সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ-ধর্মপাশা-তাহিরপুরে নদীপথে বছরে ৩ কোটি টাকার চাঁদাবাজি

sunamganj-24অরুন চক্রবর্তী, সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি ঃ
সুনামগঞ্জ জেলার জামালগঞ্জ-ধর্মপাশা-তাহিরপুরের হাওরাঞ্চলে ৬০ কিলোমিটার নদী পথে কয়লা ও বালু পাথরবাহী নৌকা থেকে বছরে প্রায় ৩ কোটি টাকার  চাঁদা উত্তোলন করছে একটি সিন্ডিকেট। দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে চাদাবাজি হলেও প্রশাসন বাটোয়ারা পেয়ে রয়েছে নিরব। বিভিন্ন সময়ে চাদাবাজদের কাছে অসহায় শ্রমিক ও মালিকরা নৌ ধর্মঘট, বিক্ষোভ সমাবেশ ও স্মারকলিপি দিয়েও কোন ফল পাননি। উল্টো তারা হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। দিনদিন চাদাবাজরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। শীঘ্রই চাদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে ক্ষুব্দ হয়ে উঠেছেন শ্রমিক-মালিকরা। তারা আন্দোলনের জন্য সংগঠিত হচ্ছেন।তাহিরপুর উপজেলার বড়ছড়া, টেকেরঘাট, ছাড়াগাঁও শুল্কস্টেশন থেকে কয়লা, ফাজিলপুর থেকে বালু ও নুড়ি পাথর ক্রয় করে সারা দেশে যোগান দেয় ব্যবসায়ীরা। এসব আমদানিকৃত পণ্য বহনের একমাত্র মাধ্যম জামালগঞ্জ, তাহিরপুর ও ধর্মপাশার নদীপথ। ঐ নদীপথে বলগেট, কার্গো, নৌকা গুলো চলাচলের সময় ৮-৯ টি স্থানে ইঞ্জিন চালিত ছোট নৌকা দিয়ে চাঁদা আদায় করেই চলছে সংঘবদ্ধ ওই চাঁদাবাজ চক্রটি। প্রতিদিন প্রায় শতাধিক নৌকা ও শতাধিক কার্গো থেকে লাখ লাখ টাকা চাঁদা অদায় করা হয় বলে জানা গেছে। চাঁদাবাজদের কথামতো চাঁদা না দিলে মারপিটসহ প্রান নাশের হুমকি দিচ্ছে ব্যবসায়ীদের কে। এ সব চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে জামালগঞ্জ ও ধর্মপাশা থানায় একাধিক চাঁদাবাজির মামলায় জেল থেকে জামিনে এসে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে পেশাদার এই চক্রটি। জামালগঞ্জ-ধর্মপাশা হয়ে ভারতীয় সীমান্তবর্তী উপজেলা তাহিরপুর পর্যন্ত ৬০ কিলোমিটার নদীপথে চাদাঁবাজির শিকার হচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কয়লা, বালি-পাথর বহনকারী বলগেট ও কার্গোর মালিক-শ্রমিকেরা। নদীপথে অসংখ্য ¯পটে চাঁদাবাজির দৃশ্য বড়ই নির্মম। বলগেট চালক কার্গোর মাস্টার ও সুকানীরা চাঁদা দিতে বিলম্ব কিংবা অপরাগতা প্রকাশ করলেই শুরু হয় তাদের উপর শারীরিক নির্যাতন। এমনকি কার্গো ও বলগেট থেকে তাদের খাবার ও পরনের কাপড় সহ বিভিন্ন সরঞ্জামাদি জোড় পূর্বক নিয়ে যায় বলে জানিয়েছেন চালকরা। এ ব্যাপারে জামালগঞ্জ উপজেলার গজারিয়া বাজার ঘাটে অসংখ্য কার্গো, বলগেট চালক, সুকানী ও শ্রমিকরা একত্রিত হয়ে চলতি মাসেই চাদাঁবাজি বন্ধের দাবিতে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট ডাকের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। গত ১৮ এপ্রিল কার্গো মাস্টার মোঃ লিটন মিয়া, সবুজ আহমদ, আঃ সালাম এর নেতৃত্বে জামালগঞ্জের সুরমা নদীর তীরে অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রস্তুতি সভা। তারা উলে¬খ করেন গজারিয়া নদীপথে মিলনপুর থেকে মাহমুদ নগর, শানবাড়ি, ফাসুয়ার মুখ সøুইচ গেইট, আহসানপুর, মাহমুদপুর, পন্ডুব, বেহেলী , ফতেহপুর, আনোয়ার পুর ব্রীজের উপরে-নিচে, ঘাগড়া ও বিন্নাকুলি এলাকায় সকল নৌযান থেকে অযৌক্তিক, অন্যায়  ও বেআইনীভাবে ৫শত থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত প্রতি নৌকা থেকে চাদাঁ আদায় করে চাঁদাবাজরা। আল¬াহ ভরসা পরিবহনের মাস্টার লিটন মিয়া বলেন, চাদাঁবাজদের হাতে অনেকেই টাকা দিয়েও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বি-বাড়িয়ার রাফি পরিবহনের মাস্টার সজল মিয়া, বরিশালের এম এফ-৩ পরিবহনের আঃ সালাম, কাওসার পরিবহনের জাহাঙ্গীর, বি-বাড়িয়ার বিপাশা পরিবহনের আয়াত উল¬াহ, মা পরিবহনের সাইফুল ইসলাম, যশোরের ভান্ডারী পরিবহনের রেনু মিয়া, বাজিতপুরের সাত তারা পরিবহনের  ইদ্রিস মিয়া, বরিশালের হাসান-হোসেন পরিবহনের সবুজ মিয়া বলেন আপনা খোঁজ নিয়ে দেখেন কারা এই চাঁদা আদায় করে। আমরা এদের নাম বল্লে আমাদের পিঠের চামড়াতো থাকবেইনা, জীবন বাঁচানোই দায় হয়ে পড়বে। তবে নাম না বলার শর্তে বেশ কয়েক জন জানান, জামালগঞ্জে গজারিয়া ও মিলনপুর নদী এলাকায় করিম, বকুল, রফিকুল, সাইকুল, এলাহী ও সেলিম বাহিনী চাদাঁবাজি করে। বেহেলী-দুর্লভপুর অংশেও আর একটি চাঁদাবাজ চক্র চাদা আদায় করে। ধর্মপাশার শানবাড়ি এলাকায় আয়নাল, হিরু, বাবুল ও বাশার মিয়ার বাহিনী, আহসানপুর এলাকায় সাইদুল, কামরুল, সামায়ুন ও আলী রেজা গংরা। এদের অনেকের বিরুদ্ধে থানায় চাদাবাজির মামলা রয়েছে। তাহিরপুরের সোলেমানপুর নদীতে চাঁদাবাজি হচ্ছে বলে নৌকা সমিতির একাধিক সূত্রে জানা গেছে। ঢাকা জেলার রমজান আলী মাঝি, ফতুলু¬ার আক্রাম মাঝি, পাগলার আওয়াল মাঝি, বাজিতপুরের রজব আলী মাঝি, গিয়াস উদ্দিন মাঝিসহ অর্ধশতাধিক বলগেড কার্গো নৌকার মাঝিদের অভিযোগ তাহিরপুরের বড়ছড়া, ছারাগাঁও ও টেকেরঘাট শুক্ল ষ্টেশন থেকে  মোহাজনরা কয়লা আমদানী করে আর আমরা এসব কয়লা ভাড়ার বিনিময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌছিয়ে দেই। কিন্তু কয়লা লোডকরে ঘাট থেকে ছাড়ার পর জামালগঞ্জে গজারিয়া নামক স্থানে সুরমা নদীতে আসা পর্যন্ত ৮-৯ টি স্থানে চাঁদাদিতে হয়। চাঁদা না দিলে মারপিট করে দ্বিগুন টাকা আদায় করে চাঁদাবাজরা। তারা আরো বলেন, পেট বাঁচাতে অনেকেই পিঠ পেতে দেন। অনেক সময় টাকা দিয়েও জীবন বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে। তবুও পেটের টানে এই পথে আসতে হয় তাদের। বলগের্ড কার্গো নৌকা সমিতির সভাপতি মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, সাধারন স¤পাদক মোঃ জাহিদ মিয়া জানান, নৌপথে চাঁদাবাজদের নিষ্ঠুর অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে গতবছর সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ উর্ধবতন কর্তৃপক্ষের বরাবর তাদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়েছিল। অভিযোগের পর প্রশাসনের হস্থক্ষেপে কয়েক মাস নদীতে কোন চাঁদাবাজ ছিলনা। পরবর্তীতে চাঁদাবাজি ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় নদীপথে যে কোন সময় বলগেড কার্গো নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে সরকারের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হবে। এব্যাপারে জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস. এম. শফি কামাল বলেন, উপজেলার বিভিন্ন নৌ-পথে চাঁদাবাজির বিষয়টি বেশ কয়েকবার আইন-শৃঙ্খলা মিটিংয়ে উত্তাপিত হয়েছে। গজারিয়া উপজেলা সদর থেকে একটু দরবর্তী হওয়ায় যাতায়াতের কারণে অনেক সময় সমস্যা হয়। তবে বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বের সাথে দেখবো ও অফিসার ইন-চার্জ (ওসি) কে শক্ত ভাবে দেখার জন্য বলব। জামালগঞ্জ থানায় অফিসার ইন-চার্জ আতিকুর রহমান বলেন, আমার এলাকায় কোন চাঁদাবাজি হয় না, সব বন্ধ করে দিয়েছি। তবে গজারিয়ায় একটু সমস্যা আছে এটি বিশেষ ভাবে নজরদারিতে রয়েছে।##