মানিকগঞ্জে ইরি বোরোর ফলন বিপর্যয়ের আশংকায় হাসি নেই কৃষকের মুখে

Copy of manikgonjআব্দুর রাজ্জাক : মানিকগঞ্জে ইরি-বোরোর পাকা ধান কাটার পুরো মৌসুম শুরু হয়েছে। ফলন বিপর্যয়ের আশংকা এবং মজুর সংকটের কারনে কৃষকের দু:শ্চিন্তা যেন কাটছেনা। তিন বেলা খাওয়াসহ প্রতি মজুরের প্রতি দিন মাথা পিছু কৃষকের গুণতে হচ্ছে ৪ থেকে ৫ শত টাকা। সেই সাথে ঝড়, শিলাবৃষ্টি, পোকা ও ইঁদুরের কারণে ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ফলে ধানের আশানুরূপ ফলন না হওয়ার আশংকা প্রকাশ করছেন স্থানীয় কৃষকরা। এছাড়াও চড়া সুদে টাকা ধার নিয়ে ধান চাষ করা কৃষকরা হতাশায় ভুগছে। ধানের ফলন ভাল না হলেও ঋনের টাকা পরিশোধ করা কৃষকের পক্ষে কষ্টকর হয়ে পড়বে।

ধান কাটার ভরা মৌসুমের এ সময় স্থানীয় মজুর দিয়ে কাজের চাহিদা মেটে না। এ জন্যে আগমন ঘটে পাবনা, সিরাজগঞ্জ, রংপুর,থেকে আসা মৌসুমী মজুরদের। প্রতিজন মজুরের দাম রোজ ৪ থেকে ৫শ টাকা। তাও আবার শর্ত মানলে মজুর পাওয়া যায় নইলে মিলে না। দাম মেটানোর আগে তাদের শর্ত বিড়ি খাবে না, সিগারেট দিতে হবে। খাবার দিতে হবে দিনে ৩ বার। গতকাল এমনি দৃশ্য দেখা গেছে মানিকগঞ্জ বাসষ্ট্যান্ডে ধানকাটার মৌসুমী মজুর বাজারে।
জেলার সর্বত্রই ইরি ধান কাটা এক সাথে শুরু হয়েছে। এজন্যে দেশের উত্তর ও পশ্চিম অঞ্চলের মৌশুমী দিনমজুররা মানিকগঞ্জ বাসষ্ট্যান্ডসহ স্থানীয় হাটবাজার গুলিতে ভীর জমিয়েছে। কৃষকরা দিনে ৩ বার খেতে দেয়াসহ জনপ্রতি মজুর দৈনিক ৪ থেকে ৫শ টাকা করে চুক্তি করে কাজে খাটাচ্ছে। কাজের প্রচন্ড চাহিদার কারনেই মজুরদের এ বারতি আবদারের সুযোগ সদব্যবহার করছে বলে জানান এলাকার চাষীরা।
কথা হয় সিরাজগঞ্জের কাশেম ও রংপুরের আলিমের সাথে, তাদের সাথে ১২ জনের দল রয়েছে। বলেন, আমরা বিড়ি খাইবার পারিনাতো তাই রোজের মায়নার সাথে সিকেরেট কিনে দেয়ার কথা আগেই বলে নেই । তা ছারা সারাদিন পরিশ্রমের পর মাছের তরকারী দিয়ে ৩ বার খাইবার দিতে হবে।
এদিকে ধান চাষী ও কৃষকরা জানান, এ বছর সার, কীটনাশক, সেচ ও অন্নান্য ব্যয় বৃদ্ধির কারনে প্রতিমন ধানের উৎপাদনে প্রায় ৮শ টাকা খরচ পড়েছে। স্থানীয় হাট-বাজারে ধান বিক্রি হচ্ছে মন প্রতি ৬শ থেকে ৬শ পঞ্চাশ টাকায়।  এতে ২ মন ধান বিক্রি করে ৩ টি মজুরের মুল্যও হয় না। এক মন ধানের উৎপাদন খরচের তুলনায় প্রায় ২শ টাকা করে লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের।
বেরী বাঁধের অভাবে জেলার দৌলতপুর, শিবালয়, ঘিওর ও হরিরামপুর উপজেলার পদ্মা-যমুনা নদীর তীরবর্তী  নীচু এলাকার জমিগুলো রয়েছে অরক্ষিত। নীচু ও বিল এলাকার জমির ধান তলিয়ে গিয়ে হাজার হাজার কৃষকদের সারা বছরের খাদ্য সোনার ফসল ইরি-বোরো ধান বিনষ্ট হওয়ার আশংকা করছেন কৃষকরা। ফসল ও নদী ভাঙ্গনের কবল থেকে রক্ষা পেতে কৃষকরা দীর্ঘ দিন ধরে উক্ত এলাকায় একটি বেড়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ শুনেও না শুনার ভান করে রয়েছে। ফলে ধান কাটার শুরুতে মৌসুমী বৃষ্টি-পাতে বিল ও নীচু এলাকার ধান তলিয়ে যেতে পারে এমন আশংকায় ঘুম নেই চাষিদের। এদিকে বোরো চাষিরা সরকারীভাবে সার,বীজ, কৃষি উপকরণসহ কিছুই পায়নি তারা। ইরি-বোরো মৌসুমে চাহিদা অনুযায়ী সার না থাকায় ক্রয় করেও সময়মত জমিতে সার দিতে পারেনি কৃষকরা। ফলে এ বছর বাম্পার ফলন না হওয়ার আংশকা করছেন কৃষকরা। তবে যদি প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ধান কাটার পুরো এ মৌসুমে আবহাওয়া অনুকুলে থাকে এবং দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা পেলে বাম্পার ফলন না হলেও ভাল ফলনের আশাবাদ ব্যাক্ত করেছেন স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা। তাদের দাবি এ বছর কৃষি অফিসের মাঠকর্মীদের পরামর্শ ও চাষিরা নিজেদের উদ্যোগে আদর্শ বীজতলা তৈরী সঠিক বয়সে চারা রোপন পার্চিং পদ্ধতির ব্যাবহার, সারিতে রোপন,জৈবসার ও সুষম সার প্রয়োগ করে চাষবাদ করেছেন। ফলে ভাল ফলনের আশা করছেন কৃষি কর্মকর্তারা।
ভুক্তভোগী কৃষকরা জানান, এবার বোরো মৌসুমে বীজ তোলা তৈরি করেও সরকারি সার, বীজসহ অন্যান্য উপকরণ না পাওয়ায় বিগত বছরের তুলনায় এবার মানিকগঞ্জে বোরো ফলনের ভাল সম্ভাবনা দেখছেন না কৃষকরা। বৃষ্টি হলেই ধান তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কা থাকে কৃষকদের মধ্যে। সম্প্রতি বয়ে যাওয়া শিলাবৃষ্টি ও কালবৈশাখী ঝড়ে আগে রোপন করা ধানের কিছুটা ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। জেলার শিবালয় উপজেলার কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় ধান তলিয়ে যাওয়ার আশংকায় নীচু এলাকায় আগাম ধান কাটা শুরু করেছে কৃষকরা।
ঘিওর উপজেলার রাধাকান্তপুর এলাকার কৃষক মোঃ মুন্নাফ মিয়া জানান, আমি এবং আমার আরো দু’ভাই মিলে মোট ৬ পাখি জমিতে বোরো ধানের চাষ করেছি। এর মধ্যে এবছর আমি বিশ পানিতে (বর্ষার পানি) ৩ পাখি জমিতে আগাম বোরো ধান চাষ করেছি। ধান যখন ফুলে বের হয় তখন ইদুরে কেটে অনেক ধান নষ্ট করে ফেলেছে। এছাড়া শিলাবৃষ্টিতেও ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ফলে আগাম চাষ করা এ ধানের ফলন অর্ধেক কমে গেছে। এতে ধান চাষের খরচ ওঠাই কঠিণ হয়ে পড়েছে। তবে যদি আবহাওয়া অনুকুলে থাকে এবং কোন দুর্যোগ না হয় তা হলে পরে রোপনকৃত ধানের ফলন ভাল হতে পারে। তিনি কৃষি বিভাগের মাঠ কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, কৃষি অফিসের মাঠ কর্মীরা শুধু অফিস এবং সদর এলাকার জমির খোজ খবর রাখেন। কিন্তু নিচু এলাকার জমির কোন খোজ-খবর রাখেন না।
মানিকগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্ত সুত্রে জানা যায়, চলতি বোরো মৌসুমে জেলায় ৫১ হাজার ২৫১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ করা হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লক্ষ ১২ হাজার ৩১ মেট্রিক টন। ইরি-বোরো, বি-২৮, বি-২৯ ধান বেশী আবাদ করেছে এ এলাকার কৃষকরা।  কৃষি কর্মকর্তারা জানান, এ বছর সরকারিভাবে কৃষকদের সার, বীজ ও অন্যান্য উপকরণ বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। তবে মাঠ কর্মীরা সার্বক্ষণিক কৃষকদের অর্জিত ধান ক্ষেত তদারকি চালিয়ে গেছেন এবং কৃষকদের পরামর্শ দিয়েছেন। #