গুম-খুন বন্ধে মানবাধিকার রক্ষা কমিটির ৩ দফা

1399297626বিডি রিপোর্ট 24 ডটকম : গুম-খুন ও অপহরণের ঘটনা বন্ধে তিন দফা দাবি তুলে সরকারকে ব্যবস্থা নেয়ার আলটিমেটাম দিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তারা জানিয়েছেন, এ ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ না দিলে নাগরিক সমাজ রাস্তায় নামতে বাধ্য হবে। গতকাল মৌলিক অধিকার সুরক্ষা কমিটির ব্যানারে রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউতে আয়োজিত মানববন্ধন থেকে তিন দফা দাবি তুলে ধরে বলা হয়, নারায়ণগঞ্জ থেকে র‌্যাবের সকল প্রকার কার্যক্রম প্রত্যাহার, সাদা পোশাকে পুলিশের অভিযান বন্ধ এবং গ্রেপ্তারের পর  ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অপরাধীকে আদালতে হাজির, সাম্প্রতিক সময়ের যে কোন একটি গুম-খুনের ঘটনার বিচারকাজ শুরু করে তা দুই মাসের মধ্যে শেষ করতে হবে। বিকাল ৫টা থেকে শুরু হয়ে প্রায় ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন কর্মসূচি চলে। সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের জনসাধারণ এতে অংশ নেন। এতে অংশ নেন সাম্প্রতিক সময়ে গুম-অপহরণের শিকার হওয়া পরিবারের সদস্যরাও। প্রিয় স্বজনকে ফিরে পেতে তাদের হৃদয়বিদারী আহাজারি এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি করে। মানববন্ধনে অংশ নিয়ে সংহতি প্রকাশ করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক, এডভোকেট জেড আই খান পান্না, মানবাধিকার কর্মী খুশি কবীর, ড. হামিদা হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আমেনা মহসিন, এএসএম আমানউল্লাহ, শাহনাজ হুদা, স্থপতি ইকবাল হাবিব, মহিলা আইনজীবী সমিতির সেক্রেটারি এডভোকেট সালমা আলী, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন, সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিনিধি নূর খান, অ্যাকশন এইডের নির্বাহী তাহমিনা হক, বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেইঞ্জস জার্নালিষ্ট এসোসিয়েশনের সভাপতি,বিডি রিপোর্ট 24 ডটকম এর ডেপুটি এডিটর পারভেজ বাবুল,  মুক্তিযোদ্ধা ইশতিয়াক আজিজ উলফাৎ, নারী উদ্যোক্তা তাজিমা হোসেন মজুমদার, শারমিন সুলতানা মিতু, তাজুল ইসলাম, পরিবেশ আন্দোলনের সেক্রেটারি মইদুল ইসলাম, গণসংহতি আন্দোলনের আহ্বায়ক জোনায়েদ সাকী, নাগরিক ছাত্র ঐক্যের সভাপতি নাজমুল হাসান প্রমুখ।
দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সভাপতি এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, প্রতিনিয়ত অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার হচ্ছে। কিন্তু কোন ধরণের কার্যকর পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। একটা সভ্য দেশে এটা হতে পারে না। সবাইকে এক হতে হবে। স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টির দাবিতে সোচ্চার হতে হবে। এভাবে রাস্তাঘাটে লাশ পড়ে থাকছে, অথচ কারও মাথাব্যাথা নেই। এ অবস্থা চলতে দেয়া যায় না। দেশের প্রতিটি নাগরিকের জানমাল রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব। গুম-খুন বন্ধে সমবেত কণ্ঠে সকলকে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, মানবন্ধনের মাধ্যমে উদ্বিগ্ন নাগরিকরা তাদের হতাশা, ক্ষোভ ও দুশ্চিন্তা প্রকাশ করছেন। গুম-খুন ও অপহরণের ঘটনা অর্থনীতির জন্যও উদ্বেগজনক। একজন লোক হঠাৎ করে নিখোঁজ হবে, বিনা বিচারে মারা যাবে- এটা মেনে নেয়া যায় না। আইনের শাসনের ব্যত্যয় ঘটলে, নাগরিক অধিকার নিশ্চিত না হলে দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পড়ে। দেশে বর্তমানে সঙ্কটময় অবস্থা বিরাজ করছে দাবি করে তিনি বলেন, সম্পদের নিরাপত্তা, জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। গুম-খুনের শিকার প্রতিটি জীবন দেশের অর্থনীতিকে কুরে কুরে খাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে মানুষের কল্যাণে ব্যবহারের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, দেশে যখন গণতন্ত্র থাকে না, গণতন্ত্র দুর্বল হয় তখন গোয়েন্দাবাহিনী শক্তিশালী হয়। প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলের নেতাদের জনগণের কাছে আসার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অপব্যবহারের হিসাব দিতে হবে। এই জাতীয় বাহিনী যত কম দেশের জন্য তত মঙ্গলজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি। র‌্যাবের মতো সংস্থার প্রয়োজন নেই। র‌্যাবের যারা দায়ী তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে বেআইনি শাসন চলতে থাকে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বর্তমান সময়কে খুব খারাপ উল্লেখ করে ড. শাহদীন মালিক বলেন, এরকম বাংলাদেশের জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না। স্বজনহারাদের কান্না শুনতে কেউ প্রস্তুত ছিল না। গত কয়েকদিনে যারা গুম হয়েছে তাদের মধ্যে খুব অল্প সংখ্যকের লাশ পাওয়া গেছে। বেশির ভাগের কোনপ্রকার খোঁজ পাওয়া যায়নি। সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হচ্ছে প্রত্যেকেই উৎকণ্ঠার মধ্যে থাকতে হচ্ছে। দিন দিন রাষ্ট্র একটা বর্বর রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে। তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতি দেখার জন্য দেশ স্বাধীন হয়নি। নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে আমরা সরকারের কাছে চাইতে পারি, দাবি করতে পারি। সরকার নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা না দিলে জনগণের আস্থা হারাবেন। এত প্রভাব প্রতিপত্তি থাকবে না। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সভাপতি ড. হামিদা হোসেন পুলিশকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রতিটি গুম ও খুনের ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হতে হবে। মানবাধিকার কর্মী খুশি কবীর বলেন, দেশের বিদ্যমান পুলিশের স্বল্পতার অজুহাত দেখানো অপরাধীদের প্রশ্রয় দেয়ার শামিল। সরকার কর্মসূচিতে বাধা দিয়ে উদ্বেগটুকু প্রকাশ করতে দিচ্ছে না। ড. আমেনা মহসিন বলেন, এমন রাষ্ট্রে আমরা বাস করছি যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরকে দোষারোপ করে। বর্তমানে দেশে মৌলিক অধিকার হরণ করা হচ্ছে।
এডভোকেট জেড আই খান পান্না বলেন, অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির না করা আদালত অবমাননার শামিল। যুদ্ধাপরাধীদের যদি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকে তবে গুম হওয়া ব্যাক্তিদের কেন থাকবে না। অপরাধীদের বিচার আইনের মাধ্যমে হবে। এ ধরনের পরিস্থিতি আইন-আদালতকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। ২০০৪ সালে র‌্যাব নামের বিষবৃক্ষ যারা তৈরি করেছিল তারা আজ সেই বিষে জর্জরিত। কেউ আইনের উর্ধ্বে না। আজ না হলেও কাল পরশু সবার বিচার হবেই।
ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, গুম-খুনের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হতে হবে। চল্লিশ বছর আগে নাগরিকদের মানবাধিকার রক্ষার জন্য সংবিধান তৈরি হয়েছিল। সংবিধানের মৌলিক অধিকার রক্ষার যে নির্দেশ আছে তা উপেক্ষা করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আইনজীবীরা উচ্চ আদালতের নির্দেশনা চাইলে তা পাওয়া যাচ্ছে না। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের দাবিতে করা রিটের ফাইলগুলো স্তূপ হয়ে পড়ে আছে।
মানববন্ধন কর্মসূচিতে সাম্প্রতিক সময়ে নিখোঁজ ব্যাক্তিদের স্বজনেরা অংশ নিলে এক হৃদয়বিদারক অবস্থার সৃষ্টি হয়। রাজধানীর তেজগাঁও থানাধীন ৩৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমন, সবুজবাগের ছাত্রলীগের যুগ্ম-সম্পাদক রফিকুল ইসলাম সোহেল পরিবার, ফেনী জেলা শহর যুবদল নেতা মাহাবুবুর রহমান রিপন এবং ২০১৩ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে অপহৃত যুবক মাসুম, সুমন, রানা, রাসেল, আলামিন, তানভীর ও কাওসারের পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন। তারা অবিলম্বে প্রিয়জনকে ফিরিয়ে দিতে সরকারের প্রতি আহবান জানান। নিখোঁজ ব্যাক্তিদের পরিবারের মা, বাবা, ভাই-বোন, স্ত্রী ও স্বজনদের কান্নার রোল পড়ে যায়। ভুক্তভোগী পরিবারের সেই কান্নায় সংসদ এলাকার আকাশ ভারি হয়ে ওঠে। নিখোঁজ রাসেলের ছোট বোন লাবণী বলেন, তারা দুই ভাই এক বোন। রাসেল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাষ্টার্স প্রথম ব্যাচে (রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের) পাস করেন। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এফ ব্লক থেকে র‌্যাব-১ পরিচয়ে তার ভাই রাসেলকে ধরে নিয়ে যায়। র‌্যাবের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা গ্রেপ্তারের বিষয়টি অস্বীকার করে। তিনি বলেন, রাসেলকে পাওয়ার জন্য তারা এখনও র‌্যাবের কাছে ছুটে যাচ্ছেন। কিন্ত র‌্যাব থেকে বারবার তাদেরকে একই কথা বলা হচ্ছে। নাখালপাড়া থেকে নিখোঁজ গাড়িচালক কাওসারের স্ত্রী মিলু বলেন, নিখোঁজ ৬ যুবকের সঙ্গে রাতে তার স্বামীকে র‌্যাব-২ পরিচয়ে ধরে নিয়ে যায়। পরে তিনি র‌্যাবের কাছে গিয়েছিলেন। কিন্ত র‌্যাব তাকে জানায়, তারা কোন পাবলিক ধরে আনেনি। এর পরে ঘটনাটি জানিয়ে থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা নেয়নি। স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে একমাত্র মেয়ে মিমকে নিয়ে তিনি দুর্বিষহ জীবন যাপন করছেন বলে জানান। ফেনী থেকে নিখোঁজ শহর যুবদলের মাহাবুবুর রহমান রিপনের ছোট ভাই মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, গত ২৭শে মার্চ তার ভাই নিখোঁজ হয়েছে। তারা আজও জানতে পারেননি সে বেঁচে আছে না মরে গেছে। ভাইকে ফিরে পেতে তার পরিবারের লোকজন পথ চেয়ে আছে। সবুজবাগ থেকে নিখোঁজ ছাত্রলীগ নেতা রফিকুল ইসলাম সোহেলের মা শাহানারা বেগম বলেন, তার ছেলে তিন মাস ধরে নিখোঁজ। মামলার তদন্তে পুলিশের তৎপরতা ধীরগতি হওয়ায় ডিবি পুলিশ তদন্ত করছে। রোববার সংবাদ সম্মেলন করে পুলিশের বিরুদ্ধে কথা বলায় পুলিশ সবুজবাগের বাসায় গিয়ে তার পরিবারকে ভয়-ভীতি দেখাচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।