নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর আট মামলার তদন্তে অগ্রগতি নেই

3_70667বিডি রিপোর্ট 24 ডটকম : দেশের আলোচিত ও নৃশংসতম নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া আওয়ামী লীগ অফিসে ভয়াবহ বোমা হামলার ঘটনায় দায়েরকৃত দুটি মামলার ১৩ বছর পর বিচার কাজ শুরু হয়েছে। তবে চাঞ্চল্যকর ও লোমহর্ষক হিসেবে মনিটরিং সেলে অন্তর্ভুক্ত হওয়া মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী, তরুণ নাট্যকার চঞ্চল, ছাত্রলীগ নেতা মিঠু, সিদ্ধিরগঞ্জে পুলিশ কনস্টেবল মফিজ, বক্তাবলীতে স্কুলছাত্র ইমন, সোনারগাঁয়ে চাঞ্চল্যকর ফোর মার্ডার, স্কুলছাত্র জাহিদুল ইসলাম ও মাদরাসা ছাত্র সোয়াইব হত্যা মামলার তদন্ত কাজ চলছে ধীরগতিতে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি মামলায় প্রভাবশালী ওসমান পরিবারসহ প্রভাবশালীদের সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে এরই মধ্যে রাষ্ট্রীয় আইন কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ জেলার চাঞ্চল্যকর ও লোমহর্ষক মামলা নিষ্পত্তি সংক্রান্ত জেলা মনিটরিং সভার নথি থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

সভায় জেলার পিপি জানান, মনিটরিং সেলের কার্যক্রম অত্যন্ত সন্তোষজনক। কমিটির তৎপরতায় এ সেলের তালিকাভুক্ত মামলাগুলোর রায়ে ৪ বছরে ৫৭ আসামিকে ফাঁসি ও যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন দন্ডে দন্ডিত করা হয়েছে। বর্তমানে সেলে অন্তর্ভুক্ত ২১টি মামলা তালিকাভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে দুটি মামলার কার্যক্রম আদালতের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে। একটি মামলায় হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার হয়ে বিচার কাজ শুরু হয়েছে। সাতটি বিচারাধীন ও ৯টি তদন্তাধীন রয়েছে। আলোচিত চাষাঢ়া আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলার ঘটনায় দুটি মামলার বিচার কাজ শুরু হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি মামলার নথি ঢাকার দ্রুত বিচার আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে।

১৩ বছর পর চাষাঢ়া বোমা হামলা মামলার বিচার শুরু : ২০০১ সালের ১৬ জুন নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া আওয়ামী লীগ অফিসে ভয়াবহ বোমা হামলায় ২০ জন নিহত ও ৭০ জন আহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা দুটি মামলার ঘটনার ৯ বছর পর চাঞ্চল্যকর ও লোমহর্ষক মামলা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। এর ৩ বছর পর ২০১৩ সালের ২ মে মামলাটির তদন্তকারী সংস্থা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি মামলা দুটির চার্জশিট আদালতে জমা দেন। পরে কয়েক দফা চার্জ গঠনের তারিখ পেছানো হয়। ২০ এপ্রিল চার্জ গঠনের শুনানির সময় চার্জশিটভুক্ত দুজন আসামি হুজি নেতা মুফতি আবদুল হান্নান ও নারায়ণগঞ্জের সন্ত্রাসী শাহাদাতউল্লাহ জুয়েল উপস্থিত ছিলেন। চার্জশিটভুক্ত ৬ জনের মধ্যে মোরসালিন ও মোত্তাকিম ভারতের কারাগারে, সিটি করপোরেশনের ১২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর শওকত হাশেম শকু জামিনে ও ওবায়দুল্লাহ নামের একজন পলাতক রয়েছেন। জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বাদী ও বিবাদী পক্ষের আইনজীবীসহ মামলায় চার্জশিটভুক্ত দুজন আসামির উপস্থিতিতে চার্জ গঠনের শুনানি শেষে বিচারক মালিক আবদুল্লাহ আল আমিন ২৯ এপ্রিল প্রথম সাক্ষী শুনানির দিন ধার্য করেন। তবে দেশজুড়ে আলোচিত নাসিকের প্যানেল ও কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম এবং আইনজীবী চন্দন সরকারসহ ৭ হত্যাকা-ের প্রতিবাদে আইনজীবীদের লাগাতার আদালত বর্জনের কারণে এখনও সাক্ষী শুনানি শুরু হয়নি।

ত্বকী হত্যা মামলার অগ্রগতি হয়নি এক বছরেও : ২০১৩ সালের ৬ মার্চ অপহরণের পর ৮ মার্চ শহরের চারারগোপের কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের ভেতরে শীতলক্ষ্যা নদীর শাখা খালে মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীর লাশ উদ্ধার করা হয়। মামলাটি হাইকোর্টের নির্দেশে বর্তমানে র‌্যাব তদন্ত করছে। এরই মধ্যে দুজন আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। তবে আদালতে জবানবন্দি দেয়া ভ্রমর নামের এক আসামি জামিনে মুক্ত হয়ে ভারত পালিয়ে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। জবানবন্দিতে ত্বকী হত্যাকান্ডে সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের ভাতিজা আজমেরী ওসমানের সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করেছিল ভ্রমর। মার্চের শুরুতে তদন্তকারী সংস্থা র‌্যাব জানিয়েছিল অতি শিগগিরই তারা আদালতে চার্জশিট দাখিল করবে। তবে অদ্যাবধি আদালতে চার্জশিট দাখিল হয়নি।

নাট্যকার চঞ্চলের পরিবার আজও জানে না কি ছিল তার অপরাধ : ২০১২ সালের ১৯ জুলাই শীতলক্ষ্যা নদীর বন্দর উপজেলার চর ধলেশ্বরী এলাকায় তরুণ নাট্যকার দিদারুল ইসলাম চঞ্চলের লাশ উদ্ধার করা হয়। তবে চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকান্ডের কোনো রহস্যই উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। নিহতের পরিবার আজও জানে না কি কারণে চঞ্চলকে হারাতে হয়েছে। মামলাটি প্রথমে ডিবি পুলিশের এসআই আবদুল আউয়াল তদন্ত করছিলেন। কিন্তু তিনি রহস্যের কোনো কূলকিনারা করতে পারেননি। প্রায় দুই বছর পর একই এলাকা থেকে নাসিকের প্যানেল ও কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম এবং আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ মামলারও তদন্তের দায়িত্বে ডিবি পুলিশের এসআই আবদুল আউয়াল।

ছাত্রলীগ নেতা মিঠু হত্যা মামলার আসামিরা প্রকাশ্যে : ২০১২ সালের ১৫ জুলাই দুপুরে গাবতলীর ছাত্রলীগ নেতা মিঠুকে কুপিয়ে হত্যা করে উজ্জ্বল, জনি, চাচা খোকন, রফিক, শ্যামা, লিমন, পালসার রিপন ওরফে চাপা রিপন, বোয়াইল্যা শাহিন, নাতি সোহেল, হামিম, সিজার, লিটন। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে। এ হত্যাকান্ডের নেপথ্যেও সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের ভাতিজা আজমেরী ওসমান। যদিও মামলায় তার নাম উল্লেখ ছিল না।

সোনারগাঁয়ের চাঞ্চল্যকর ফোর মার্ডারের তদন্ত চলছে ধীরগতিতে : ২০১৩ সালের ২০ এপ্রিল সোনারগাঁয়ের পিরোজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের স্ত্রী ও শ্যালকসহ চাঞ্চল্যকর ফোর মার্ডার মামলার তদন্ত কাজে নেই অগ্রগতি। মামলার তৎকালীন তদন্তকারী অফিসার ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ছয়জনকে গ্রেফতার করেন। এর মধ্যে পাঁচজন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলেও এক আসামির মৃত্যুতে ওলট-পালট হয়ে গেছে সবকিছুই।

বক্তাবলীর স্কুল ছাত্রকে ৯ টুকরো করে হত্যার মামলা : ২০১৩ সালের ১৩ জুন ফতুল্লার দুর্গম চরাঞ্চল বক্তাবলী এলাকায় স্কুল ছাত্র ইমন হোসেনকে পূর্ব শত্রুতার জের ধরে নৃশংসভাবে ৯ টুকরো করে হত্যাকান্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হলেও প্রায় এক বছরেও মামলাটির তদন্ত কাজ শেষ করতে পারেনি পুলিশ।

মাদরাসা ছাত্র সোয়াইব হত্যাকান্ড : ২০১৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি সোনারগাঁয়ের মাদরাসা ছাত্র সোয়াইব হোসেনকে অপহরণের পর চোখ উঠিয়ে, আঙুল কেটে ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে হত্যা করা হয়। অপহরণের ৬ দিন পরে সোয়াইবের লাশ উদ্ধার করা হয়। মামলায় ১২ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়। যার মধ্যে সাতজনকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে এবং একজন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

স্কুলছাত্র জাহিদ হত্যাকান্ড : ২০১৪ সালের ২১ জানুয়ারি সোনারগাঁয়ের স্কুল ছাত্র জাহিদুল ইসলামকে অপহরণ করে মুক্তিপণ হিসেবে ১০ লাখ টাকা দাবি করে খুনিরা। পরে ২২ জানুয়ারি জাহিদের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

পুলিশ কনস্টেবল মফিজ হত্যাকান্ড : ২০১৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের মুক্তিনগর এলাকা থেকে অপহৃত হন জেলা পুলিশের কনস্টেবল মফিজউদ্দিন। তার নিখোঁজের ঘটনায় দায়েরকৃত জিডির সূত্র ধরে ডিবি পুলিশের এসআই আবদুল আউয়াল এক আসামিকে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে জানতে পারেন তার লাশটি কুমিল্লা জেলার এক স্থানে ফেলে দিয়েছিল খুনিরা।

জামায়াত শিবিরের হামলা মামলা : ২০১২ সালের ১৯ নভেম্বর শহরের ২নং রেলগেটসংলগ্ন এলাকায় সদর ওসির গাড়িতে জামায়াত-শিবিরের হামলাসহ আগুন ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপের ঘটনায় এরই মধ্যে ৯৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে।

বিচারাধীন রয়েছে যে মামলাগুলো : শিশু আমির হামজা ও তার বোন শ্রাবণী হত্যা মামলায় অপহরণকৃত তাদের মা রিনা আক্তারকে অদ্যাবধি উদ্ধার করা যায়নি। এজাহারনামীয় আসামি লিপি আদালতে ১৬৪ ধারা মোতাবেক স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছে। সন্দেহভাজন পাঁচ আসামি গ্রেফতার হয়েছে। ২০১৩ সালের ২০ আগস্ট আদালত অত্র মামলাটির যাবতীয় কার্যক্রম স্থগিত করেছেন।

মমতাজ হত্যা মামলা। জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে আমিন মহাজনের ছেলে মনির ও জাকির সন্ত্রাসী রেকমত ও তার বাহিনী দিয়ে মমতাজকে রাতে তার বাসা থেকে ডেকে নিয়ে মাথায় গুলি করে হত্যা করে। মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে। আসামির সংখ্যা ১৪ জন। এ পর্যন্ত ১৫ সাক্ষীর স্বাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। তবে ধার্য তারিখে এক সাক্ষী আদালতে হাজির হয়নি। সাক্ষী হাজিরের বিষয়টি নিশ্চিত করতে কমিটির সদস্য সচিব ও পিপিকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। বিষয়টি ব্যক্তিগতভাবে তদারিক করার জন্য পুলিশ সুপারকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

ব্যবসায়ী খলিল হত্যা মামলায় ১৭ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। মামলার নথিপত্র হাইকোর্টে প্রেরণ করা হয়েছে। এখনও তা ফেরত আসেনি। গত ২০১৩ সালের ২০ মার্চ আদালত অত্র মামলাটির যাবতীয় কার্যক্রম স্থগিত করেছেন।

সোনারগাঁয়ের মুক্তিযোদ্ধা আবদুল গফুর হত্যা মামলাটির কার্যক্রম দীর্ঘদিন হাইকোর্টের নির্দেশে স্থগিত ছিল। সম্প্রতি ওই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার হয়ে বিচার শুরু হয়েছে। আসামির সংখ্যা ১৮।

শিশু জিহাদ হত্যাকান্ড : ধর্মগঞ্জ বেপারীপাড়া এলাকার শিশু জিহাদকে (৫) অপহরণের পর কাঁচপুর ব্রিজের ওপর থেকে ফেলে দিয়ে হত্যার ঘটনায় আসামি ওয়াসিম আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে।

সিদ্ধিরগঞ্জের বন্ধকৃত মনোয়ারা জুট মিলের ভেতরে আরমান (১৪) হত্যা মামলায় এরই মধ্যে পাঁচ আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। মামলার আসামিরা সবাই কিশোর অপরাধী। তারা হলো বাদশা (১৩), সমুন (১৪), ফারুক (১১), রবিন ওরফে শামীম (৯), আবু বকর ওরফে বক্কর (৯) ও বাবু (১০)।

মা ও মেয়ে হত্যাকা- : ২০১২ সালের ১৫ আগস্ট পাইকপাড়ার মাফিয়া বেগম (৪৪) ও পালিত মেয়ে সাদিয়াকে (১৩) সুপরিকল্পিতভাবে জবাই করে হত্যা শেষে খুনিরা দরজা তালাবদ্ধ করে চলে যায়। এরই মধ্যে দুই আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তা তিনজনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছেন। মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে। এছাড়া সোনারগাঁয়ের কবির হোসেন হত্যাকান্ড, হাবিব হত্যাকান্ড, রূপগঞ্জে জেএমবি সদস্যদের কাছ থেকে বিস্ফোরক উদ্ধারের মামলা বিচারাধীন রয়েছে। তবে এ তিনটি মামলার নথি ঢাকার দ্রুত বিচার আদালতে প্রেরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।