বাংলাদেশের জন্য মমতার মমতা!

22907_f4বিডি রিপোর্ট 24 ডটকম : অলিখিত অঘোষিত কিন্তু অনির্দিষ্ট নয়। তিস্তাচুক্তি প্রতিহতকারিনী মমতা ব্যানার্জি এখন অনেক পর্যবেক্ষকের চোখে ভারতে বাংলাদেশের ‘গুডউইল অ্যাম্বাসেডর’- শুভেচ্ছা রাষ্ট্রদূত। তিনি সেই মমতাই। যিনি প্রধানমন্ত্রী মনোমোহনকে তার ঢাকা সফরের আগে তিস্তা প্রশ্নে রুষ্ট করেছিলেন। গতকাল দিল্লি ভিত্তিক ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি রিসার্চ ফাউন্ডেশনের পরিচালক অনির্বাণ গাঙ্গুলি এক নিবন্ধে মমতাকে তুলোধুনো করেছেন। বলেছেন, বাংলাদেশীদের বিতাড়নের কথা বলে মোদি ঠিক কথাই বলেছেন। এই নীতি বাস্তবায়ন ঘটানো ভারতের স্বার্থে দরকারি।
বাংলাদেশ যে একথা এতকাল দিল্লিকে  বোঝাতে গলদঘর্ম হয়েছে, সেই কূটনৈতিক যুক্তি মমতা নিজেই কণ্ঠে তুলে নিয়েছেন। মোদির মন্তব্যের যে কথা বাংলাদেশ সরকারের বলার ছিল। তারা বলেনি। নীরব থেকেছে। মোদি ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশী বহিষ্কারের আলটিমেটামের মুখে মমতাই এগিয়ে এলেন। এ ইস্যুতে বামপন্থি মুখ্যমন্ত্রীর সর্বশেষ অবস্থান ছিল বিজেপি এবং মমতার অতীত অবস্থানের কাছাকাছি। সেদিক থেকে মমতা ১৮০ ডিগ্রি অ্যাবাউট টার্ন করেছেন। আশা করা চলে তিস্তায় অটল থাকলেও মমতা বাংলাদেশ কার্ড খেলবেন না। মমতা বলেছেন, মি. মোদি, বাংলাভাষী মানে বাংলাদেশী নয়। আবদুস সামাদ আজাদের নামে এ শিরোনাম আগে ঢাকার কাগজে ছাপা হয়েছে। ‘১৯৭১ সালের মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির অধীনে বাংলাদেশীরা ভারতে এসেছে’, যুক্তি দিচ্ছেন মমতা।
কাল থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বাংলাদেশ প্রীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকেই ভাবতে বসবেন। কাল নির্বাচনযজ্ঞ শেষ। তবে নির্বাচন ফলাফল যা-ই হোক, তিস্তা চুক্তি না-ও হতে পারে, নতুন সরকার এলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক যেদিকেই মোড় নিক, নির্বাচন প্রচারণা বাংলাদেশকে অন্তত একটি কূটনৈতিক স্বস্তি এনে দিয়েছে। এখন এর আয়ুষ্কাল কি হবে সেটাই প্রশ্ন। ভোটের বাতাস মিলিয়ে যেতেই কি মমতা ঘুরে দাঁড়াবেন? কিংবা ভক্তদের সামনে সেই পুরনো স্বরূপে দর্শন দেবেন?   নরেন্দ্র মোদি ছাড়া পশ্চিমবঙ্গে অবৈধ বাংলাদেশী কার্ড এবার কেউ খেলেননি। এর অর্থ দাঁড়ালো অনুপ্রবেশ কার্ড পশ্চিমবঙ্গে কেউ খেলতে চাননি। তাহলে অনেকে ভাবতে পারেন, দিল্লিতে যারাই আসুক, এমনকি মোদি এলেও পশ্চিমবঙ্গকে ত্যক্ত বিরক্ত করে এই ইস্যুতে মমতাকে ঘাঁটানোর আগে দু’বার ভাববে দিল্লি। অবশ্য পরিবর্তিত অবস্থায় মমতার বাংলাদেশ বাঁশি থেমে গেলেও অবাক হওয়ার থাকবে না। অনুপ্রবেশ ইস্যুতে বাংলাদেশ ভারতের রাজনীতিকদের কাছে ‘ঝোলের লাউ অম্বলের কদু’।
২০০৫ সালের আগস্ট। স্থান লোকসভা। মমতা প্রস্তাব আনতে চান, বাংলাদেশের অবৈধ অভিবাসী আলোচনা করতে হবে। ততক্ষণে এ ইস্যুতে চার ঘণ্টার একটা আলোচনা হয়ে গিয়েছে। স্পিকারের আসনে বসেছিলেন ডেপুটি স্পিকার সিএস আর্টওয়াল। মমতা যুক্তি দিয়েছিলেন, বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ অভিবাসীরা পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকার অংশ। রাজ্য সরকারের এ বিষয়ে কিছুই করণীয় নেই। সুতরাং এটা অবশ্যই আলোচিত হতে হবে। ডেপুটি স্পিকার যখন চার ঘণ্টার আলোচনার কথা স্মরণ করিয়ে দেন,  ক্রুদ্ধ মমতা তখন ডেপুটি স্পিকারের দিকে ফাইল ছুড়ে মারেন। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘আমি যখনই কোন ইস্যু তুলতে চাই তখন আমাকে কথা বলতে দেয়া হয় না। এ পার্লামেন্টের একজন সদস্য হিসাবে আমি আমার জনগণের কথা তুলে ধরার অধিকার রাখি।’
অনেকের মতে দিদি হলেন অতীত ভুলে যাওয়ার নেত্রী। কখন কোনটা ভুলে যেতে হবে, কখন কোনটা স্মরণে আনতে হবে, সেটা ওঁর করায়ত্ত। এখন নরেন্দ্র মোদি যখন অবৈধ বাংলাদেশী ইস্যু সামনে এনেছেন, অর্থাৎ ভোটের রাজনীতি করছেন, তখন মমতা দেখছেন কার কার্ড কে খেলছে?  গান্ধীবাদী নেতা ছিলেন সাবেক ডিআইবি টিভি রাজেশ্বর। ১৯৮৯-৯০ সালে তিনি ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের গর্ভনর। পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে অবৈধ মুসলিম অভিবাসীদের স্রোত প্রকারান্তরে ‘তৃতীয় ইসলামী প্রজাতন্ত্র’ অভ্যুদয় ঘটাবে বলে তিনি আশঙ্কা করেছিলেন। এবং তিনি দেখেছিলেন, এ অবৈধ অভিবাসনের ঢেউ কেবল জাতীয় নয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য একটি ‘মারাত্মক হুমকি’। তখন এ দৃষ্টিভঙ্গির জন্য তাকে কেউ ফ্যাসিস্ট বলেনি। কেউ তাকে সাম্প্রদায়িক কিংবা সংখ্যালঘু ঘৃণাকারী আখ্যা দেয়নি। অবশ্য পরে মি. রাজেশ্বর এ বিষয়ে আর সোচ্চার থাকেননি। তার কণ্ঠ স্তিমিত হয়েছিল। অনুপ্রবেশ এবং উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় ভারতের ওপর তার প্রভাব সম্পর্কে আর মন্তব্য করেননি।
জ্যোতি বসু একটা দীর্ঘ সময় এ ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রতি সহানুভূতিশীল নীরবতা পালন করেছেন। এমনকি সিপিআইএম-এর রাজনৈতিক দর্শনেও বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ পেতো। এরপরে বামপন্থি মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এ ইস্যুতে বিজেপির সঙ্গে কোরাস ধরলেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এবং স্বররাষ্ট্রমন্ত্রী এল কে আদভানির কাছে তুলেছেন। তিনি বলেছেন, অবৈধ বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ বড় বেকায়দায় আছে। এ সমস্যা বিরাট সামাজিক ও নিরাপত্তাগত সমস্যা বয়ে এনেছে পশ্চিমবঙ্গে। বুদ্ধদেবকে তখন কেউ উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীল সরকারের সঙ্গে দহরম মহরমের জন্য কটুকাটব্য করেনি।
বুদ্ধদেব কি মনে করে বুঝতে পারলেন, বাংলাদেশ থেকে আসা ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের’ সিপিআইএম দীর্ঘকাল যে মদত দিয়েছে তা এখন গলার কাঁটা হয়ে বিঁধছে। তিনি একদা প্রকাশ্যে এ ঘোষণাও দিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশ-পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা মাদরাসা তিনি নিয়ন্ত্রণ করবেন। কিন্তু প্রয়াত বামপন্থি নেতা অনিল বিশ্বাস বুদ্ধদেবকে এনিয়ে কঠোর অবস্থানে যেতে দেননি। বুদ্ধদেবকে অবশ্য এজন্য মোদির মতো সাম্প্রদায়িক বলা হয়নি।
ভারতের সাবেক সেনাবাহিনী প্রধান শংকর রায় চৌধুরী পার্লামেন্ট সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যু তুলেছিলেন। মমতা ব্যানার্জি রাজ্যসভায় চৌধুরীর প্রার্থিতাকে সমর্থন দিয়েছিলেন। কিন্তু মমতাও ঘুরে দাঁড়ান। মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ দেখানোর জন্য মমতা সাবেক সেনাপ্রধানকে অভিযুক্ত করেন।
২০০৮ সালে দিল্লির হাইকোর্ট ভারতের জাতীয় রাজধানীতে ক্রমবর্ধমান অবৈধ অভিবাসীদের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। দিল্লি হাইকোর্টের মতে এটা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, জাতীয় রাজধানীতে ক্রমবর্ধমান হারে অবৈধ অভিবাসীদের সংখ্যা বৃদ্ধি আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি এক বিরাট হুমকি বয়ে আনছে।
মমতা ব্যনার্জিকে এখন বাংলাদেশের অভিবাসীদের পক্ষাবলম্বনকারী হিসেবে চিত্রিত করা হচ্ছে। এজন্য তাকে গঞ্জনাও সইতে হচ্ছে। বিজেপির প্রপাগান্ডা মেশিন এখন এসব তথ্য স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলছে নরেন্দ্র মোদি যথার্থ বক্তব্যই দিয়েছেন। তারা বলছেন, বিজিপি হচ্ছে সেই রাজনৈতিক দল, যারা বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়ায়, তাদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়,    তাদেরকে আশ্রয় দেয়ার কথা ভাবে। অন্যদিকে মমতা বাংলাদেশের নির্যাতিত হিন্দুদের বিষয়ে কখনও সোচ্চার হননি। যেসব উদ্বাস্তু পশ্চিমবঙ্গে এসে জায়গা করে নিয়েছে তারা তাদের জীবনে কি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে তা নিয়ে তার কোন ভাবনা নেই। নিজের কমিউনিস্ট প্রতিদ্বন্দ্বীর মতোই মমতা কেবলই অবৈধ অনুপ্রবেশকারী কার্ড খেলতে চান। তিনি সব সময়ে রাজনৈতিক ফায়দা নেন যখন যেভাবে লাগে।