যে কোন সময় গ্রেপ্তার র‌্যাবের তিন কর্মকর্তা

23056_trবিডি রিপোর্ট 24 ডটকম : নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠার পর অবসরে পাঠানো সশস্ত্রবাহিনীর তিন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। র‌্যাব ১১-এর সাবেক এ তিন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারে পদক্ষেপ নিতে আইজিপিকে বলা হয়েছে। দ-বিধির সুনির্দিষ্ট ধারায় অভিযোগ না থাকলে তাদের ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যাদের গ্রেপ্তার করতে বলা হয়েছে তারা হলেন র‌্যাব ১১-এর সাবেক কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মাহমুদ, মেজর আরিফ হোসেন এবং লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এম এম রানা। বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার এবং বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল এ আদেশ দেয়। কোর্টের নির্দেশনা রাতেই পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে আদালত এবং পুলিশ সূত্রে তা জানা গেছে। রোববার দুপুরে আদালতের আদেশ হওয়ার পর তা সুপ্রিম কোর্টের ফৌজদারি বিবিধ শাখার সুপারিনটেনডেন্ট মোহাম্মদ হোসেন মিয়া ফ্যাঙযোগে আইজিপি বরাবর পাঠান। আদালতের নির্দেশনা পাঠাবার তথ্য গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্টার একেএম শামসুল ইসলাম। এর আগে দুপুরে আদালত র‌্যাবের অভিযুক্ত তিন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিলে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, নির্দেশনার কপি হাতে পেলেই ব্যবস্থা। নির্দেশনার কপি পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানোই র‌্যাবের অভিযুক্ত তিন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারে আর কোন বাধা রইলো না।
ওদিকে হাইকোর্টের দেয়া রায়ে তিন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশের পাশাপাশি মানুষের জীবনের নিরাপত্তা প্রশ্নে রুলও জারি করেছে হাইকোর্ট। রুলে সংবিধানের ৩১, ৩২, ৩৬, ৪২ অনুচ্ছেদে বর্ণিত জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষায় পুলিশ, র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাগত দায়িত্ব পালনে বিদ্যমান আইন সংশোধন, হালনাগাদ করার নির্দেশ কেন দেয়া হবে না তা জানতে চাওয়া হয়েছে। এছাড়া জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষায় আইনের দুর্বলতা সংশোধন, দ্রুত ও যথাযথ পদক্ষেপ নিতে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না তা-ও জানাতে বলা হয়েছে। দু’সপ্তাহের মধ্যে স্বরাষ্ট্রসচিব, আইনসচিব, জনপ্রশাসন সচিব ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জে নিহত চন্দন সরকারের জামাতা ডা. বিজয় কুমার পাল, নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন খান ও ‘আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী’র নির্বাহী সভাপতি মাহবুবুর রহমানের দায়ের করা একটি রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট এ আদেশ দেয়। রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী ড. কামাল হোসেন। আদেশের সময় হাইকোর্ট বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারপতি বলেন, ওই তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরকার নিশ্চয়ই কোন ইনডিকেশন পেয়েছে। না হলে তো তাদেরকে অবসরে পাঠানো হতো না। তিনি বলেন, হাইকোর্টের অন্য যে বেঞ্চ এ ব্যাপারে আদেশ দিয়েছে তাদের সামনে হয়তো বিষয়টি ছিল না। না হয় ওই বেঞ্চও গ্রেপ্তারের আদেশ দিতো। গত ২৭শে এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাত জনকে অপহরণ করা হয়। তিন দিন পর শীতলক্ষ্যা নদীতে তাদের লাশ ভেসে ওঠে। এরপর নিহত নজরুল ইসলামের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম অভিযোগ করেন, নারায়ণগঞ্জের আরেক কাউন্সিলর নূর হোসেন ও তার সহযোগীদের কাছ থেকে ছয় কোটি টাকা নিয়ে র‌্যাব সদস্যরা তার জামাতাসহ সাত জনকে ধরে নিয়ে হত্যা করেছে। ওই অভিযোগ ওঠার পর গত ৭ই মে তিন কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে অবসর দেয়া হয়। হাইকোর্টের আরেকটি বেঞ্চের আদেশে সরকারি তদন্ত কমিটি এ ঘটনা এরই মধ্যে তদন্ত শুরু করেছে। নায়াণগঞ্জের ঘটনা ও সার্বিক বিষয়ে দায়ের করা গতকালের রিট আবেদনের শুনানিতে ড. কামাল হোসেন বলেন, বেঁচে থাকার অধিকার মানুষের সবচেয়ে বড় অধিকার। সংবিধানের ৩১, ৩২, ৩৬, ৪২ অনুচ্ছেদে মানুষের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়া আছে। সংবিধানের ৪৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এসব অধিকার কার্যকরের জন্য দেশের যে কোন নাগরিকের হাইকোর্টে আসার অধিকার রয়েছে। তিনি বলেন, দেশে একের পর এক গুম, অপহরণ, হত্যার ঘটনা ঘটছে। এ অবস্থায় আমরা অসহায় হতে পারি না। ড. কামাল হোসেন বলেন, এর আগে আইনজীবী এ বি সিদ্দিককে অপহরণ করা হয়েছিল। সৌভাগ্যবশত আমরা তাকে ফেরত পেয়েছি। চন্দন সরকার একজন সজ্জন ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির আইনজীবী। তাকে দিনদুপুরে অপহরণ করা হয়। অপহরণের তিন দিন পর শীতলক্ষ্যায় তার লাশ পাওয়া যায়। ইট বাঁধা সে লাশ। যে লাশের পেট কেটে দেয়া হয়েছে। আরও ছয় জনের লাশ পাওয়া যায় একই ভাবে। তাদের একজন জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি। তিনি বলেন, আমাদের আইনজীবীদের মধ্যে নানা ব্যাপারে মতবিরোধ রয়েছে। কিন্তু চন্দন সরকার হত্যার বিচার প্রশ্নে আমরা সব আইনজীবী এক হয়েছি। এ হত্যার বিচার অবশ্যই হতে হবে। তিনি বলেন, আদালত বলতে পারেন, অন্য একটি বেঞ্চ আদেশ দিয়েছে, সেখানে আরেকটি বেঞ্চে আবেদন নিয়ে আসেন কিভাবে? আমি মনে করি, যুক্তি উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে আপনাদের সন্তুষ্ট করতে পারবো। আইনের মধ্যে দুর্বলতা, ঘাটতি, অসঙ্গতি থাকার কারণে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী সঠিক ভূমিকা রাখতে পারে না। আবার অনেক ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কিছু বলা না থাকার কারণে লাগামহীন ক্ষমতার অপব্যবহার করে তারা। যেমন র‌্যাব গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছাড়াই লোকদের ধরে নিয়ে আসছে। যে কাজ পুলিশের সে কাজ করছে র‌্যাব। হাইকোর্টকে উদ্দেশ্যে করে ড. কামাল হোসেন বলেন, আপনারা হলেন সাংবিধানিক আদালত। জনগণের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে আপনারা আদেশ দিতে পারেন। তিনি বলেন, মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বিভিন্ন সময়ে হতাশার সুরে বলেছেন, তার আইনগত ক্ষমতা কম। তার কিছু করার নেই। আদালতের এ ব্যাপারে ভূমিকা নেয়া উচিত। মানবাধিকার কমিশনকে দোষী হিসেবে বিবাদী করা হয়নি। বরং, যাতে কমিশন আইন প্রণয়নে ভূমিকা রাখতে পারে সেজন্যই তাদের বিবাদী করা হয়েছে। ড. কামাল হোসেন বলেন, আমার চিন্তা হচ্ছে- কিভাবে র‌্যাবকে আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা যায়। সে সৎ চেষ্টাই এখন করছি। সংবিধান অনুযায়ী কারও লাগামহীন ক্ষমতা নেই। তিনি বলেন, সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্র যথাযথ ভূমিকা পালন করবে বলে সংবিধান নিশ্চয়তা দিয়েছে। এ ব্যাপারেই যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। শুধু এই ২৭শে এপ্রিলের ঘটনাই নয়, এর আগেও বিনাবিচারে হত্যা, খুন ও গুমের ঘটনা ঘটেছে। এ ধরনের ঘটনায় অনেকের লাশ পাওয়া গেছে। অনেকের যায় নাই। সকালে ৭ খুনের তদন্ত পর্যবেক্ষণে একটি বিচার বিভাগীয় কমিশন চেয়ে রিটটি করা হলেও পরে আদালতে বসেই আবেদনকারী আইনজীবীরা রিট আবেদন সংশোধন করেন। সংশোধিত ওই রিটের আর্জিকে কিছুটা পরিবর্তন করে আদালত আদেশ দেয়। প্রসঙ্গত, র‌্যাব-১১ এর সাবেক কমান্ডার তারেক সাঈদ ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার জামাতা। তার বিরুদ্ধে লক্ষ্মীপুর ও লাকসামে বিএনপি নেতা হত্যার অভিযোগ এরই মধ্যে উত্থাপিত হয়েছে।