দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্প স্বপ্ন ফিকে যাচ্ছে, ভিত্তিপ্রস্তরেই শেষ

coxএম.শাহজাহান চৌধুরী শাহীন, কক্সবাজার :
সহসাই বাস্তবায়ন হচ্ছে না দোহাজারি-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্পটি। যদিও এ রেললাইনকে ঘিরে স্বপ্নের শেষ নেই দক্ষিণ চট্টগ্রাম তথা কক্সবাজারবাসীর। শুধুই কি দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষ! দেশবাসীর প্রবল আগ্রহ রয়েছে এই রেললাইন নিয়ে। আশায় বুক বেঁধেছিলেন ট্রেনে চড়ে চট্টগ্রাম থেকে পর্যটন শহর কক্সবাজারে যাওয়া আসা করবেন তারা। আবার কক্সবাজারবাসীও অনুরূপভাবে যাতায়ত করবে। দিন যত যাচ্ছে তাদের সেই স্বপ্ন ফিকে হয়ে যাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্প হলেও মহাজোট সরকার দ্বিতীয় মেয়াদে আবারও ক্ষমতায় এসেছে। বাকি মেয়াদে এ প্রকল্পের কাজ আদৌ শুরু করা যাবে কি-না তা নিয়ে রয়েছে যথেষ্ট সন্দেহ-সংশয়। এখনও পর্যন্ত অর্থের সংস্থান হয়নি প্রকল্পটির। ২০১১ সালের ৩ এপ্রিল কক্সবাজারের ঝিলংজা নামক স্থানে রেললাইন সম্প্রসারণ প্রকল্পটির ভিত্তিফলক উন্মোচন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

গত মাস দু’য়েক আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবারও ঘোষণা দিয়েছেন রেললাইন প্রকল্প বাস্তবায়নের।

চট্টগ্রাম দোহাজারী -কক্সবাজার রেললাইন সম্প্রসারণ কাজের বিষয়ে অনুসন্ধানে জানা যায়, এ রেললাইন নিয়ে অনিশ্চয়তার একমাত্র কারণ অর্থ সংকট। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে দরকার সাড়ে ১৮শ’ কোটি টাকা। এডিবি, চীনসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থা প্রথম দিকে এ প্রকল্পে অর্থায়নের ব্যাপারে আগ্রহ দেখালেও পরে তারা সরে যান।

সর্বশেষ গত ৮ মে বৃহস্পতিবার কক্সবাজার জেলা প্রশাসক সম্মেলণ কক্ষে অনুষ্ঠিত দোহাজারী-কক্সবাজার-রাম -ঘুমধুম হয়ে মিয়ানমার পর্যন্ত রেললাইন বাস্তবায়ন কমিটির মতবিনিময় সভায় কবে নাগাদ এই প্রকল্প শুরু হবে সে বিষয়ে কোন কিছু বলা হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে, অর্থসংকটের কারণে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়নি। ভূমি অধিগ্রহণ কাজ শুরুর পরই স্থগিত হয়ে যায়।

তবে রেলওয়ে সূত্র জানায়, বিগত মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর দোহাজারী থেকে রামু, কক্সবাজার ও ঘুমধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন বা মিটারগেজ রেলপথ নির্মাণের একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। এই প্রকল্পটি ২০১০ সালের ৬ জুলাই একনেকে অনুমোদন লাভ করে। প্রানমন্ত্রী ‘দোহাজারী-ঘুমধুম রেললাইন’ নামের এই প্রল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন ২০১১ সালের ৩ এপ্রিল। কিন্তু প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ করতে গিয়ে বরাদ্দ সংকটে বিপাকে পড়ে সংশ্লিষ্টরা। অবশেষে ২০১২ সালের ৫ নভেম্বর রেল বিভাগের এই প্রকল্পের মহাব্যবস্থাপকের পক্ষে খায়রুল আলম কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক বরাবরে লিখিত এক পত্রে (স্মারক নং ইএনসি/পি/দোহা-কক্স/জি/২) উল্লেখ করেন, ২০১১-১২ অর্থ বছরে মাত্র ২২ লাখ টাকা এবং ২০১২-১৩ অর্থ বছরে মাত্র ১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। এ স্বল্প বরাদ্দ হতে ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় মেটানো সম্ভব নয়। তাই ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

কক্সবাজার সোসাইটির সভাপতি কমরেড গিয়াস উদ্দিন সভাপতি জানান, দোহাজারী হতে কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণ সময়ের দাবি ছিল। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার যখন ক্ষমতায়, তখন কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণে জরিপ পরিচালনা করা হয়। এরপর বিএনপি তথা চারদলীয় ঐক্য জোট সরকার ক্ষমতায় এলে ওই প্রকল্পটি চাপা পড়ে যায়।

দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রেললাইন প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন। প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার এই বিশেষ প্রকল্প ২০১০ সালে একনেকের সভায় চূড়ান্ত অনুমোদনও পায়। কিন্তু অর্থ সহায়তা না পাওয়ায় প্রকল্পের তেমন অগ্রগতি হয়নি।

আইন সহায়তা কেন্দ্র (আসক) ফাউন্ডেশনের কক্সবাজার জেলা সভাপতি নাছির উদ্দিন বাদশা বলেন, শেখ হাসিনার আবারও ঘোষণায় জেলার ২৪ লাখ মানুষ আশাবাদী। কিন্তু সেই সঙ্গে শংকা আর সংময়ে রয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে তো?

তিনি আরো বলেন,বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত দেখার জন্য প্রতি বছর অন্তত ২০ লাখ দেশী বিদেশী মানুষ সাগরের টানে এখানে ছুটে আসেন। রেললাইন চালু হলে এর সংখ্যা বেড়ে যাবে কয়েক গুণ। পর্যটনের দ্বার উম্মোচিত হবে। এতে  করে পর্যটনের বিকাশের  সাথে সাথে রেলের রাজস্বও বাড়বে কয়েক গুন।

রেললাইন প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, দোহাজারী থেকে ঘুমধুম পর্যন্ত ১২৮ কিলোমিটারের রেলপথ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল এক হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। ১২৮ কিলোমিটারের মধ্যে দোহাজারী থেকে রামু পর্যন্ত রেললাইনের দূরত্ব হবে ৮৯ কিলোমিটার। রামু থেকে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণ করা হবে অতিরিক্ত আরও ১১ কিলোমিটার। আবার রামু থেকে দক্ষিণ দিকে মিয়ানমার সীমান্ত উখিয়ার ঘুমধুম পর্যন্ত রেলপথ সম্প্রসারণ করা হবে আরও ২৮ কিলোমিটার।

এদিকে, ৮ মে বৃহস্পতিবার কক্সবাজার জেলা প্রশাসক সম্মেলণ কক্ষে দোহাজারী-কক্সবাজার-রাম -ঘুমধুম হয়ে মিয়ানমার পর্যন্ত রেললাইন বাস্তবায়ন কমিটির এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেনজেলা প্রশাসকমোঃ রুহুল আমিন।

সভার শুরুতে রেললাইন বাস্তবায়ন কমিটির প্রধান সাবেক সচিব কেএম হাবীব উল্লাহ বলেন,দোহাজারী হতে এই রেললাইন নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে ১১১ কিলোমিটার পর ঘুমধুমে গিয়ে শেষ হবে। প্রকল্পের জন্য কক্সবাজারে ৬৮৩ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এতে ১ হাজার বসতবাড়ী ও ৫ হাজার মানুষ গৃহহারা হবে। তাদেরকে ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ৪ লাখ ৭১ হাজার ১৮৬টি গাছ কাটা হবে। তবে এর চেয়ে আরো বেশী গাছ লাগানো হবে।

এই ১২৮ কিলোমিটার রেললাইনের মধ্যে চট্টগ্রামের দোহাজারি, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, কক্সবাজারের চকরিয়া, ডুলাহাজারা, ঈদগাঁও, রামু, কক্সবাজার সদর ও উখিয়ায় নির্মাণ করা হবে ৯টি রেল স্টেশন (জংশন) ও ১টি বড় আধুনিকমানের স্টেশন (জংশন) স্থাপন হবে। এই দীর্ঘ রেলপথে নির্মাণ করতে হবে ৪৭টি সেতু, ১৪৯টি ব কালভার্ট ও ৫২টি পাইপ কালভার্ট।

সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন, চকরিয়া-পেকুয়া আসনের এমপি হাজী ইলিয়াছ, কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সালাহ উদ্দিন আহম্মদ সিআইপি সহ অন্যান্যনেতৃবৃন্দ। এই সভায় কবে নাগাদ এই রেললাইন সম্প্রসারণ প্রকল্পের কাজ কবে নাগাদ শুরু হবে তা জানানো হয়নি।