মোদির বাংলাদেশ নীতি নিয়ে ঢাকা দিল্লি কৌতূহল

11_71398নরেন্দ্র মোদির ‘বাংলাদেশী বিতাড়ন’ মন্তব্য ভারতে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। জি মিডিয়া কর্পোরেশনের সহযোগী সম্পাদক কুনাল মজুমদার ৫ই মে লিখেছেন, ‘মোদির বাংলাদেশ পিচের জন্য হিন্দুত্ববাদ অচল, মোদিত্ববাদ লাগবে।’ আবার নরেন্দ্র মোদি আইএনএসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘ভারতের পররাষ্ট্রনীতিকে তিনি দেশের বা দেশের বাইরের কোন ‘ব্যক্তি বিশেষে’র সঙ্গে সম্পর্কের দ্বারা প্রভাবিত হতে দেবেন না। এমনটি হতে দেয়া উচিত নয় বলেও মনে করেন তিনি। অবশ্য বিদেশ নীতি পরিচালনায় মোদি রাজ্য সরকারগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিকে বিশেষ গুরুত্ব দেবেন বলে গত ৬ই মে দ্য ডিপ্লোম্যাটের এক নিবন্ধ ইঙ্গিত দিয়েছে। মোদি বলেছেন, যে সব রাজ্যের সঙ্গে অন্য দেশের বিশেষ লিংক থাকতে পারে- হতে পারে সেটা অভিন্ন সীমান্ত বা ঐতিহাসিক সম্পর্ক বা সাংস্কৃতিক অভিন্নতার কারণে এসব বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট রাজ্যের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেই বৈদেশিক সম্পর্ক নির্ধারণ করা হবে। মোদির কথায় ভারতের ৩০টি রাজ্য তার সরকারের অংশীদার হবে এবং অংশীদারিত্বের ভিত্তিতেই তিনি তার বিদেশ নীতি পরিচালনা করবেন। তিনি চান ৩০ রাজ্য ৩০টি বিদেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে বিশেষ সেতুবন্ধ তৈরি করবে।
মোদির এ মন্তব্য এসেছে এমন একটি সময়ে যখন ঢাকা ভিত্তিক পশ্চিমা কূটনীতিকরা গত ৫ই জানুয়ারির একতরফা সাধারণ নির্বাচন এবং তার ফলাফলের প্রতি ভারতের ক্ষমতাসীন কংগ্রেস সরকারের নীতি নিয়ে একটা স্ন্নায়ুপীড়নের মধ্যে আেেছন। ইদানীং জল্পনা-কল্পনা তাই জোরালো, নরেন্দ্র মোদি সরকারে এলে সেটা প্রতিবেশী দেশগুলোর ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে তার প্রভাব কতটা কি পড়বে।
১৯৮৯ সালে সন্ত্রাসীদের হামলায় দিল্লিতে নিহত বামপন্থি লেখক সফদর হাশমির স্মরণে প্রতিষ্ঠিত সফদর হাশমি মেমোরিয়াল ট্রাস্ট (সহমত) গতকাল দিল্লিতে এক বিবৃতিতে মোদির মন্তব্যকে ‘ফ্যাসিস্ট’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তারা বলেছে, পশ্চিমবঙ্গের জনসভায় দেয়া মোদির মন্তব্য বর্ণবাদী ও নিন্দনীয়। মোদি বলেন, তিনি প্রধানমন্ত্রী হলে অবৈধ বাংলাদেশীদের বহিষ্কার করবেন। বেশির ভাগ পর্যবেক্ষক একমত, মোদির এ রূঢ় মন্তব্য কেবলই রাজনৈতিক চমক। বাগড়ম্বর। বিজেপি ও শিবসেনা অতীতে এ ধরনের মনোভাব প্রকাশ করেছে। বাল ঠাক্‌রে এর চেয়েও কঠোর মন্তব্য করেছেন। অটল বিহারি বাজপেয়ির সরকার তথাকথিত বাংলাদেশীদের বহিষ্কারে পারমিট প্রথা চালুর পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু সেটা ভেস্তে গেছে। পুশব্যাক ও পুশইন নিয়ে ঢাকা-দিল্লি চাপা উত্তেজনা চলেছে বহুকাল। কিন্তু  সে মেঘের গর্জন হয়েছে যত, তার চেয়ে বর্ষণ হয়েছে অনেক কম। ১৯৯৫ সালে মুম্বইয়ে বিজেপি-শিবসেনা  সরকার গঠনের পরে কয়েক দিন হম্বিতম্বি চলেছে। কয়েকটি গ্রুপকে পুশব্যাক করার পর তা থেমে যায়। অনেকের মতে ১৫ই মে’র পরে ভারত থেকে বাংলাদেশীদের বহিষ্কারে মোদির হুমকি হলো ষাঁড়ের সামনে লাল ঝা-া দেখানোর মতোই একটি বিষয়।
তবে এটা ঠিক যে, শুধু নিজের দলের জোরে কিংবা মিত্রদের সহায়তায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতে পারলে পররাষ্ট্রনীতি বিশেষ করে প্রতিবেশীর নীতি, আরও নির্দিষ্ট করে বললে মোদির বাংলাদেশ নীতি কি হবে তা নিয়ে দিল্লি ভিত্তিক কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা দারুণ বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন। গত ৬ই মে সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক টি পি শ্রীনিবাসনের একটি মন্তব্য ছেপেছে দ্য ডিপ্লোম্যাট। এতে তিনি বলেন, বিদেশ নীতি প্রশ্নে যেখানে যতই তিনি কঠোরতা দেখান সেটা একটি পয়েন্ট পর্যন্ত সীমিত থাকবে। তার এ মন্তব্যর কারণ-মোদি ক্ষমতায় এলে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধের আশঙ্কা করছেন অনেকে। শ্রীনিবাসন এটা উড়িয়ে দিয়েছেন। বলেছেন, মোদির অধীনে বিদেশ নীতি উল্লেখযোগ্য কোন পরিবর্তন বয়ে আনবে না।
ইন্ডিয়ান নিউজ সার্ভিসকে দু’দিন আগে দেয়া এক ই-মেল সাক্ষাৎকারে দেয়া মোদির একটি মন্তব্য ঢাকার কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের নজর কেড়েছে। মোদি বলেছেন, দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়টি কোন ব্যক্তিবিশেষের সম্পর্কের দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে না। ‘এমনটা ঘটা উচিতও নয়’ বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর দৌড়ে থাকা হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতা নরেন্দ্র মোদি। বলেছেন জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পররাষ্ট্র নীতি পরিচালনা করতে ভারতের অধিকার রয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সম্পর্ক নরম করে নিতে ব্রতী হয়েছে। ভারতে নিযুক্ত বিদায়ী মার্কিন রাষ্ট্রদূত ন্যান্সি পাওয়েল গত ফেব্রুয়ারিতে মোদির সঙ্গে বৈঠক করে তাঁর নমনীয় অবস্থান তুলে ধরেন। মোদি আরও উল্লেখ করেছেন যে, ‘কোন একটিমাত্র দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার দ্বারাও বৈদেশিক সম্পর্ক প্রভাবিত হতে দেয়া যায় না।’
দ্য ডিপ্লোমেট পত্রিকায় লেখা এক নিবন্ধে সুধা রমাচন্দ্রণ লিখেছেন, ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টি যদি সরকার গঠন করতে পারে, তাহলে একটা বিরাট পরিবর্তন বয়ে আনবে বলে দেশে-বিদেশে অবস্থানরত ভারতীয়দের অনেকেই বিশ্বাস করেন।’
ভারতের সনিপাতে অবস্থিত জিন্দাল স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল এফেয়ার্সের ডিন প্রফেসর শ্রীরাম চাওলা মনে করেন মোদির নেতৃত্বাধীন সরকারের বিদেশ নীতিতে বাণিজ্যিক কূটনীতি সর্বাধিক গুরুত্ব পাবে। পাকিস্তান সমর্থিত আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাস বন্ধে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়া হবে। এছাড়া ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার ধারণাকে রূপ দিতে সামরিক বাহিনীর জন্য বৃহত্তর ভূমিকা নিতে দেয়া হবে। তাদের অঙ্গরাজ্যগুলোর সরকার গঠনে এবং বিদেশ নীতি বাস্তবায়নেও সামরিক বাহিনীকে কথা বলার অধিকতর অধিকার দেয়া হবে।
উল্লেখ্য, ৫২ পৃষ্ঠাব্যাপী নরেন্দ্র মোদির নির্বাচনী ইশতেহারে পররাষ্ট্রনীতির সম্ভাব্য পরিবর্তন সম্পর্কে সামান্যই আলোকপাত করা হয়েছে। মোদি তার নির্বাচনী জনসভাগুলোতে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে দু’টি অস্ত্র সুযোগ পেলেই ব্যবহার করেন। একটি হলো- পাকিস্তান  পরিচালিত কথিত সন্ত্রাসী হামলা রুখতে সমুচিত ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থতা। অন্যটি হলো কংগ্রেস ভারতীয় ভূখ-ে চীনা অনুপ্রবেশ বিষয়ে নমনীয়তা প্রদর্শন। এর ফলে এ ধারণা প্রবল, মোদি সরকারে গেলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগে সিদ্ধান্ত নিয়ে বসতে পারে। একই সঙ্গে মোদি পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে ভারতের পুরনো ভূখ- বিরোধ নিয়েও কঠোর মনোভাব দেখাতে পারেন। তবে এ সবই চায়ের টেবিলের বিষয়। অনেকে এমনকি কোন বড় সন্ত্রাসী হামলার জবাব হিসেবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কথাও বলে থাকেন। তবে বেশির ভাগই এর সঙ্গে দ্বিমত করেন।
তবে সব কিছু ছাপিয়ে মোদির বাংলাদেশ নীতি কি হতে পারে তা নিয়ে দিল্লিতেও কৌতূহল যথেষ্ট। বিশেষ করে সাউথ ব্লকের রাডার থেকে ‘ব্যক্তি’র প্রভাবকে মুছে দিয়ে গুজরালের মতো প্রতিবেশীবান্ধব একটি মোদি ডকট্রিনের সূচনা ঘটান কিনা সেটাই হবে দেখার বিষয়। অবশ্য এর অনেকটাই নির্ভর করছে ভোটের ফলাফলের ওপর। অনেকে অবশ্য বলেন, প্রধানমন্ত্রী হতে না পারলেও প্রভাবশালী বিরোধী দলের নেতা হিসেবেও ভারতের প্রতিবেশী নীতিতে তার প্রভাব অসামান্য হতে পারে।