গুম-খুনে ইইউ’র উদ্বেগ

22591_f5বিডি রিপোর্ট 24 ডটকম : সামপ্রতিক বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও অপহরণের ঘটনায় গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ইউরোপের ২৮ রাষ্ট্রের ওই জোটের ঢাকায় নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত ও হাই কমিশনাররা এক মঞ্চ থেকে গতকাল সম্মিলিত ওই উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ‘ইউরোপ ডে’ উপলক্ষে ঢাকার অনুষ্ঠানাদি সম্পর্কে জানাতে বাংলাদেশে পূর্ণাঙ্গ আবাসিক মিশন রয়েছে ইইউ জোটের এমন ৯ রাষ্ট্রদূত গুলশানের একটি হোটেলে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন। সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা ও সূচনা বক্তব্য রাখেন ইইউ ডেলিগেশন প্রধান রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম হানা। উপস্থিত অন্যান্য রাষ্ট্রের দূতরা সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। সংবাদ সম্মেলনে দেয়া লিখিত বক্তব্যে ইইউ রাষ্ট্রদূত গত ৫ই জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন নিয়ে জোটের ‘অবস্থান অপরিবর্তিত’ রয়েছে জানিয়ে রাজনৈতিক সঙ্কট উত্তরণ ও নতুন নির্বাচনের জন্য গঠনমূলক সংলাপ আয়োজনের তাগিদ পুনর্ব্যক্ত করেন।
মুজিবুর ও ইলিয়াস আলীকে অক্ষত উদ্ধারের অনুরোধ: সংবাদ সম্মেলনে গুম-খুন ও অপহরণসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের সব ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে ভারপ্রাপ্ত বৃটিশ হাই কমিশনার নিক লো বলেন,    সমপ্রতি সুনামগঞ্জ থেকে নিখোঁজ হওয়া বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত বৃটিশ নাগরিক মুজিবর রহমান এবং তার গাড়িচালককে খুঁজে বের করতে সরকারকে সব ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে। যুক্তরাজ্য আশা করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সহ সরকারের সংশ্লিষ্ট সব বিভাগ ও কর্মকর্তারা তাদের অক্ষত উদ্ধারে ‘সর্বোচ্চ’ চেষ্টা করবেন। বৃটিশ ওই নাগরিককে দ্রুত উদ্ধারে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে হাই কমিশনের তরফে যোগাযোগ করে অনুরোধ জানানো হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বৃটেন আশা করে নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধার করে নিজ নিজ পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার পাশাপাশি এ বিষয়ে একটি ব্যাখ্যা দিবে সরকার। এ সময় হাই কমিশনার দুই বছর আগে বনানী থেকে নিখোঁজ হওয়া বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকেও তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে সরকারের প্রতি অনুরোধ জানান।
নারায়ণগঞ্জের ৭ খুনের তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার তাগিদ: প্রশ্নোত্তর সেশনের শুরুতে নরায়ণগঞ্জের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকার সহ ৭ জনকে অপহরণ ও খুনের লোমহর্ষক ঘটনা, এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে র‌্যাবের পদস্থ ৩ কর্মকর্তার চাকরিচ্যুতিসহ বহুল আলোচিত ওই হত্যাযজ্ঞের বিষয়ে ইইউ’র পর্যবেক্ষণ জানতে চান এক সাংবাদিক। জবাবে ডেলিগেশন প্রধান উইলিয়াম হানা বলেন, কয়েক সপ্তাহ আগে বিচারবহির্ভূত সামপ্রতিক সব হত্যাকা-ের বিষয়ে পূর্ণ তদন্ত এবং জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করতে সরকারের কাছে অনুরোধ করেছি। আজও বলছি, বিচারবহির্ভূত যে কোন হত্যাকা- এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় আমরা উদ্বিগ্ন। এসব ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং জড়িতদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। নাগরিকদের নিরাপত্তা দেয়া সরকারের দায়িত্ব উল্লেখ করে তিনি বলেন, বৃটিশ কিংবা বাংলাদেশী নাগরিক একই কথা, সুবিচারই জরুরি। যে কোন সমাজে ন্যায় ও বিচার এবং আইনের শাসন ‘জরুরি’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রাজনৈতিক সংলাপ ও নতুন নির্বাচনের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত: লিখিত বক্তব্যে ইইউ রাষ্ট্রদূত বেশ ক’টি ইস্যুতে ইইউ’র পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। বলেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে কয়েক বছর বহু অনুষ্ঠানে ইইউ’র তরফে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। কোন পরিস্থিতিতে গত জাতীয় নির্বাচনে ইইউ পর্যবেক্ষক না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সে সম্পর্কে সবাই অবগত উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, নির্বাচনকে ঘিরে যে সহিংসতা হয়েছে আমরা তার নিন্দা জানিয়েছি। একই সঙ্গে আমরা সব রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছি সংলাপের মাধ্যমে উত্তরণের একটি পথ খুঁজতে। আজকের এই দিনেও আমরা সেই আহ্বানই পুনর্ব্যক্ত করছি। সমপ্রতি একজন মানবাধিকার কর্মীকে নাজেহাল করাসহ বিচারহীন অনেক হত্যাকা- ঘটছে। সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের অবস্থা, রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার রক্ষা এবং পার্বত্য শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের বিষয়েও গুরুত্ব আরোপ করেন ইইউ রাষ্ট্রদূত। মস্কো, পেইচিং ও দিল্লি সরকার গত নির্বাচন ও সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাদের সঙ্গে ঢাকার সব ধরনের যোগায়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ভালই চলছে, তাছাড়া সরকারও ‘স্বাভাবিক কর্মকা-’ চালিয়ে যাচ্ছে এ অবস্থায় ইইউ তথা পশ্চিমা বিশ্ব কেন সংলাপের আহ্বান জানাচ্ছে? জবাবে রাষ্ট্রদূত বলেন, একতরফা ওই নির্বাচনের পরপরই (৯ই জানুয়ারি) ইইউ’র অবস্থান স্পষ্ট করে ব্রাসেলস থেকে বিবৃতি দেয়া হয়েছে। সেখানে নতুন নির্বাচনের জন্য সংলাপের আহ্বান জানানো হয়েছে। রাষ্ট্রদূত বলেন, ইইউ মনে করে সেই সংলাপই রাজনৈতিক সঙ্কট উত্তরণের একমাত্র পথ। এ সময় তার নিজস্ব পর্যবেক্ষণও তুলে ধরেন। বলেন, আমি বিশ্বাস করি রাজনৈতিক অবস্থা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য সবই ‘ইন্টার লিক্‌ড’। দেশের শ্রমখাতের কলঙ্ক ‘রানা প্লাজা’ ধসের বছরপূর্তিতে কারখানা পরিদর্শক নিয়োগসহ বেশ কিছু উল্ল্লেখযোগ্য অগ্রগতিতে সরকারের প্রশংসা করেন রাষ্ট্রদূত। তবে সার্বিক কর্মপরিবেশ উন্নয়নে আরও অনেক কিছু করা বাকি রয়েছে বলে মত দেন তিনি। হতাহত শ্রমিকদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দ্রুত দেয়ার বিষয়ে সমপ্রতি ঢাকা সফর করে যাওয়া আইএলও’র ডেপুটি মহাপরিচালক যে তাগিদ দিয়েছেন তাও স্মরণ করেন রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম হানা। সংবাদ সম্মেলনে ইইউ ডেলিগেশন প্রধান ও ভারপ্রাপ্ত বৃটিশ হাই কমিশনার ছাড়াও ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত মিজ হাননে ফুগ্ল এসকায়ের, সুইজারল্যান্ডের গারবেন সিওয়ের্ড দে জোং, স্পেনের লুইস তেহাদা শাকোন, ফ্রান্সের মিশেল ত্রঁকুইয়া, জার্মানির আলব্রেক্ট কোনৎসে, সুইডেনের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স মিজ কারিন রোলিন, ইতালির এদমনদো ফালকোনি উপস্থিত ছিলেন।