অতি দলীয়করণের ফল গুম-খুন

22592_f8বিডি রিপোর্ট 24 ডটকম : গুম ও অপহরণের ঘটনার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে অতি দলীয়করণকে দায়ী করেছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। গতকাল সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নিয়ে তারা বলেন, দলীয়করণের কারণে সরকারের বাহিনীগুলোর চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে। এসব বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছেন না। কাকে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে সে বিষয়টি সঠিকভাবে খুঁজে দেখা হচ্ছে না। নিয়োগের পর তাদের সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দলীয় বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। যার ফলে বাহিনীর সদস্যরা পেশাদারিত্ব হারিয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। বক্তারা বলেন, সরকার রাষ্ট্রের বাহিনী দিয়ে অনৈতিক কাজ করানোয় বাহিনীর সদস্যরা ক্ষেত্র বিশেষে নিজেদের স্বার্থের জন্য আরও বড় অনৈতিক কাজ করে যাচ্ছে।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে ‘গুম ও অপহরণ: নাগরিক উদ্বেগ ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে সুজন।  বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার। তিনি বলেন, আজকের বাংলাদেশে গুম ও অপহরণ এক সর্বনাশা মাত্রা লাভ করেছে। সমপ্রতি অপরাধের বহুমাত্রিকতা বিবেচনায় নিলে এ ক্ষোভ, বেদনা আর শঙ্কাকে অমূলক বলা যাবে না। গত ২৭শে এপ্রিল নারায়ণগঞ্জে দিনে-দুপুরে সাত জনকে অপহরণ করা হয় এবং পরে শীতলক্ষ্যা নদীতে ভাসমান অবস্থায় তাদের মৃতদেহ উদ্ধার হয়। এ গুম ও অপহরণের ঘটনা যথাযথ তদন্ত করে দ্রুত বিচারে প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
সাবেক এই মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ৪ঠা মে ২০১৪, নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় ছয় কোটি টাকার বিনিময়ে র‌্যাব-এর বিরুদ্ধে হত্যাকা-ের অভিযোগ আনা হয়েছে। ইতিমধ্যেই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তিন জনকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়েছে। তবে অপরাধ প্রমাণিত হলে শুধু বাধ্যতামূলক অবসরই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন কঠোর শাস্তি প্রদান। ঘটনার নেপথ্যে যদি কোন প্রভাবশালী মহলও জড়িত থাকে, নির্দ্বিধায় তাদেরকেও দাঁড় করাতে হবে বিচারের মুখোমুখি। সুজন সভাপতি এম. হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মানুষ আশা করে দুই দল পরস্পরকে দোষারোপের রাজনীতি থেকে বের হয়ে আসবে। তারা গুম-খুনের বিরুদ্ধে একই সুরে সোচ্চার হবে। এজন্য নাগরিক সমাজকে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, নতুন কোন ঘটনা দিয়ে সেভেন মার্ডারের ঘটনা চাপা পড়তে পারে। তাই যত দ্রুত সম্ভব ঘটনাটির তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করতে হবে। র‌্যাব ও পুলিশের কাজ কি তা সুনির্দিষ্ট করে জানাতে হবে। সকল গুম হওয়া ব্যক্তিকে অবিলম্বে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সুজনের নির্বাহী সদস্য সাবেক বিচারপতি কাজী এবাদুল হক বলেন, আদালত থেকে সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীদের ক্ষমা করে দেয়া বিচার ব্যবস্থার প্রতি চূড়ান্ত হস্তক্ষেপ। যে কারণে অপরাধীরা উৎসাহ পায়। অপরাধীরা সরকারি দলের হলে তাদের গ্রেপ্তার না করা অলিখিত নিয়ম হয়ে গেছে। নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালত পর্যন্ত সরকারের আস্থাভাজন লোকদের নিয়োগ দেয়া হয়। অথচ বিচারকাজের ওপর আস্থা না রেখে সরকার সেখানেও হস্তক্ষেপ করতে চায়।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ায় (অব.) এম. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, রাষ্ট্রের ওপর মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমবর্ধমান অবনতির কারণে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদরা প্রাইভেট বাহিনী গড়ে তুলছেন। এই বাহিনীর মাধ্যমে তারা প্রতিপত্তিও দেখানো হচ্ছে। এসব বাহিনীকে কিভাবে অস্ত্রের লাইসেন্স দেয়া হচ্ছে। কারা বাহিনীগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে। সে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, একটি সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসেনি। তাই সরকার আইনশৃঙ্খলা ও রাজনীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। আমরা যদি আমাদের রাজনীতিকে টাকা ও পেশিশক্তি থেকে মুক্ত করতে না পারি, তাহলে গুম ও অপহরণ বন্ধ হবে না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্মোহভাবে কাজ করতে দেখা যাচ্ছে না। সেখানে কখনও যথাযথ ব্যক্তিকে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়নি।
পুলিশের সাবেক আইজিপি এসএম শাহজাহান বলেন, যে সমাজের আইনের শাসন নেই, সে সমাজে সমস্যার সমাধানও নেই। আইনের শাসন না থাকলে রাজনৈতিক সংস্কৃতি পেশীশক্তি, কালো টাকা ও পারস্পরিক দোষারোপের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। আমাদের সবকিছুর মূলে জবাবদিহির অভাব। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেউ অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকলে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।
বিশিষ্ট লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, নাগরিক সমাজ শুধু উদ্বেগ প্রকাশ করতে পারে ও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। অপরাধীরা রাজনৈতিক প্রশ্রয় পাচ্ছে বলে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটছে। নারায়ণগঞ্জের ঘটনা সরকারের জন্য দৃষ্টান্ত। এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার সরকারকে প্রমাণ করার সুযোগ করে দিচ্ছে যে, তারা এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি চান না। অপরাধী কার ছেলে, কার জামাই এটা বিষয় নয়। অপরাধীকে অপরাধী হিসেবে বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, গুম ও হত্যাকা-ের জন্য তিন র‌্যাব সদস্যকে সন্দেহ করা হচ্ছে। অথচ তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না। সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে। ঘটনার সঙ্গে প্রশাসনের জড়িত লোকেরা চিহ্নিত হয়ে যেতে পারে এই ভয়ে সরকার তাদের নারায়ণগঞ্জ থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। কাউন্সিলর নজরুলসহ সাতজন অপহরণের পর দশ মিনিটের মাথায় শামীম ওসমান প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছিলেন। গুম ও অপহরণের বিরুদ্ধে সকলকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জাানিয়ে মান্না বলেন, আমরা অনির্ধারিত গন্তব্যের দিকে যাচ্ছি এমনটি মনে করা যাবে না। আমাদের আশাবাদী হতে হবে। গুম-খুনের বিরুদ্ধে সরাসরি রুখে দাঁড়াতে হবে। তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় একজন মন্ত্রীর ছেলে ও মেয়ের জামাইয়ের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু তিনি কিভাবে এখনও মন্ত্রী পদে বহাল রয়েছেন তা জাতি জানতে চায়।
সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, একসময় মনে করা হতো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিক ও দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে। অথচ বর্তমানে এর চেয়েও খারাপ কাজে তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান অবনতির জন্য বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে দায়ী করেন। র‌্যাবকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে ব্যবহার না করে এলিট ফোর্স বা বিশেষ বাহিনী হিসেবে ব্যবহারের পরামর্শ দেন তিনি। এছাড়া পুলিশ বাহিনীকে কার্যকর করে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি, চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনাসহ সততার সঙ্গে কাজ করার পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সুজনের জাতীয় কমিটির সদস্য মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, দূষণ ও দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি বন্ধ না করলে নারায়ণগঞ্জের ঘটনা অন্য জেলাগুলোতেও ঘটতে পারে। গুম ও অপহরণ বন্ধে সরকারের কাছে কয়েকটি সুপারিশ করে তিনি বলেন, কাউকে গ্রেপ্তার করার আইনানুগ পদ্ধতি সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেউ অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকলে তার শাস্তির পরিমাণ দ্বিগুণ করতে হবে। পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগের সমন্বয়ে আন্তর্জাতিক মানের অপরাধ দমন বাহিনী গঠন করে তাদের উন্নতমানের প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
সুজনের নির্বাহী সদস্য অধ্যাপক অজয় রায়, সুজনের নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি আবদুর রহমান, মহানগর কমিটির সভাপতি এডভোকেট এহসানুল কবীর প্রমুখ বৈঠকে অংশ নেন।