ক্রসফায়ারে গণতন্ত্র

21522_f4বিডি রিপোর্ট 24 ডটকম : জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে যে সহিংসতা হয়েছে এর জন্য দায়ী সরকার ও বিরোধী দলগুলো।  স্বাধীনতা অর্জনের পর এটাই ছিল সবচেয়ে রক্তাক্ত নির্বাচন। এ সময়ে কি ঘটেছিল তা চিহ্নিত করতে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া না হলে বাংলাদেশ পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। এটা গুরুত্বপূর্ণ যে, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারাই শুধু প্রকাশ্যে কা-জ্ঞানহীন এই সহিংসতার নিন্দা জানান নি, পাশাপাশি তারা দলীয় সদস্যরা জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। গতকাল আন্তর্জাতিক মানবাধিকারবিষয়ক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এক প্রতিবেদনে এসব কথা লিখেছে। ‘বাংলাদেশ: ইলেকশনস স্কেয়ারড বাই ভায়োলেন্স’ শীর্ষক প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশী মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, বিতর্কিত ওই নির্বাচনকে ঘিরে যে সহিংসতা হয়েছে তাতে নিহত হয়েছে কয়েক শ’ মানুষ। আহত হয়েছেন অনেকে। নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে বিরোধীদলীয় কর্মী সমর্থকরা যে সহিংস প্রতিবাদ বিক্ষোভ করেছে তার বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে ৬৪ পৃষ্ঠার ‘ডেমোক্রেসি ইন দ্য ক্রসফায়ার: অপজিশন ভায়োলেন্স অ্যান্ড গভর্নমেন্ট অ্যাবিউসেস ইন দ্য ২০১৪ প্রি-অ্যান্ড পোস্ট-ইলেকশন পিরিয়ড ইন বাংলাদেশ’ রিপোর্টে। অসংখ্যবার বিরোধীদলীয় সদস্য ও কর্মীরা ট্রাক, বাস ও অটোরিকশায় পেট্রল বোমা ছুড়ে মেরেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিরোধীদলীয় সদস্যরা হামলা চালাতে শিশুদের বাধ্য করেছে। এর জবাবে সরকার নৃশংস দমনপীড়ন চালিয়েছে। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো কিভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-, গুম, খেয়াল-খুশি মতো আটক ও অন্যায়ভাবে বেসরকারি সম্পদের ক্ষতি করেছে তা ডকুমেন্ট আকারে ধারণ করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের গবেষকরা। বেআইনি হত্যাকা-, নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য কোন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য দায়ী হলে তার বিচার করা উচিত বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের। সমর্থকরা যে সহিংসতা করে তার বিরোধিতা করে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতাদের পরিষ্কার করে এবং দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রকাশ্যে বিবৃতি দিতে হবে। এ রিপোর্টের জন্য হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ১২০ জনেরও বেশি মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন ঘটনার শিকার, তাদের পরিবারের সদস্য ও প্রত্যক্ষদর্শী। এতে নির্যাতনের যে প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া গেছে তা নির্বাচনের আগে, নির্বাচনের সময় ও পরে সংঘটিত করেছেন বিরোধীদলীয় গ্রুপের সদস্যরা ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো।
ক্রসফায়ারে হত্যা
ওই প্রতিবেদনে ক্রসফায়ারে হত্যাকা- সম্পর্কে বলা হয়, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বারবার বাংলাদেশ সরকারকে নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর সাধারণ ক্ষমার রীতি বাতিল করার আহ্বান জানিয়েছে। নির্বাচনের পরে নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী অন্যায়ভাবে বিরোধীদলীয় নেতাদের গ্রেপ্তার করেছে। বলা হয়েছে সহিংস হামলায় তাদেরকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়েছে। ১৯ বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছে অথবা আটক করা হয়েছে। এ বিষয়টি প্রামাণ্য হিসেবে তথ্যভুক্ত করেছেন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের গবেষকরা। ৯টি হত্যাকা-ের মধ্যে কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে তারা মারা গিয়েছেন ‘ক্রসফায়ারে’। নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী ও সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধের সময় এসব ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটে। এ ৯টি হত্যাকা- নিয়ে সরকারি বিবৃতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার শক্তিশালী কারণ আছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, কথিত ক্রসফায়ারের ঘটনাগুলোর মধ্যে কয়েকটিতে নিহত ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে হত্যার কয়েক ঘণ্টা অথবা কয়েক দিন আগে। এ বক্তব্য সরকারি ভাষ্যের বিরোধিতা করে। নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা যখন স্বাভাবিকভাবে দাবি করেন যে সন্দেহভাজন ব্যক্তি ক্রসফায়ারে মারা গেছেন তখন তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নেই বললেই চলে। তারা এমন হত্যাকা-কে যথার্থতা দিতে গিয়ে নিয়মিতভাবেই বলে থাকেন ক্রসফায়ারে হত্যাকা-ের কথা। পরে তথ্যপ্রমাণে দেখা যায় তারা আটক অথবা সন্দেহজনক ব্যক্তিকে হত্যা করেছেন ঠা-া মাথায়। স্থানীয় পুলিশ দাবি করেছে, এ বছরের ১৮ই জানুয়ারি সাতক্ষীরায় ১৫ বছর বয়সী আবু হানিফ (যে ছোটন নামেও পরিচিত) ও জামায়াতে ইসলামীর যুব শাখার সদস্যরা হামলা করে পুলিশের ওপর। তখন নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা ছোটনকে হত্যা করে। এ বিষয়ে আলাদাভাবে বেশ কিছু প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে। তারা বলেছেন, নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা ছোটনকে আগের দিন আটক করে। তার বিরুদ্ধে পুলিশ অভিযোগ করে যে, সে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিল এবং তার গ্রামে বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেলে আগুন দিয়েছে। বাংলাদেশের আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে একটি বেদনাদায়ক রেকর্ড আছে। বিশেষ করে, ২০০৪ সালে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) প্রতিষ্ঠার পর থেকে পদ্ধতিগতভাবে এ সংস্থাটি মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। এক্ষেত্রে তাদেরকে দেয়া হয়েছে দায়মুক্তি। এ ঘটনা সরাসরি চলমান নির্যাতনের সংস্কৃতিতে অবদান রাখছে। তাই র‌্যাবকে ভেঙে দিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ জবাবদিহিমূলক বেসামরিক আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা গঠন করা, যারা নিবেদিত থাকবে অপরাধ ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক পরিচালক ব্রাড এডামস বলেন, বাংলাদেশ সরকারের উচিত এভাবে নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীকে রক্ষা করা বন্ধ করা। দায়মুক্তির ক্ষেত্রে যে শূন্য সহনশীলতার ঘোষণা দেয়া হয়েছে সেদিকে দৃষ্টি দেয়া উচিত। জানুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে সহিংসতা হয়েছে তার পুরোটাই আগেভাগে আন্দাজ করা গিয়েছিল। কিন্তু সরকার নির্যাতনের রেশ টেনে ধরতে কিছুই করে নি। ঘটনার শিকারদের ন্যায়বিচার দেয়ার ক্ষেত্রেও কিছুই করে নি।
বিরোধীদের সহিংসতা
বিরোধী দলের সহিংসতার শিকার হয়েছেন এমন বেশ কয়েকজন ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। এর মধ্যে হাতবোমায় আহত হয়েছেন ২৫ জন। কুমিল্লার রুবেল মিয়া অটোরিকশা চালান। তিনি হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে বলেছেন, হঠাৎ করে বিরোধীদের সড়ক অবরোধের ভিতর প্রবেশ করায় আগুনে তার কোমরের নিচ থেকে পুড়ে গেছে। এছাড়া, হামলাকারীরা বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনের আগে ও পরে হিন্দু সম্প্রদায়ের মালিকানা বাড়ি ও দোকানে ভাঙচুর চালায়। হামলা চালানো হয় খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ওপরও। নির্যাতিত ব্যক্তিরা সাক্ষাৎকারে কোন কোন হামলার জন্য বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও জামায়াতে ইসলামীর কর্মীদের দায়ী করেছেন। নির্বাচনে প্রথাগতভাবে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে থাকেন হিন্দুরা। সরকারের উচিত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর চালানো সকল হামলার তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের বিচার করা। ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের ব্যর্থতা রয়েছে। তা সত্ত্বেও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বাংলাদেশ সরকারের কাছে আহ্বান জানাচ্ছে একটি স্বাধীন ও এক্সটার্নাল বডি গঠন করতে, যাতে তারা পুলিশ, র‌্যাব ও বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড সহ সব আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার বিরুদ্ধে আইন লঙ্ঘনের বিষয়ে দ্রুততার সঙ্গে, পক্ষপাতিত্বহীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে পারেন। যেসব কমান্ডিং কর্মকর্তা বা সরকারি অন্য পদস্থ ব্যক্তি যদি নির্যাতনের ঘটনা জেনে থাকেন এবং তা প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়ে থাকেন তাহলে এই মেকানিজম ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে শাস্তির সুপারিশ করতে পারবে।  ব্র্যাড এডামস বলেন, নির্বাচন শেষ হয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ দৃশ্যত ভেবেছিল এসব আইন লঙ্ঘন বা নির্যাতনের কথা ভুলে যাওয়া হবে এবং সবকিছু চলতে থাকবে আগের মতোই। দুর্ভাগ্যজনক হলো, ঠিক এমন আচরণই অতীতে সহিংসতাকে উস্কে দিয়েছে। যদি এ বিষয়টিকে যথাযথভাবে চিহ্নিত করা না হয় তাহলে ভবিষ্যতেও এমন সহিংসতা দেখা দেবে।
ওই প্রতিবেদনে সাতক্ষীরায় নিহত ছোটনের মায়ের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। এতে তিনি বলেন, দিনের বেলায় যেভাবে শকুন তার শিকার ধরে ঠিক সে রকমভাবে আমার ছেলেকে ধরে নিয়ে গেছে পুলিশ। তারপর আমার এক আত্মীয় জানায় যে, ছোটনের লাশ পাওয়া গেছে ভোমরা সীমান্তের কাছে। কেন আমার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে? কি কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে? তাকে রাখার জন্য কি কোন জেল ছিল না? আমার ছেলের বিচার করার জন্য কি কোন আইন ছিল না? এভাবে ওই প্রতিবেদনে বেশ কয়েকজন নির্যাতিতের বর্ণনা তুলে ধরা হয়।