হত্যার দায় সরকারের : শোকার্ত স্বজনের পাশে খালেদা

23345_f2বিডি রিপোর্ট 24 ডটকম : নারায়ণগঞ্জে ৭ খুনের ঘটনার জন্য দায়ী করে অবিলম্বে বর্তমান সরকারের পদত্যাগ দাবি করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও বিরোধী জোট নেতা খালেদা জিয়া। বলেছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে আছেন শেখ হাসিনা। তাই এ হত্যার দায় তার। শেখ হাসিনাকেই এর জবাব দিতে হবে। তিনি এ খুনের সব কিছু জানেন। খুনিরা চিহ্নিত হওয়ার পরও সরকার তাদের ধরেনি। উচ্চ আদালতের নির্দেশ সত্ত্বে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়নি। খুনি নুর হোসেনকে বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে র‌্যাব। জনগণের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ এ সরকারের অবিলম্বে গুম-খুনের দায়ভার নিয়ে পদত্যাগ করতে হবে। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও এডভোকেট চন্দন সরকারসহ গুমের পর খুনের শিকার ৭ জনের পরিবারকে সমবেদনা জানাতে গিয়ে তিনি এ দাবি জানান। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, খুন, গুমের ঘটনার উল্লেখ করে সরকারের উদ্দেশে খালেদা জিয়া বলেন, সরকার এই হত্যাকাণ্ডের বিচার না করলে সুযোগ পেলে আমরাই এর বিচার করবো।
সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে
নজরুল ইসলামসহ নিহত ৫ জনের পরিবারের সদস্যকে সান্ত্বনা জানাতে গিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, র‌্যাব এবং আওয়ামী লীগ এ গুম ও খুনের জন্য দায়ী। এ হত্যাকাণ্ডে কারা জড়িত তা প্রমাণিত হলেও তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না। এতে প্রমাণ হয়, সরকার খুনিদের মদত দিচ্ছে। এ সরকার একটি খুনি সরকার। তারা র‌্যাবকে দিয়ে হত্যা ও গুমের মহোৎসবে মেতে উঠেছে। এ দায় নিয়ে সরকারকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে। আমি শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী বলবো না। কারণ তিনি অবৈধভাবে ক্ষমতায় এসেছেন। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসেননি। র‌্যাব-এর বিলুপ্তি চেয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, এই বাহিনী এখন জনগণের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে। এদের আর প্রয়োজন নেই। ‘মানুষখেকো’ র‌্যাব যতদিন থাকবে, ততদিন আতঙ্ক থাকবে। শান্তি থাকবে না। নজরুল ইসলামের স্বজনদের সমবেদনা জানিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, আমরা আপনাদের পাশে আছি এবং থাকবো। বিএনপি সবসময় অন্যায়ের বিরদ্ধে প্রতিবাদ করে এসেছে এবং করবে। তাই যতদিন পর্যন্ত এর সুষ্ঠু বিচার না হয় বিএনপি আন্দোলন চালিয়ে যাবে এবং আপনাদের সঙ্গে থাকবে। এর আগে দুপুর ১২টায় নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি এলাকায় নিহত প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের বাসভবনে পৌঁছেন খালেদা জিয়া। নজরুল ইসলামের বাসভবন বুক গার্ডেনে আগেই তার পরিবারসহ নিহত তার বন্ধু তাজুল ইসলাম, মনিরুজ্জামান স্বপন, সিরাজুল ইসলাম লিটন এবং গাড়িচালক জাহাঙ্গীরের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত হন। খালেদা জিয়াকে পেয়ে নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটিসহ নিহতদের স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। এ সময় নজরুল ইসলামের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম, ছোট ভাই আবদুস সালাম ও পরিবারের অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। তারা খালেদা জিয়ার কাছে হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন। খালেদা জিয়া তাদের জড়িয়ে ধরে ও মাথায় হাত বুলিয়ে সমবেদনা জানান। তিনি এসময় সরকারের কাছে নিহতদের পরিবারের ভরণপোষণের দাবি জানান। নজরুল ইসলামের বাড়িতে প্রায় ৪০ মিনিট অবস্থান করেন বিএনপি চেয়ারপারসন। এরপর খালেদা জিয়া অ্যাডভোকেট চন্দন সরকারের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন।
খুনিদের এত শক্তির উৎস কোথায়?
পরে এডভোকেট চন্দন সরকারের পরিবারকে সমবেদনা জানাতে গিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, উচ্চ আদালত দু’দিন আগে খুনিদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু এখনও তাদের গ্রেপ্তার করা হয়নি। র‌্যাবের এত ক্ষমতা! এই ক্ষমতা তাদের কে দিয়েছে? তাদের পেছনে কোন শক্তি আছে? আজকের মধ্যে তাদের গ্রেপ্তার করতে হবে। কারাগারে পাঠাতে হবে। তিনি বলেন, এ ঘটনায় অভিযুক্ত নূর হোসেনকে র‌্যাবই দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে। কিন্তু র‌্যাবের এত ক্ষমতা কোথায়, যে একজনকে তারা দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিতে পারে? র‌্যাবের জড়িতদের বিচার দাবি করে তিনি বলেন, র‌্যাব প্রধানমন্ত্রীর আওতায় নয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে। তাদের এত ক্ষমতা কিভাবে এলো? হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রসঙ্গে খালেদা বলেন, নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার এই পরিবারগুলোর কিছু হলে দেশে আগুন জ্বলবে। এই অবৈধ সরকার এ বিষয়ে কিছু না করলে সুযোগ পেলে আমরাই বিচার করবো। তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জে আসলে ৭ জন নয় ১১ জন খুন হয়েছে। বাকি ৪ জন গরিব বলে তাদের কথা কেউ বলেনি। খালেদা জিয়া বলেন, আইনজীবী চন্দন সরকার ও তার গাড়িচালক এই অপহরণের ঘটনা দেখে ফেলায় তাদের গুম করে হত্যা করা হয়। তাদের কোন দোষ ছিল না।  নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনার তদন্তকাজে সন্দেহ প্রকাশ করে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, নারায়ণগঞ্জের ৭ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে র‌্যাব-১১ জড়িত। র‌্যাব ১১-এর শীর্ষ কর্মকর্তা লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ (সাত খুনের ঘটনায় জড়িত থাকার জন্য অভিযুক্ত) আওয়ামী লীগের এক মন্ত্রীর মেয়ের জামাই। তাকে এখনও জামাই আদরে রাখা হয়েছে। সরকার হত্যাকাণ্ড নিয়ে ধানাই-পানাই, গাফিলতি করছে। এটা পরিষ্কার, সরকার এর সঙ্গে জড়িত। সরকারের হুকুম ছাড়া র‌্যাব এ কাজ করতে পারে না।  অবিলম্বে র‌্যাবের ওই কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার করতে হবে। বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, চন্দন সরকারসহ যে সাতজনকে হত্যা করা হয়েছে তা মেনে নেয়া যায় না। র‌্যাব তৈরি করা হয়েছে মানুষের নিরাপত্তার জন্য। কিন্তু তারা এখন মানুষ খুন করছে। তাই এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে র‌্যাবসহ যারা জড়িত তাদের ধরতে হবে। তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করছি। খালেদা জিয়া বলেন, তারেক সাঈদসহ র‌্যাবের ৩ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করলে সেভেন মার্ডারের রহস্য উন্মোচিত হবে। র‌্যাব-১১ অনেক গুম ও হত্যার সঙ্গে জড়িত উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজধানীর উত্তরা থেকে সুলায়মানকে ধরে নিয়ে হত্যা করে লক্ষ্মীপুরে লাশ ফেলে দেয়া হয়। এ রকম আরও অনেক অভিযোগ আছে। খালেদা জিয়া বলেন, সরকার দেশে খুন ও গুমের রাজত্ব কায়েম হয়েছে। এ অবস্থা চলতে পারে না। এর প্রতিবাদ করতেই হবে। জনগণকে বলবো, আর চোখের পানি নয়, কান্না নয়। রাস্তায় নেমে আসুন, প্রতিবাদ জানান।  নারায়ণগঞ্জের আইনজীবীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আগামী দিনগুলোতে আপনারা যেসব কর্মসূচি দেবেন সেসব কর্মসূচির প্রতি আমার পূর্ণ সমর্থন থাকবে। আমি আপনাদের সঙ্গে আছি। খালেদা জিয়া বলেন, দল ও মত নির্বিশেষে মানবতার স্বার্থে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমরা সবসময় সোচ্চার। দুপুর ১টার দিকে সিদ্ধিরগঞ্জের জালকুঁড়ি এলাকায় চন্দন সরকারের বাড়িতে পৌঁছান তিনি। এসময় খালেদা জিয়াকে পাশে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন নিহতের স্বজনরা। এসময় চন্দন কুমার সরকারের স্ত্রী অঞ্জনা সরকার, মেয়ে ডা. সুস্মিতা সরকার খুনিদের বিচার চান। প্রায় আধাঘণ্টা খালেদা জিয়া চন্দন সরকারের বাসায় তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটান। এ সময় চন্দন সরকারের গাড়িচালক ইব্রাহিমের পরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। পরে আবেগ তাড়িতকণ্ঠে ডা. সুস্মিতা সরকার বলেন, আমরা আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞ।
শহীদ চেয়ারম্যানের প্রশংসায় খালেদা
নারায়ণগঞ্জে প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ সাত হত্যাকাণ্ডের পর সাহসী বক্তব্য দেয়ার জন্য তার শ্বশুর শহীদুল ইসলাম ওরফে শহীদ চেয়ারম্যানের প্রশংসা করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। নজরুলের বাসভবনে নিহত পরিবারদের সান্ত্বনা জানাতে গিয়ে এ প্রশংসা করেন তিনি। খালেদা জিয়া বলেন, নজরুল ইসলামের শ্বশুর আমাকে সব বলেছেন। তিনি সত্য কথাই বলেছেন। সত্য কথা বলার কারণে যদি তাদের গায়ে কোন আঁচড় লাগে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। সাত পরিবারের সদস্যদের হুমকি দেয়া হচ্ছে। এর পরিণাম শুভ হবে না। শহীদুল ইসলামকে তিনি বলেন, হত্যার নেপথ্যে কারা জড়িত এ বিষয়ে আপনি সাহসী বক্তব্য দিয়েছেন। যতই হুমকি দেয়া হোক, এ পরিবারের কিছু হলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। শহীদ চেয়ারম্যানকে অভয় দিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, আপনি নির্ভয়ে বলে যান। আমরা আপনার পাশে আছি। উল্লেখ্য, আলোচিত সাত হত্যাকাণ্ডের পর শহীদ চেয়ারম্যান সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, র‌্যাব ১১-এর সদস্যরা ৬ কোটি টাকার বিনিময়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।
মিজমিজি-জালকুঁড়িতে মানুষের ঢল
এদিকে খালেদা জিয়ার আগমনকে কেন্দ্র করে যাত্রাবাড়ী থেকে মিজমিজি নজরুল ইসলামের বাড়ি পর্যন্ত এবং সাইনবোর্ড হয়ে জালকুঁড়ি চন্দন সরকারের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তার দুইপাশে দলের নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের ঢল নামে। হাতে ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে মুখে স্লোগান দিয়ে তারা খুনিদের বিচার চান। ওদিকে নারায়ণগঞ্জে নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন সরকারসহ নিহত ৭ জনের পরিবারকে সমবেদনা জানাতে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সঙ্গী হন দলের শতাধিক কেন্দ্রীয় নেতা। সমবেদনা জানাতে যাওয়া নেতাদের মধ্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান, তরিকুল ইসলাম, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা, সেলিমা  রহমান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর, শামসুজ্জামান দুদু, ডা. এজেএম জাহিদ হোসেন, যুগ্ম মহাসচিব আমানউল্লাহ আমান, বরকতউল্লাহ বুলু, রিজভী আহমেদ, ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন, নাজিমউদ্দিন আলম, সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, যুবদল সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, শিক্ষা সম্পাদক খায়রুল কবির খোকন, ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, অর্থ বিষয়ক সম্পাদক আবদুস সালাম, মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সম্পাদক ইশতিয়াক আজিজ উলফাত, ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক মাসুদ আহমেদ তালুকদার, সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক আবুল খায়ের ভূঁইয়া, গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া, মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম দলের সভাপতি শামা ওবায়েদ, সহ-ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, স্বেচ্ছাসেবক দল সভাপতি হাবিব-উন নবী সোহেল, ছাত্রদল সভাপতি আবদুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েল, নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপি সভাপতি তৈমূর আলম খন্দকার, সাধারণ সম্পাদক কাজী মনির, সিনিয়র সহ-সভাপতি শাহ আলম, সহ-সভাপতি বদরুজ্জামান খসরু, সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ, শহর বিএনপির সম্পাদক এটিএম কামাল, সাবেক এমপি রেজাউল করিম, গিয়াসউদ্দিন, আতাউর রহমান আঙ্গুর, সোনারগাঁও উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির সভাপতি আব্দুল হাই রাজু, সদস্য সচিব মামুন মাহমুদ ছাড়াও যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদল ও মহিলা দলের কেন্দ্রীয় নেতারা এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ওদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বক্তব্য সরাসরি সমপ্রচার করার সময় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় কয়েকটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের সমপ্রচার বন্ধ করে দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।