ডাবল মার্ডার নেপথ্যে প্রেম ও অপহরণ

20184_f1বিডি রিপোর্ট 24 ডটকম : রাজধানীর মিরপুর এলাকায় এক কিশোরীর প্রেমের বলি হয়েছেন দুই যুবক। রংমিস্ত্রির সঙ্গে ওই কিশোরী ঘর ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার জের ধরে মারামারিতে মারা গেছেন তারা। কিশোরী ও রংমিস্ত্রি উভয়ই পলাতক। জোড়া খুনের নেপথ্যে প্রেম, অপহরণ ও মাদক ব্যবসার বিষয় রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। রোববার রাতে কিশোরীর পালিয়ে যাওয়া নিয়ে দুই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ঝগড়া ও পরে মারামারির ঘটনা ঘটে। এরই এক পর্যায়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় দুই যুবক জাহাঙ্গীর হোসেন (৩২) ও কাইয়ুম (৩০)কে। চাঞ্চল্যকর এ  ঘটনাটি ঘটেছে মিরপুরের দক্ষিণ পীরেরবাগের বটতলা গলি এলাকায়। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুইজনকে আটক করেছে পুলিশ। তারা হলো- পারভীন আক্তার ও তার স্বামী। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ পীরেরবাগের ১ নম্বর সড়কের লেকভিউ সোসাইটির ২১/৫/বি বাড়ির গলি থেকে নিহত যুবকদের লাশ উদ্ধার করে। এদিকে হত্যাকা-ের রাতেই পীরেরবাগে র‌্যাব, পুলিশ ও সিআইডি’র ক্রাইম সিনের সদস্যরা পরিদর্শন করেছে। সিআইডি’র ক্রাইম সিনের দল হত্যার আলামত সংগ্রহ করে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে অ্যাপাচি ও ডিসকভারি ব্র্যান্ডের দুটি মোটরসাইকেল ও দুইটি মোবাইলফোন উদ্ধার করেছে। ডাবল মার্ডারের ঘটনায় পীরেরবাগ এলাকায় চরম আতঙ্ক ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। প্রত্যক্ষদর্শী, পুলিশ ও নিহতের স্বজনেরা জানান, পীরেরবাগ বটতলা গলি এলাকার জনৈক ব্যক্তির কিশোরী কন্যার (পুলিশ তদন্তের স্বার্থে নাম প্রকাশ করেনি) সঙ্গে একই এলাকার বাসিন্দা রংমিস্ত্রি বেলালের প্রায় তিন বছর ধরে প্রেম চলে আসছিল। এ ঘটনায় শুক্রবার রাতে ওই কিশোরী বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে বেলালকে বিয়ে করে। এ খবর জানার পর কিশোরীর পরিবারের লোকজন বেলালের বোন পারভীনের পীরেরবাগ বাড়িতে যান। এ সময় তারা বেলাল ও কিশোরীর বিয়ের ঘটনাটি জানায়। পরে তারা পারভীনের কাছে কিশোরী ও বেলাল কোথায় আছে এ তথ্য জানতে চাওয়ায় তাদের উপরে চরম ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন পারভীন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে বাকবিত-া হয়। এসময় পারভীন কিশোরী পরিবারের লোকজনকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন। পরে তারা বাধ্য হয়ে বেলালের বোনের বাড়ি থেকে চলে যান। এর কিছুক্ষণ পরে রাত সাড়ে ১১টার দিকে কিশোরীর পরিবারের লোকজন দুটি মোটরসাইকেলে করে আবার পারভীনের বাড়িতে যায়। এ সময় কিশোরীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে পারভীনের সঙ্গে ব্যাপক ঝগড়া ও হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। এসময় বেলালের আত্মীয়স্বজন মেয়ে পক্ষের দুই যুবক ও মাদক ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর ও কাইয়ুমকে ছুরি দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে। এসময় মেয়ে পক্ষের অন্য লোকজন পালিয়ে প্রাণে বাঁচেন। ছুরিকাহত দুই যুবক রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় দীর্ঘ সময় পড়ে ছিলেন। রক্তক্ষরণের কারণে ঘটনাস্থলেই তাদের মৃত্যু হয়। খবর পেয়ে পুলিশ রাত ১২টার দিকে পীরেরবাগের লেকভিউ সিটির ১ নম্বর রোডের নির্মাণাধীন একটি বাড়ির পাশ থেকে লাশ উদ্ধার করে।
স্থানীয় বাসিন্দা হুমায়ুন মিয়া জানান, আনুমানিক রাত তখন ১১টা। এসময় এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার সময় মোটরসাইকেলের আওয়াজ তারা অনেকেই শুনতে পান। তার কিছুক্ষণ পরে পারভীন নামে ওই মহিলার বাড়িতে বেশ হৈচৈ শোনা যায়। এরপরে কি হয়েছে তার জানা নেই বলে জানান। পারভীনের বাড়িতে নিয়মিত ঝগড়াঝাটি হতো। স্থানীয় সূত্র জানায়, নিহত জাহাঙ্গীর ও কাইয়ুম ছিলেন অন্তরঙ্গ বন্ধু। কাইয়ুম দীর্ঘদিন বিদেশে ছিলেন। বিদেশ থেকে দেশে আসার পরে কোন কাজ না করায় ঘটনাটি পছন্দ করতো না তার পরিবার। এ নিয়ে পরিবারের লোকজনের সঙ্গে তার মনোমালিন্য চলছিলো। একই বাড়িতে থাকার পরেও কাইয়ুমকে তার পরিবারের লোকজন আলাদা ঘরে থাকার ব্যবস্থা করেন। বাড়ির উত্তর কোণের আলাদা ঘরে থাকতেন কাইয়ুম। নিজের ঘরে কাইয়ুম তার বন্ধুদের নিয়ে অনেক রাত পর্যন্ত আড্ডা দিতেন। অধিক রাত জেগে উচ্চ শব্দে গান বাজাতেন। সেখানে মাদকের আসর বসতো বলেও এলাকাবাসী জানিয়েছেন। বখাটে বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে কাইয়ুম নেশার জগতে পা বাড়ায়। এ সময় তার সঙ্গে ইলেকট্রিক দোকানদার জাহাঙ্গীরের বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। গত দেড় বছর আগে জাহাঙ্গীরের সঙ্গে  কাইয়ুমের পরিচয় হয়। জাহাঙ্গীর পেশায় একজন ইলেকট্রিক মিস্ত্রি হওয়ায় মাঝে মধ্যে নেশা করতেন। এরফলে তাদের দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব ছিল আরো গভীর। গত এক বছর আগে বরিশালের মেয়ে পুতুলকে জাহাঙ্গীর বিয়ে করেন। বিয়ের পরে পুতুল জানতে পারেন তার স্বামী নেশা করেন। এ নিয়ে স্বামী জাহাঙ্গীরের সঙ্গে পুতুলের প্রায় ঝগড়া-বিবাদ হতো। জাহাঙ্গীর ও কাইয়ুম মাদক ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত ছিল। কাইয়ুম ইয়াবাসহ পুলিশের হাতে ধরাও পড়ে। এ ঘটনায় সে কিছুদিন কারাগারে ছিলো।
জেলখানা থেকে কাইয়ুম বেরিয়ে আসার পরে দুই বন্ধু মিলে তারা ইয়াবা ও গাঁজা ব্যবসা ছেড়ে দেয়। তবে মাদকের নেশা ছাড়তে পারেনি। রোববার সন্ধ্যায় কাইয়ুম তার বন্ধুদের নিয়ে নিজের ঘরে নেশার আড্ডা জমিয়েছিল। সেই আড্ডায় জাহাঙ্গীরসহ তাদের পরিচিত ৪/৫ বন্ধুও  ছিলো।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে জাহাঙ্গীরের ভাই শহীদুল ইসলাম জানান, মিরপুর কাশেম আলী রোডে জাহাঙ্গীরের একটি ইলেকট্রিক দোকান আছে।  তিনি স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন শ্যাওড়াপাড়ার ওয়াসা রোডের ভাড়া বাড়িতে। জাহাঙ্গীরের  গ্রামের বাড়ি সাভার জেলা সদরে। তার বাবার নাম জয়নাল আবেদীন। স্ত্রী সন্তানসম্ভবা হওয়ায় ১৫ দিন আগে তাকে শ্বশুরবাড়ি বরিশালের কাউনিয়ায় রেখে আসে জাহাঙ্গীর।
তিনি আরো বলেন, পুলিশের কাছ থেকে সকালে জাহাঙ্গীর হত্যার খবর পেয়েছেন তারা। কিন্তু, কি কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে এ বিষয়ে তারা কিছুই জানতে পারেন নি। জাহাঙ্গীরের প্রথম স্ত্রীর সংসারে জবা (৮) ও জেরিন (২) নামে তাদের দুটি মেয়ে রয়েছে। তিনি আরো বলেন, ৪ বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে জাহাঙ্গীর হচ্ছে দ্বিতীয়।
নিহত কাইয়ুমের ভাই কায়েছ জানান, তার ভাই কাইয়ুম দীর্ঘ ১৪ বছর মালয়েশিয়ায় ছিলো। গত দুই বছর ধরে সে দেশে ফিরেছে। কিন্তু, বিদেশ থেকে আসার পরে তার ভাই বেকার ছিলো। মিরপুরের মধ্য পীরেরবাগের ৭৮/৩ নম্বর বাড়িতে চার ভাই ও তিন বোন নিয়ে তারা থাকতেন। তিনি বলেন, রোববার রাত ১১টার দিকে কাইয়ুম কাউকে কিছু না জানিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিলো। এর কিছুক্ষণ পরে তাদের কাছে খবর আসে তাদের বাড়ির অদূরে কাইয়ুম ও অপর এক অপরিচিত যুবককে দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে হত্যা করেছে। এ সময় তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেন জাহাঙ্গীরের থেকে একটু দূরে আলাদা জায়গায় তার ভাই কাইয়ুমের লাশ পড়ে আছে। কি কারণে এবং কারা তার ভাইকে হত্যা করতে পারে সাংবাদিকদের এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এলাকায় তাদের কোন শত্রু আছে বলে জানা নেই। তিনি বলেন, হত্যাকা-ের ঘটনাটি পুলিশ তদন্ত করলেই বেরিয়ে আসবে।
সরজমিন গিয়ে দেখা যায়, ঘটনাস্থলের পাশেই একটি চায়ের দোকান রয়েছে। বটতলার পাশে একটি নির্মাণাধীন ভবনের কাজ চলছে।
ঘটনার বিষয়ে মিরপুর থানার ওসি মো. সালাহ উদ্দিন জানান, ‘খুনের মোটিভ সম্পর্কে মোটামুটি জানা গেছে। পীরেরবাগের বেলাল নামে এক রংমিস্ত্রি একই এলাকার এক কিশোরীকে নিয়ে গত শুক্রবার পালিয়ে যায়। রংমিস্ত্রি  বেলাল ওই কিশোরীকে প্রায়  দেড় বছর আগে বিয়ে করেন। কিন্তু, তারা পরস্পর আলাদা আলাদা থাকতো। বিষয়টি উভয় পরিবার মেনে নিতে পারেনি।
তিনি আরো বলেন, বেলাল ও ওই কিশোরীর বিষয়টি ফয়সালা করার জন্য উভয়পক্ষ বেলালের বাড়িতে একটি সালিশি বৈঠকে বসেছিল। কিন্তু, তারা কোন সমাধানে আসতে পারেনি। এসময় উভয়পক্ষ একে অপরকে দেখে নেয়ার হুমকি দিয়েছিল।
ওসি আরো বলেন, রোববার রাতে এ বিষয়টি নিয়ে রংমিস্ত্রির বোন পারভীনের সঙ্গে মেয়েপক্ষের লোকজনের হাতাহাতি হয়। পরে জাহাঙ্গীর ও কাইয়ুমসহ চার জন দুটি মোটরসাইকেলে ওখানে যান এবং দুই পক্ষের সংঘর্ষে তারা দুজন নিহত হন। তিনি আরো বলেন, নিহত দুইজনের শরীরে বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন আছে। তাদেরকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়িভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ওসি জানান, এ হত্যাকা-ের সঙ্গে আর কোন ঘটনা জড়িত আছে কিনা তাও পুলিশ তদন্ত করছে।