কপোতাক্ষ খননের নামে চলছে প্রকল্পের টাকা লুটপাট ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম

Picture (1)ডাঃ আওরঙ্গজেব কামাল খুলনা থেকে ঃ সাতক্ষীরা, যশোর ও খুলনার মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া কপোতাক্ষ নদ খননের নামে খনন করা হচ্ছে খাল। খননকৃত মাটি স্তূপ করে রাখা হচ্ছে নদের ভিতরেই। ফলে ভারী বৃষ্টি হলেই এ মাটির স্তূপ ধসে ফের নদ ভরাট হয়ে যাবে। খনন প্রকল্পের ডিজাইন অনুযায়ী হচ্ছে না খনন কাজ। এ অবস্থা সাতক্ষীরার তালা উপজেলার উপর  দিয়ে বয়ে যাওয়া কপোতাক্ষ নদের।

বর্তমানে প্রায় ৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে ২১ দশমিক ২৫০ কিলোমিটার খননের কাজ চলছে। খনন কাজ বাস্তবায়নে অভিযোগ উঠেছে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের। কপোতাক্ষ খননের নামে চলছে প্রকল্পের টাকা লুটপাট। কপোতাক্ষ নদ ঝিনাইদহ’র মহেশপুর উপজেলার তাহেরপুর নামক স্থান থেকে উৎপত্তি হয়ে চুয়াডাঙ্গার জীবননগর, যশোর’র ঝিকরগাছা, কেশবপুর ও মনিরামপুর, সাতক্ষীরার তালা, কলারোয়া, আশাশুনি ও শ্যামনগর এবং খুলনার পাইকগাছার শিববাড়ি শিপসা নদীর ত্রিমোহনায় মিশেছে। কপোতাক্ষ নদের দৈর্ঘ্য প্রায় ২০০ কিঃমিঃ। বর্তমানে সাত কিঃ মিঃ বাদে এ নদের সবই পলি পড়ে ভরাট হয়ে গেছে। ফলে কপোতাক্ষ তীরের কয়েক লাখ মানুষ প্রতিবছরই জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে আসছে।

জানা যায়, প্রায় ২৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১১ সালের জুলাই মাসে চার বছর মেয়াদী কপোতাক্ষ নদ খনন প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। এ প্রকল্পের আওতায় ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ২১ দশমিক ২৫০ কিলোমিটার খননে ৬১ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৬০০ টাকা ব্যয় ধরা হয়। এ খনন কাজ ১৫ টি গ্রুপে কার্যাদেশ দেওয়া হয় ১২টি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে। যার দৈঘ্য ১৯ হাজার ৪৫০মিটার। এর মধ্যে দুই জন ইউপি চেয়ারম্যানকে টেন্ডার ছাড়াই, অবৈধ ভাবে  ৮৫৫ মিটার ও  চার জন ইউপি সদস্যকে ৯৪৫ মিটার কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে বলে পাউবো সূত্রে জান গেছে। কার্যাদেশ পাওয়া ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান গুলো হলো- যশোর সদরের মেসার্স কপোতাক্ষী এন্টারপ্রাইজ, এমএসসি-একেএ, কেএমআই-এমজিআর, এমএএইচ-এমজিএফ, এমএসসি-একেএ, মেসার্স রেজা এন্টারপ্রাইজ, এসএনএইচ-এমজিআর, মোঃ নূর হোসেন, এমএসসি-এএন্ডসি, এমইবিএল-কেই, সাতক্ষীরা সদরের এসএইউ-এমকেই ও  খুলনার মোঃ শামিম আহসান। এ ছাড়া টেন্ডার ছাড়াই তালা উপজেলার খেশরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এস এম লিয়াকত হোসেন, এই ইউনিয়নের ইউপি সদস্য শামসুল আলম, ইউপি সদস্য সিদ্দিক হোসেন, ইউপি সদস্য নিমাই সানা, একই উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম মফিদুল হক লিটু, এই ইউনিয়নের ইউপি সদস্য আব্দুর রাজ্জাককে কাজ দেয়া হয়েছে।

কপোতাক্ষ নদ খনন প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী, নদের তলা ১০৩ ফুট (৩১.৪০মিটার ) থেকে শুরু করে (স্থান বিশেষ) ১৩০ ফুট (৩৯.৬৪মিটার) পর্যন্ত চওড়া (প্রস্থ) হবে। আর উপরে (মাথা) ১৪৮ ফুট (৪৫ মিটার) থেকে শুরু করে (স্থান বিশেষ) ২০৩ ফুট (৬২ মিটার) পর্যন্ত চওড়া (প্রস্থ) হবে এবং গভীরতা হবে ১০ ফুট (৩.১০ মিটার) থেকে শুরু করে (স্থান বিশেষ) ১৪ ফুট (৪.২০ মিটার) পর্যন্ত।

কেশবপুর পানি উন্নয়ন বোডের উপ-সহকারী প্রকৌশলি শফিকুল ইসলাম শেখ জানান, খননের মূল নকশা থেকে চলতি অর্থবছরে (২০১৩-১৪) খনন করা হচ্ছে- নিচে (তলা) ৩৩ ফুট (১০মিটার ) ও উপরে (মাথা) ৪৯ ফুট (১৫ মিটার) এবং গভীরতা সাড়ে ৬ ফুট (২ মিটার)।

সরেজমিনে তালা উপজেলার তালা সদর,মাগুরা, বারুইপাড়া ও চরগ্রামে গিয়ে দেখা যায়, কপোতাক্ষ নদের এক পাশে খননযন্ত্র (এস্কেভেটর) দিয়ে খনন করা হচ্ছে। আটটি খননযন্ত্র (এস্কেভেটর) দিয়ে এই খনন কাজ করছে। খননের মাটি নদের ভেতরে স্তুপ করে রাখা হচ্ছে। আবার কোন কোন স্থানে (স্থান বিশেষ) চাচা-ছোলা করা হচ্ছে বা হয়েছে। সব মিলিয়ে দায়সারা ভাবে খনন করা হচ্ছে কপোতাক্ষ নদ।

মাগুরা গ্রামের জহর আলী গাজী অভিযোগ করে বলেন, কপোতাক্ষ নদের তলা ২২ থেকে ২৫ ফুট, উপরে ৩৫ থেকে ৪০ ফুট ও তিন থেকে চার ফুট গভীর করে খনন করা হচ্ছে। খননের মাটি নদের ভেতরে স্তুপ করে রাখা হচ্ছে। বর্ষা হলেই এ মাঠিতে নদ আবার ভরাট হয়ে যাবে। আমরা প্রকল্পের মূল নকশা অনুযায়ী খনন কাজ দেখতে চাই।

মাগুরা গ্রামের শিক্ষক জনাব আলী জানান, কপোতাক্ষ নদ খননে আগেও যে লুটপাট হয়েছে, এবার তাই হচ্ছে। পাউবো কর্মকর্তা ও ঠিকাদাররা কপোতাক্ষকে দুধের গাভী হিসেবে ব্যবহার করছে। খননের নামে তারা লুটপাট ছাড়া কিছুই বোঝে না। মাগুরা গ্রামের নিমাই দেব নাথ বলেন,‘ খনন করে যে ভাবে মাটি রাখা হচ্ছে, এতে ভূমিদুস্যদের চর দখলের সুবিধা হবে। এবার যে যার মতো এ নদের জমি দখল করে নেবে।’বারুইপাড়া নারায়ন দেবনাথ অভিযোগ করে বলেন, পানি উন্নয়ন বোডের কর্মকর্তারা কাজ তেমন তদারকি করে না। ফিল্ডে আসে না ঠিকমতো। এজন্য ঠিকাদাররা সুযোগ পায়। এমন কথা মাগুরা গ্রামের সুফিয়া বেগম, সাদ্দাম হোসেন, গনেশ মন্ডল, বিধান রায়সহ কয়েক জনের।

খননযন্ত্র (এস্কেভেটর) চালক মিজানুর রহমান বলেন, নদের এক পাশ খনন করা হচ্ছে। এই মাটি নদের তীরে রাখা হচ্ছে। পরে এ মাটি অপসারণ করা হবে। নিয়ম অনুযায়ী খনন হচ্ছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঠিকাদার আমাদেরকে যে ভাবে বলেছে, সেই ভাবে খনন করছি। ঠিকাদারের পক্ষে কাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা জামানুল হক মুন্নি জানান, নকশা অনুযায়ী খনন করার চেষ্টা করছি। তবে সবখানে সঠিক ভাবে বাস্তবায়ন হয় না। তিনি বলেন,‘যশোরের এমএসসি-একেএ ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠিনের মালিক শামিম চাকলাদার বাবু সহ ১২জন ঠিকাদার এই খননের কাজ বাস্তবায়ন করছেন।’ কেন্দ্রীয় পানি কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ শফিকুল ইসলাম বলেন, কপোতাক্ষ নদ মুল ডিজাইন অনুযায়ী খনন করা হচ্ছে না। লোক দেখানো খনন করে লুটপাট করা হচ্ছে। নকশা অনুযায়ী খনন কাজ না করা হলে কপোতাক্ষ নদ কোন ভাবেই বাঁচানো যাবে না। আর কপোতাক্ষ নদ না বাঁচলে সাতক্ষীরা,যশোর ও খুলনা অঞ্চলের প্রায় ৫০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই এলাকা মানুষের বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। এ ব্যাপারে তিনি প্রধানমন্ত্রী, পানি সম্পদ মন্ত্রীসহ সরকারের সংশিষ্ট মহলের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেন। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এমএসসি-একেএ মালিক যশোরের শামিম চাকলাদার বলেন, ‘নকশা অনুযায়ী খনন করা হচ্ছে। তবে খননকৃত মাটি আপাতত নদের ভেতর রাখা হচ্ছে। এ মাটি নদের ভেতর থেকে অপসারণ করা হবে।’ একই কথা বলেছেন ঠিকাদার মোঃ শামিম আহসান। কাজ তদারকি কর্মকর্তা (পাউবোর এসও) মোঃ রফিকুল ইসলাম জানান, খনন কাজে কোন প্রকার অনিয়ম হচ্ছে না। ঠিকাদারদের দিয়ে স্ষ্ঠুভাবে কাজ করানোর জন্য মাঠে পড়ে আছি। চলতি বছর অর্ধেক খনন করা হবে। বাকী অর্ধেক খনন করা হবে আগামী বছর। তিনি আরো বলেন, এ বছর প্রায় ৬২ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। খেশরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এসএম লিয়াকত হোসেন কপোতাক্ষ খননের কাজ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘নামে আমি কাজ পেয়েছি। ভেতরে অনেকই এ খনন কাজের সাথে আছে।’ যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলি মোঃ মশিউর রহমান বলেন, নদের ভেতরে কোন মাটি রাখা যাবে না। মাটি নদের ভেতর থেকে অপসারণ করতে হবে। সঠিক ভাবে খনন না হলে ঠিকাদার বিল পাবে না।