ডেথ লাইন নারায়নগঞ্জ : দু’জন আত্মসমর্পণ করবেন, একজন পলাতক

23346_f1বিডি রিপোর্ট 24 ডটকম : আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছেন সেনাবাহিনীর দুই কর্মকর্তা। নৌবাহিনীর কর্মকর্তা লে. কমান্ডার এম এম রানার বিষয়ে স্পষ্ট কোন ধারণা পাওয়া যায়নি। নৌবাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো তার অবস্থানের বিষয়ে কোন তথ্য দিতে পারেনি। গত সোমবার উচ্চ আদালতের আদেশের কপি পুলিশ সদর দপ্তর
হয়ে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপারের কাছে যায়। পরে পুলিশ সুপারের নির্দেশে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক মামুনুর রশীদ মণ্ডল সাবেক তিন র‌্যাব কর্মকর্তাকে নিজেদের হেফাজতে নেয়ার জন্য সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে চিঠি দেন। পরে এ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাসহ সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিদের মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন সেনাকর্মকর্তাদের আলোচনা হয়। আলোচনার ভিত্তিতেই অবসরপ্রাপ্ত তিন কর্মকর্তার আত্মসমর্পণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয় বলে সূত্র জানিয়েছে। সার্বিক প্রক্রিয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, আর্মি অফিসারদের গ্রেপ্তার করার বিষয়ে কিছু নিয়ম-কানুন আছে। তারা যেহেতু অবসর প্রস্তুতিকালীন সময় পার করছেন, এ জন্য একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাদের যেতে হবে। তারা হয়তো আগামীকাল (আজ) নিজেরাই আত্মসমর্পণ করবেন।
গত ২৭শে এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড থেকে নাসিক প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও এডভোকেট চন্দন সরকারসহ ৭ জন অপহৃত হন। এর তিন দিনের মাথায় ৩০শে এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদীর চর ধলেশ্বরী এলাকা থেকে ভাসমান অবস্থায় তাদের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নির্যাতনের পর শ্বাসরোধে হত্যা করে লাশ গুমের জন্য প্রতিটি লাশের সঙ্গে ২৪টি করে ইট বেঁধে পানিতে ফেলা হয়েছিল। আলোচিত এ সাত অপহরণের পর থেকেই এর সঙ্গে র‌্যাব-১১ সদস্যদের যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। লাশ উদ্ধারের দিনই র‌্যাব ১১-এর তিন কর্মকর্তা কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল তারিক সাঈদ মাহমুদ, মেজর আরিফ ও লে. কমান্ডার এম এম রানাকে র‌্যাব থেকে প্রত্যাহার করে নিজ নিজ বাহিনীতে ফেরত পাঠানো হয়। গত ৪ঠা মে নিহত নজরুলের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম অভিযোগ করেন, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা নূর হোসেন ওরফে হোসেন চেয়ারম্যানের দেয়া ৬ কোটি টাকার বিনিময়ে র‌্যাব সদস্যরা ৭ জনকে হত্যা করে। পরে প্রত্যাহার করা এ তিন র‌্যাব কর্মকর্তার দু’জনকে অকালীন অবসর ও একজনকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়। হাইকোর্টের নির্দেশে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শাজাহান আলী মোল্লার নেতৃত্বে ৭ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করা হয়। পাশাপাশি র‌্যাবের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত মহাপরিচালক আফতাব উদ্দিনের নেতৃত্বে ৪ সদস্যের গঠিত একটি কমিটিও বিষয়টি অনুসন্ধান করছে। গত রোববার এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত সাবেক ৩ র‌্যাব কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারের আদেশ দেয়। তবে আদেশের তিন দিন পেরিয়ে গেলেও পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করেনি। নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন বলেন, সহসাই আপনারা এর একটি ‘রিফ্লেকশন’ দেখতে পাবেন। আমরা সব সময় ত্রুটিমুক্ত কাজ করার চেষ্টা করি। এ জন্য হয়তো কোন কোন বিষয়ে দেরি হতে পারে।
সূত্র জানায়, সামরিক বাহিনীর কোন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারের আগে কিছু নিয়ম-কানুন অনুসরণ করতে হয়। ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় পুলিশ চাইলেই অভিযান চালাতে পারে না। অভিযানের আগে ক্যান্টনমেন্ট সেনা কর্তৃপক্ষ ও মিলিটারি পুলিশের সহায়তা নিতে হয়। এ কারণে উচ্চ আদালতের আদেশ হাতে পাওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আদেশ মান্য করার বিষয়ে দফায় দফায় বৈঠক করেন। পরে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তে ঊর্ধ্বতন সেনাকর্মকর্তাদের সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলে। পরে উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তে সাবেক তিন র‌্যাব কর্মকর্তা আদালতে আত্মসমপর্ণ করবেন বলে সিদ্ধান্ত হয়। সূত্র জানায়, ঢাকায় কিংবা নারায়ণগঞ্জের যেখানেই তারা আত্মসমর্পণ করুক না কেন আদালতের কাছ থেকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিজেদের হেফাজতে নিয়ে নেবে। তবে এ তিন কর্মকর্তাকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখানো হবে নাকি আলোচিত সেভেন মার্ডারের দুই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হবে তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। গতকাল রাতে পুলিশ সুপারের সঙ্গে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিষয়টি নিয়ে দফায় দফায় কথা বলেন। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, র‌্যাবের সাবেক এ তিন কর্মকর্তাকে জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে।
সূত্র জানায়, নারায়ণগঞ্জের আলোচিত এ সেভেন মার্ডারের ঘটনার অপহরণের ১৬ দিন ও লাশ উদ্ধারের ১৩ দিন পেরিয়ে গেলেও এজাহারভুক্ত কোন আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এজাহারভুক্ত প্রধান আসামি নূর হোসেন ওরফে হোসেন চেয়ারম্যান কলকাতায় পালিয়ে গেছেন বলে র‌্যাব কর্মকর্তারা জানালেও পুলিশ বলছে, নূর হোসেনসহ এজাহারভুক্ত আসামিদের ধরতে জোর প্রচেষ্টা চলছে। এজাহারভুক্ত অপর দুই আসামি হাজী ইয়াসিন ও রাজু সিঙ্গাপুরে পালিয়ে গেছেন জানালেও তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেননি।
সূত্র জানায়, অপহরণের পর ৭ জনকে হত্যার ঘটনায় এ পর্যন্ত ২২ জনকে গ্রেপ্তার করে বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পুলিশ নূর হোসেনসহ এজাহারভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তার করতে মরিয়া হয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালাচ্ছে। জেলা ডিবি পুলিশ পরিদর্শক মামলাটি তদন্ত করলেও দুই অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে গ্রেপ্তার অভিযান কমিটি ও জিজ্ঞাসাবাদকারী কমিটি গঠন করা হয়েছে। দু’দিন ধরে একাধিক টিম নিয়ে বিভিন্ন স্থানে এজাহারভুক্ত আসামি ও নূর হোসেনের সহযোগীদের ধরতে টানা অভিযান চালানো হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জাকারিয়া বলেন, এজাহারভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তার অভিযানের পাশাপাশি নূর হোসেনের আস্তানাতেও অভিযান চালানো হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল নূর হোসেনের বাসার পাশে পুকুরগুলোতে অস্ত্র ও মাদকের খোঁজে তল্লাশি চালানো হয়। তবে কিছু পাওয়া যায়নি।

রানা পলাতক!
র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন নারায়ণগঞ্জ ক্যাম্পের সাবেক প্রধান লে. কমান্ডার এম এম রানাকে নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ধূম্রজাল। নৌবাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এম এম রানাকে খুঁজে না পাওয়া কিংবা তাকে গ্রেপ্তার করতে না পারা বিষয়টি পুলিশের। তাদের বক্তব্য কাউকে অবসরে পাঠানো হলে নৌবাহিনী তার ব্যাপারে কোন খোঁজখবর রাখে না। তাই রানা কোথায় আছেন সে ব্যাপারে তারা কিছু জানেন না। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২৭শে এপ্রিল অপহরণ ঘটনার পর এম এম রানাকে র‌্যাব থেকে নৌবাহিনীতে ফেরত আনা হয়। এরপরই নজরুলের শ্বশুর শহীদ চেয়ারম্যান তার জামাতাসহ ৭ জনকে খুন করার জন্য র‌্যাবের তিন কর্মকর্তাকে সরাসরি দায়ী করেন। সূত্র জানায়, এ অভিযোগ ওঠার পর এম এম রানাকে কঠোর নজরদারির মধ্যে রাখা হয়। তার ওপর কিছু বিধিনিষেধও আরোপ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ৬ই মে মঙ্গলবার তাকে অবসর দেয়া নিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এতে বাধ্যতামূলক অবসরের কার্যকরের তারিখ দেয়া হয় ৫ই মে অপরাহ্ণ থেকে। এর চার দিন পর রোববার হাইকোর্টের বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ রানাসহ তিন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারের আদেশ দেয়। আদেশে বলা হয়, দণ্ডবিধি বা বিশেষ আইনে তাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ পাওয়া না গেলে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করতে হবে। এর পরই রানার ওপর থেকে সব ধরনের নজরদারি উঠিয়ে নেয় নৌবাহিনী। তার ওপর আরোপিত বিধিনিষেধও প্রত্যাহার করে। এ সুযোগটি কাজে লাগায় রানা। অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্তের কাগজপত্র নৌবাহিনীর সদর দপ্তর থেকে উঠিয়ে নিয়ে নরসিংদীর গ্রামের বাড়ি যান তিনি। এরপর তার আর কোন খোঁজ জানে না নৌবাহিনী। এদিকে এম এম রানা পলাতক না আত্মগোপনে তা নিয়ে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)-এর সঙ্গে যোগাযোগ করে বিভিন্ন গণমাধ্যম। তবে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে কোন ধরনের তথ্য জানানো হয়নি। এ প্রসঙ্গে আইএসপিআর’র সহকারী পরিচালক সাইদা তাপসী রাবেয়া লোপার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, নৌ-দপ্তর থেকে সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য আইএসপিআরকে জানানো হয়নি।
র‌্যাবের তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন: ঘটনা তদন্তে র‌্যাব গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের তদন্তের প্রাথমিক অগ্রগতি প্রতিবেদন আজ হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে জমা দিতে পারে। কমিটির একটি সূত্র জানিয়েছে, এ পর্যন্ত অভিযুক্তসহ ১২ জন সদস্যকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে।

নূর হোসেনের সহযোগী রতন ৭ দিনের রিমান্ডে
স্টাফ রিপোর্টার, নারায়ণগঞ্জ থেকে জানান, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারসহ আলোচিত সাত হত্যা মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনের অন্যতম সহযোগী রফিকুল ইসলাম রতনের ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। গতকাল বিকাল ৫টায় নারায়ণগঞ্জ আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শফিকুল ইসলাম আসামি রতনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
নারায়ণগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও ৭ হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ মণ্ডল জানান, সাত খুনের প্রাধান আসামি নূর হোসেনের অন্যতম সহযোগী পরিবহন সেক্টরের চাঁদাবাজ রফিকুল ইসলাম রতনকে  ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠালে আদালত তার ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এর আগে সোমবার বিকাল ৫টায় সিদ্ধিরগঞ্জের আজিবপুর এলাকা থেকে পুলিশের একটি টিম রতনকে গ্রেপ্তার করে।
রতন আন্তঃজেলা ট্রাকচালক ইউনিয়ন শিমরাইল শাখার যুগ্ম সম্পাদক। এ ইউনিয়নের সভাপতি হলেন নূর হোসেন। মূলত রতনকে দিয়েই ট্রাকস্ট্যান্ডে চাঁদাবাজি করাতো নূর হোসেন। রতনসহ সেভেন মার্ডারের ঘটনায় এ পর্যন্ত ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
টিভি চ্যানেলে সমপ্রচার বন্ধ করার অভিযোগ
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বক্তব্য সরাসরি সমপ্রচার করার সময় নারায়ণগঞ্জের ফতল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় কয়েকটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের সমপ্রচার বন্ধ করে দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
নিহত প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন সরকারের বাসায় স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাতের পর খালেদা জিয়ার বক্তব্য কয়েকটি টিভি চ্যানেল সরাসরি সমপ্রচার করে। এ সময় ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় টেলিভিশন চ্যানেলের সমপ্রচার বন্ধ করে দেয়া হয় বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।
এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জের স্যাটেলাইট টিভি সংযোগ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এসবি স্যাটেলাইট কোম্পানির মালিক আবদুল করিমের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।