টেকনাফে ভেঙ্গে পড়ছে ইয়াবা সম্রাটদের সম্রাজ্য! ক্ষুদ্র পাচারকারীরা মাথাচাড়া

coxএম.শাহজাহান চৌধুরী শাহীন, কক্সবাজার :
জীবনবিধ্বংসী মাদক ইয়াবার আগ্রাসন রুখতে কঠোর হয়েছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চোরাচালান বন্ধে খোদ প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে মনিটর করা হচ্ছে সাম্প্রতিক ইয়াবা বিরোধী অভিযানের অগ্রগতি। তাই দীর্ঘ দিনের সম্রাজ্য হারাতে বসছেন টেকনাফের বহুল আলোচিত ও সমালোচিত ইয়াবা সম্রাটরা।

এদিকে, সব সময় ইয়াবার গডফাদার হিসেবে যার দিকে আঙ্গুল, আলোচিত সেই এমপি আবদুর রহমান বদিও এখন এলাকায় থাকেন না। চিকিৎসার নামে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে ভর্তি আছে । কৌশলে ঢাকায় অবস্থান করছেন বলে সন্দেহ করছেন স্থানীয়রা। ইয়াবা বিরোধী অভিযানে আইন শৃংঙ্খলা বাহিনীর সাথে “বন্দুক যুদ্ধে ” ইতোমধ্যে টেকনাফের ৬ ইয়াবা ব্যবসায়ী নিহত হন। এই ৬ জনের মধ্যে এমপি বদির কাছের দুই ঘনিষ্ট সহযোগী তালিকাভুক্ত ইয়াবা ডিলার জাকু ও নুর মোহাম্মদ অন্যতম। এই অবস্থায় বলা যায় দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজার-উখিয়া ও টেকনাফ জুড়ে যে ইয়াবা সম্রাটদের বিশাল সম্রাজ্য গড়ে উঠেছিলো। তবে তা অনেকটাই ভেঙ্গে পড়েছে।

দীর্ঘদিন রাজত্ব করা ইয়াবা সম্রাটদের অনুপস্থিতিতে মাথাচাড়া দিয়ে উঠার চেষ্টায় রয়েছে অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র পাচারকারীরা। তাদের কেউ কেউ মাঠ দখলে নেওয়ার চেষ্টাও করছেন বলে একাধিক সুত্রে প্রকাশ।

বছরের পর বছর ব্যাপী টেকনাফে তালিকা উৎসব চলত এতোদিন। গোয়েন্দা সুত্রের বরাত দিয়ে সংবাদ মাধ্যমগুলোতে যে তালিকা ছাপায় আর এরপর শুরু হয় কাদা ছোড়াছড়ি। এই বছর গোয়েন্দা সংস্থা বা বিজিবির বরাত দিয়ে ইয়াবা গডফাদারদের পরপর ৩ টি তালিকা সংবাদ ছাপানো হয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে। যদিও মাত্র একটি তালিকার বিষয়ে সত্যতা স্বীকার করেছে কক্সবাজার জেলা পুলিশ।

জেলা পুলিশের একটি দায়িত্বশীল সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালের জুন মাসে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে টেকনাফ সহ কক্সবাজার জেলা পুলিশ, বিজিবি ও পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলার ইয়াবাসহ মিয়ানমার থেকে বিভিন্ন জিনিস বাংলাদেশে চোরাচালানিদের আলাদা আলাদা তালিকা তৈরি করেন।

পূরো ৬ মাস সময় নিয়ে তৈরি করা এই তালিকাগুলো ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হয়। সেই সময় দেয়া বিজিবির গোপন প্রতিবেদনে ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে মিয়ানমারের প্রশাসক শ্রেণীর লোক থেকে নেতা এমনকি সেখানকার গোয়েন্দা ও সামরিক বাহিনীর বেশ কিছু ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়। যারা কোনো ধরণের রাখঢাক ছাড়াই মিয়ানমার ও বাংলাদেশ সীমান্তে ১৫ টি ইয়াবা তৈরির কারখানা স্থাপন করেছে বলে উল্লেখ ছিলো।

তৎকালীন পুলিশ সুপার সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, জেলা পুলিশ ৩২ জনের একটি তালিকা প্রস্তুত করছেন। যাদের মধ্যে বাংলাদেশিসহ বেশ কিছু রোহিঙ্গাও রয়েছেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় ইয়াবা ব্যবসায়ী হিসেবে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সাংসদ আবদুর রহমান বদির পাঁচ ভাই আবদুল আমিন, মোহাম্মদ ফয়সাল, শফিকুল ইসলাম, মৌলভী মুজিবুর রহমান ও আবদুস শুক্কুর, সাইফুল করিমের নাম রয়েছে। আরও কয়েকজনের নাম রয়েছে, যাঁরা রাজনৈতিকভাবে সাংসদের ঘনিষ্ঠ।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, সাংসদের দুই ভাই আবদুল আমিন ও আবদুস শুক্কুর ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ফ্ল্যাট কিনে সপরিবারে বসবাস করেন। বাকি তিন ভাই থাকেন টেকনাফে। এ ছাড়া তালিকাভুক্ত ইয়াবা ডিলার বন্দুক যুদ্ধে নিহত জাহিদ হোসেন ওরফে জাকু বদির ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত। জাহিদ হোসেনের ছেলে রাফচানের নামও তালিকায় আছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় আরও আছে পৌর কাউন্সিলর ও টেকনাফ উপজেলা যুবলীগের সভাপতি একরামুল হক ও সাধারণ সম্পাদক নূর হোসেন এবং উপজেলা চেয়ারম্যান শফিক মিয়ার জামাতা নূর হোসেনের নাম।

তালিকায় আরও আছেন টেকনাফ সদর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জাফর আহমদ, তাঁর দুই ছেলে দিদারুল আলম ও মোস্তাক আহমদ, হ্নীলার মৌলভীপাড়ার আবদুর রহমান, লেদা এলাকার দুই ভাই নুরুল হুদা ( কারান্তরিন) ও বন্দুক যুদ্ধে নিহত নূর মোহাম্মদ, নাজিরপাড়ার ছৈয়দ হোসেন, সিকদারপাড়ার শামসুল আলম ওরফে বার্ম্যাইয়া শামসু ও হাবিরপাড়ার সিদ্দিক মিয়া। তাঁরা সবাই সাংসদ বদির ঘনিষ্ঠ ও আশীর্বাদপুষ্ট বলেই পরিচিত।

সূত্র জানায়, শাহপরীর দ্বীপের মো. ইসমাইল ইয়াবাসহ র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তারের দুই মাস পর জামিনে বেরিয়ে আবার ইয়াবা ব্যবসায় নেমে পড়েন। আরেক ইয়াবা ব্যবসায়ী জহিরুল ইসলাম বিজিবির হাতে গ্রেপ্তারের তিন মাস পর জামিনে মুক্তি পান।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, টেকনাফের আওয়ামী লীগের নেতা ও জিপচালক নুরুল হুদা ( কারান্তরিন) ইয়াবা ব্যবসা করে লেদা বাজারে দোতলা আলিশান বাড়ি করেছেন। দমদমিয়া বিওপির পাশে করেছেন তিনতলা হোটেল। কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কে চলাচল করে তাঁর ১৯টি যাত্রীবাহী বাস। নিহত নুর হোছেন সহ তিন ভাইয়ের বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় ১৯টি ইয়াবা মামলা আছে।

সুত্র মতে , পুলিশ ও বিজিবির তৈরী করা এই প্রতিবেদন পাওয়ার পর মন্ত্রণালয় তা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো হয়। এরপরই কক্সবাজার অঞ্চলে মাদক চোরাচালান শেকড় সমূলে উপড়ে ফেলার কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে মাদক আগ্রাসন অভিযান নিয়মিত পর্যবেক্ষনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র গুলো এতথ্য নিশ্চিত করেন।

একটি দায়িত্বশীল সুত্রে জানা গেছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে অতিরিক্ত সচিবপদ মর্যাদার একজন কর্তা পুরো এক সপ্তাহ কক্সবাজার তথা টেকনাফের অবস্থা পর্যবেক্ষনে আসেন এবং কক্সবাজার জেলা প্রশাসক ছাড়া আর কেউ বিষয়টি জানতেন না। মুলত সে সময় ইয়াবার আগ্রাসন বন্ধে প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর ছকটি বানানো হয়। সে মতে শুরু হয় প্রশাসনের ইয়াবা বিরোধী অভিযান।

মাদক চালানকারীদের নিয়ন্ত্রন করতে না পারলে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেওয়ার কঠোর নির্দেশনাও ছিলো অভিযানে। এর ধারাবাহিকতায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন এক সময়ের ত্রাস জাহিদ হোসেন ওরফে জাকু, নুর মোহাম্মদ সহ শীর্ষ ৬ মাদক সম্রাট। জাকু ও ফরিদ আহমদ নিহত হওয়ার পরের দিনই জাকুর নিয়ন্ত্রিত ঘাটে উদ্ধার করা হয় ৬১ হাজার ইয়াবা।

অপরদিকে মাদক চোরাকারবারিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকায় বদলি করা হয় জেলার চকরিয়া, কক্সবাজার সদর, রামু, উখিয়া ওটেকনাফ থানার  অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কে। সর্বশেষ তথ্য অনুজায়ী আরও ১৬ জন উপ পরিদর্শক (এসআই), ১৭ জন  সহকারী উপ পরিদর্শক (এএসআই) এবং ৭৪ জন কনস্টেবলের বদলি করা হয়। জেলা পুলিশ সুপার তোফায়েল আহমদ এই বদলির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

টেকনাফ মাদক ব্যবসায়িদের সিন্ডিকেট ভাঙ্গতে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে গেলে একমাসে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহরেতর সংখ্যা দাঁড়ায় ৬ জনে। আর এরপর একরকম জনশুন্য হয়ে পড়েছে টেকনাফ। এতোদিন প্রাসাদপ্রমো বাড়ী, বাহারি গাড়ি, দামি পোশাক পরে ঘুরে বেড়ানো ইয়াবা স¤্রাটদের কেউ এখন আর এলাকায় নেই। কেউ ছুটেছে ইয়াবা পাচারকারীর তালিকা হতে নাম কাটাতে। আবারও কেউ কেউ সরে পড়েছে। অনেকে কারাগারকে নিরাপদ মনে করে আদালতে আত্মসর্ম্পন করে কারান্তরীন রয়েছে। অনেক তালিকাভুক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ী মালয়েশিয়াসহ বিভিন্নদেশে পালিয়েও গেছেন। এমন কয়েক জনের মধ্যে দীর্ঘদিন নিরবে ইয়াবা ব্যবসা করে আসা সাইফুল করিমও রয়েছে।

প্রশাসনের ধড়পাকড় অভিযান চললেও ইয়াবা পাচার বন্ধ হচ্ছে না। গত ৭মে বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে দমদমিয়া চেকপোষ্ট এলাকা থেকে ২ হাজার পিস ইয়াবাসহ আমজাদ হোসেন (৪২) নামে এক ব্যক্তিকে আটক করেছে বিজিবি। ১০ মে টেকনাফ থানা পুলিশ ে পৌর এলাকার পুরাতন পল্লান পাড়ায় খালেদার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ৩০০ পিচ সহ খালেদা বেগম আটক করেন।

এরপরও স্থানীয়সূত্র অনুযায়ী যেখানে রাঘব বোয়ালরা নিরুদ্দেশ সেখানে এই চালান কে হ্যান্ডেল করছে জানবার জন্য রওনা দিলাম ঘটনাস্থলের উদ্দেশে। তবে সেখানে গিয়ে তেমন কোন তথ্য না মিললেও, খোজ মিললো এমন একজনের যে এতদিন ইয়াবার খুচরা বিক্রেতা থাকলেও এখন নতুন ইয়াবা সম্রাজের পাইকারী ডিলার হবার স্বপ্ন দেখচ্ছেন। শফিক নামের ওই যুবকের কাছ থেকে জানা গেলো নতুন ইয়াবা সম্রাজ্যের অনেক অজানা তথ্য।

এদিকে, ইয়াবা ব্যবসায় চুনোপুটিরা পালিয়েছে। বড় বড় অনেক ইয়াবা ব্যবসায়ী এখনো সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে ইয়াবা পাচার অব্যাহত রেখেছে।

সুত্র মতে, বান্দরবান পার্বত্য জেলা হতে টেকনাফ পর্যন্ত ২৫১ কিলোমিটারনৌ ও স্থল সীমান্ত এলাকা । তবে পালংখালী ঘাট হতে সেন্টমার্টিনের ছেড়া দ্বীপ পর্যন্ত ৫৬ কিলো মিটার সীমান্ত পথ। পুরো এই সীমান্ত এলাকার বেশীর ভাগ এলাকা অরক্ষিত  রয়েছে। পুরো সীমান্ত অরক্ষিত রেখে শুধু টেকনাফের দিকে নজর দিলে ইয়াবা পাচার বন্ধ হবে না। পাশাপাশি পার্বত্য এলাকা সহ পুরো সীমান্তের ২৫১ কিলোমিটার নৌ-স্থল পথের দিকে নজর কঠোর দেওয়া দাবী সচেতন মহলের।