এক মাসেও সিদ্দিক অপহরণ রহস্যের জট খোলেনি

23636_f5বিডি রিপোর্ট 24 ডটকম : এক মাসেও রহস্যের জট খোলেনি ‘বেলা’র নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী এবি সিদ্দিকের অপহরণের ঘটনার। কারা তাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল, কোথায় তাকে রাখা হয়েছিল আর কেনই বা তুলে নেয়া হয়েছিল জানা যায়নি কিছুই। রহস্যের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে পুরো বিষয়টি। এই এক মাসে পুলিশ কোন ক্লু-ই খুঁজে পায়নি। এরই মধ্যে পরিবর্তন হয়েছে মামলার তদন্ত কর্মকর্তার। ফতুল্লা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সাইফুল ইসলাম এ মামলার তদন্ত করছিলেন। সম্প্রতি তিনি বদলি হয়ে যান। মামলার তদন্তভার দেয়া হয়েছে নতুন পরিদর্শক (তদন্ত) এজাজ শফিকে। এদিকে এক মাসেও অপহরণ রহস্যের কোন কিনার করতে না পারায় রিজওয়ানার পরিবারের সদস্যরা এখনও আতঙ্ক দিন কাটাচ্ছেন। ভয়াবহ সেই স্মৃতি আর মনে করতে চান না এবি সিদ্দিক। সবসময় সতর্কাবস্থায় চলাফেরা করছেন সিদ্দিক-রিজওয়ানা পরিবারের সকল সদস্য। বিষয়টি নিয়ে কথা বলতেও আগ্রহ দেখাননি তারা। মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ফতুল্লা থানার ওসি আসাদুজ্জামান জানান, মামলাটির তদন্ত চলছে। কারা এবং কি কারণে তাকে অপহরণ করা হয়েছিল তা জানার চেষ্টা করছে পুলিশ। তবে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত এ বিষয়ে কোন উল্লেখযোগ্য তথ্য হাতে পাওয়া যায়নি বলে স্বীকার করেন তিনি।
গত মাসের ১৬ই এপ্রিল দুপুরে ঢাকা-নারায়গঞ্জ লিংক রোডের ভুঁইগড় এলাকা থেকে অপহৃত হন রিজওয়ানা হাসানের স্বামী এবি সিদ্দিক। পেশায় গার্মেন্ট কর্মকর্তা সিদ্দিক লাল রঙের একটি প্রাইভেট কারযোগে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকায় ফিরছিলেন। হঠাৎ তাদের গাড়িকে পেছন থেকে একটি নীল রঙের হায়েস মাইক্রোবাস ধাক্কা দেয়। গাড়ি থামিয়ে নামার সঙ্গে সঙ্গে ৮-১০ জন যুবক অস্ত্র দেখিয়ে সিদ্দিককে তাদের গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। এ নিয়ে সারা দেশে ব্যাপক তোলপাড়া শুরু হয়। রিজওয়ানা হাসান অজ্ঞাত ১০-১২ জনকে আসামি করে ফতুল্লা থানায় একটি মামলাও দায়ের করেন। অপহরণের ৩৬ ঘণ্টা পর সিদ্দিককে মিরপুরের আনসার ক্যাম্পের সামনে চোখ বাঁধা অবস্থায় নামিয়ে দিয়ে যায় অপহরণকারীরা। বাড়ি ফেরার জন্য পকেটে গুঁজে দেয় ৩০০ টাকা।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অপহৃত এবি সিদ্দিক ফিরে আসার পর তাকে আদালতে নেয়া হয়। তিনি আদালতে ঘটনার বর্ণনা দেন। কিন্তু ওই বর্ণনায় কারা তাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল এবং কোথায় রেখেছিল তা স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি। আদালতে দেয়া জবানবন্দির পর পুলিশ এবি সিদ্দিকের ঢাকার সেন্ট্রাল রোডের বাসায় গিয়ে কয়েক দফায় কথা বলে। কথা বলে রিজওয়ানার সঙ্গেও। এমনকি এবি সিদ্দিক হামিদ ফ্যাশন নামে যে গার্মেন্ট কারখানার নির্বাহী পরিচালক হিসেবে কাজ করেন সেই কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গেও কথা বলে। কিন্তু কোন কূল-কিনারা করা যায়নি।
মামলার সদ্য বিদায়ী তদন্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, ঘটনাটি পুরোপুরি ক্লুলেস। যেখান থেকে তাকে তুলে নেয়া হয় সেখানকার কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু তাদের বর্ণনা থেকেও অপহরণকারী শনাক্ত করা যায়নি। তদন্ত সূত্র জানায়, নীল রঙের যে হায়েস মাইক্রোবাসে তাকে তুলে নেয়া হয় সেটি হানিফ ফ্লাইওভারের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে শনাক্ত করা হয়েছিল ঠিকই কিন্তু অনুসন্ধান করে দেখা গেছে গাড়িটির নম্বর ছিল ভুয়া।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফিরে আসার পর এবি সিদ্দিক ঘটনার যে বর্ণনা দিয়েছেন তা থেকে কোন ক্লু বের করা সম্ভব নয়। কারণ, গাড়িতে তোলার পর তার চোখ বেঁধে ফেলা হয়। সন্ধ্যার মধ্যে তাকে একটি কক্ষে নিয়ে আটকে রাখে অপহরণকারীরা। এর আগে দু’বার ফেরি পার হওয়ার বিষয়টি অনুভব করেছেন তিনি। প্রথমবার ফেরি পার হয়ে তার গাড়িটি পরিবর্তন করা হয়। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজধানীর কাছাকাটি একমাত্র রূপগঞ্জ যেতে একটি ১০ মিনিটের ফেরি পারাপার রয়েছে। তাদের ধারণা, ওই ফেরিটি পার হওয়ার পর গাড়ি পরিবর্তন করা হয়। পরে আবার গাড়িটি পার হয়ে ঢাকার দিকে ফিরে আসে। এরপর ঢাকার উপকণ্ঠ কোন এলাকায় তাকে আটকে রাখা হয়। তবে এবি সিদ্দিক তার ভাষ্যে আটকে রাখার সময় একাধিকবার হেলিকপ্টার উড়ে যাওয়ার শব্দ পেয়েছিলেন- তার কোন খোঁজ করেনি পুলিশ। প্রথম দিকে তদন্ত চলেছে ধারণার ওপর। এক পর্যায়ে তদন্তই থমকে গেছে।
সূত্র জানায়, এবি সিদ্দিকের অপহরণের পর তার গাড়িচালক জানিয়েছিল অপহরণকারীদের সবার চুল ছোট ছোট। সিদ্দিক নিজে বলেছিলেন, সবার বয়স ৩০-৩৫ বছরের, লম্বায় ৫ ফুট ৫-৮ ইঞ্চি ও সুঠাম দেহের অধিকারী। তাদের দেখে মনে হয়েছে তারা প্রশিক্ষিত। এ থেকে ধারণা করা হয়েছিল সরকারের বিশেষ কোন বাহিনী তাকে তুলে নিয়েছিল। পুলিশ এ বিষয়ে কোন অনুসন্ধানের ধারে-কাছেও যায়নি। সম্প্রতি ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের সেই একই রোড থেকে নাসিক প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও এডভোকেট চন্দন সরকারসহ ৭ জন অপহৃত হন। তিন দিন পর তাদের লাশ পাওয়া যায় শীতলক্ষ্যা নদীতে। অভিযোগ ওঠে র‌্যাব ১১-এর কয়েকজন কর্মকর্তা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত। এ কারণে অনেকেই ধারণা করছেন, এবি সিদ্দিক অপহরণের সঙ্গে জড়িতরাই এ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। ঘটনার সময় নারায়ণগঞ্জ পুলিশের শীর্ষ এক কর্মকর্তাও একটি জাতীয় দৈনিকের সাক্ষাৎকারেও এমন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
রিজওয়ানার পরিবারে আতঙ্ক কাটেনি: এদিকে ঘটনার এক মাসেও কোন কূল-কিনারা না হওয়া রিজওয়ানার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে এখনও আতঙ্ক বিরাজ করছে। প্রথম দিকে তার সেন্ট্রাল রোডের বাড়িতে স্থায়ীভাবে পুলিশ প্রহরা বসানো হয়েছিল। এখন সেই প্রহরা নেই তবে সেন্ট্রাল রোড এরাকা পুলিশের টহল নজরদারিতে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয় বলে জানিয়েছেন নিউ মার্কেট থানার ওসি ইয়াসির আরাফাত। এছাড়া রিজওয়ানা নিজে চলাফেরা করছেন গানম্যান নিয়ে। তবু আতঙ্ক কাটছে না তার। পারিবারিক সূত্র জানায়, স্বামী ও পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি রিজওয়ানা নিজেও তার চল ফেরায় নিয়ন্ত্রণ এনেছেন। এমনকি আগের মতো জোরালোভাবে বিভিন্ন অন্যায়ের প্রতিবাদও করছেন না।  যোগাযোগ করা হলে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান তার স্বামীর অপহরণ ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন না হওয়া প্রসঙ্গে বলেন, আপনারা বোঝেন না কেন রহস্য উদ্ঘাটন হচ্ছে না? ভয়ঙ্কর সেই দুঃসময়ের কথা আর মনে করতে চান না জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা পরিবারের সবাই বিষয়টি ভুলে থাকার চেষ্টা করছি।