাঠ, পুরাতন ফোকলোর চত্বর, তৃতীয় বিজ্ঞান ভবনের সামনের ও পিছনের রাস্তা, সাবাশ বাংলাদেশ চত্বর, হবিবর রহমান মাঠ ও বধ্যভূমি এলাকা ছিনতাইকারীদের অভয়ারণ্য। এসব এলাকায় প্রায়ই ঘটে ছিনতাইয়ের ঘটনা। ফলে বিকেলের পর এসব এলাকায় যেতে অনিরাপদবোধ করে শিক্ষার্থীরা। কারণ, বিকেলের পরপরই নির্জন হয়ে যায় এসব এলাকা। বিভিন্ন সময় এসব এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলেও পুলিশের পক্ষ থেকে অপরাধীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে অভিযান পরিচালনাসহ আইনি কোনো পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন মহল দাবি করছেন, বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর অপরাধীদের শাস্তি না দেওয়াতেই ক্যাম্পাসে একের পর এক ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে। তাই শুধু পুলিশ ক্যাম্পাসে রাখলেই হবে না, অপরাধী যেই হোক তাকে বিচারের আওতায় আনলে পরবর্তীতে আর কোনো অপরাধ সংঘটিত হবে না।
রাজশাহী মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (পূর্ব) প্রলয় চিচিম বলেন, পুলিশ তার কাজ করে যাচ্ছে। একজন অপরাধীকে ধরা অনেক কঠিন কাজ। আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ক্যাম্পাসে পুলিশ যথাযথ দায়িত্ব পালন করছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ উঠেছে, ২০০৯ সাল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশ থাকার জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ খরচ করে আসছে প্রশাসন। তবে এ খাতের জন্য লিখিত আকারে নির্দিষ্ট কোনো বিষয় উল্লেখ না থাকায় তা প্রকাশ পাচ্ছে না। দিনের বেলায় অবস্থান করা পুলিশদের কোনো অর্থ দেয়া না লাগলেও রাতে ক্যাম্পাসে যেসব পুলিশ থাকেন তাদের জন্য বিপুল অংকের টাকা খরচ করতে হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে। এমনটাই বলছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসনে এক সহকারী প্রক্টর। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব খাতে অর্থ ব্যয় সিন্ডিকেট থেকে নির্ধারিত হলেও পুলিশের ব্যাপারে সেখানে কোনো প্রস্তাবনা আনা হয়নি। এমনটাই বলছিলেন সিন্ডিকেটের সাবেক এক সদস্য।
পুলিশের পিছনে টাকা খরচের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা বলেন, পুলিশের পিছনে আসলে কতো টাকা খরচ করা হয় তা বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর বলতে পারবে।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর তারিকুল হাসান বলেন, আমার জানা মতে বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান করা পুলিশদের পিছনে কোনো অর্থ খরচ করা হয় না। যদি হয়ে থাকে এ বিষয়ে হিসাব শাখা বলতে পারবে। আমার হাত দিয়ে কোনো টাকা খরচ করার সুযোগ নেই।
যোগাযোগ করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ সাযেন উদ্দিন আহমেদ বলেন, আসলে পুলিশের পিছনে ওভাবে কোনো অর্থ খরচ করা হয় না। তবে তাদের বিভিন্ন সাহায্য-সহযোগিতা ও অতিরিক্ত কোনো প্রয়োজনে হয়তো কিছু টাকা খরচ করা হয়ে থাকে।  তবে তা কতো সেই নির্দিষ্ট পরিমাণটা এখনি তোমায় বলা সম্ভব হচ্ছে না।
তবে পুলিশের পিছনে অর্থ ব্যয় যাই হোক না কেনো ক্যাম্পাসে তাদের অবস্থান থাকার পরেও থামছে না চোরা-গোপ্তা হামলা, খুন ও ছিনতাইয়ের ঘটনা। বিশ্ববিদ্যালয়ে গত এক মাসেই একাধিক ঘটনা ঘটেছে। হলের নিজ কক্ষে খুন হয়েছেন ছাত্রলীগের এক নেতা। দিনের বেলা হামলার শিকার হয়েছেন তিনজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে প্রকাশ্যে ছুরিকাঘাত করেছে স্থানীয় এক যুবক। এছাড়াও হলে শিবিরের এক নেতাসহ মারধরের শিকার হয়েছেন অন্তত ৬ শিক্ষার্থী। এছাড়াও একাধিকবার ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের রক্ত ঝরা ও তাদের মারধরের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু পুলিশ এসব কাজে এগিয়ে আসেনি। তাই ক্যাম্পাসে তাদের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০০৯ সাল থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থায়ীভাবে পুলিশ রাখার সিদ্ধান্ত নিলেও ক্যাম্পাস থেকে আর তাদের সরানো হয়নি। বর্তমানে রাবি’র ১৭টি আবাসিক হলের ১১টিতে ৬৬জন পুলিশ অবস্থান করছে। এদিকে ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা জোরদার করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক, কাজলা গেট, বিনোদপুর গেট, চারুকলা গেট, বধ্যভূমি ও বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশন গেটে ৭ জন করে মোট ৪২ জন পুলিশ রাখা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যের বাসভবনের সামনে ও প্রশাসন ভবন-১ এ ৬ জন, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসংগঠনের টেন্টগুলোতে সর্বদা ৭-৮ জন করে পুলিশ রাখা হয়।  এছাড়াও কাজলা ও বিনোদপুরে ক্যাম্পাসের ভিতরে রয়েছে পুলিশের দুটি ফাঁড়ি থানা। সেখানে অন্তত ৩০ জন করে পুলিশ অবস্থান করে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য এতো পরিমাণে পুলিশ রাখলেও কার্যত তারা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে বারবার।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মুহম্মদ মিজানউদ্দিন বলেন, ক্যাম্পাসে পুলিশ থাকলেও তারা আসলে নিরাপত্তা দিতে পারছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংগঠনের নেতারা যদি সমঝোতায় না আসেন তাহলে দিন দিন এই খুন ও হামলা বাড়তেই থাকবে। তাই সবাইকে এক হয়ে কাজ করার কথা বলেন।