ইলিয়াস আলী গুমের ২ বছর : হিমঘরে তদন্ত

19442_f3বিডি রিপোর্ট 24 ডটকম : বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী গুমের তদন্তে দুই বছরেও কোন কূল-কিনারা করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তিনি বেঁচে আছেন কি নেই- এ প্রশ্নের উত্তর মেলেনি দুই বছরেও। খোঁজ মেলেনি তার গাড়িচালক আনসার আলীরও। ঘটনার পর ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা বনানী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন। প্রথম দিকে সেই জিডি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা চোখে পড়লেও এখন তা থমকে আছে। তিনবার পরিবর্তন হয়েছে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা বনানী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) বদলি হয়েছেন সপ্তাহ খানেক আগে। সাত দিন পার হলেও নতুন কোন কর্মকর্তাকে এখন পর্যন্ত দায়িত্ব দেয়া হয়নি। তদন্তে অনেকটা গরজ নেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) লুৎফুল কবীর বলেন, তদন্তে গরজ নেই এমনটা বলা যাবে না। সাধ্য অনুযায়ী পুলিশ বিষয়টি অনুসন্ধান করছে। তবে এখন পর্যন্ত আশানুরূপ কোন ফলাফল পাওয়া যায়নি।
সূত্র জানায়, আলোচিত এই ঘটনার পর বনানী থানা পুলিশ থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সংস্থা বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে। কিন্তু কেউই ইলিয়াস আলীর গুম হওয়ার রহস্য উন্মোচন করতে পারেনি। এমনকি তিনি আদৌ বেঁচে আছেন নাকি অপহরণকারীদের হাতে তার মৃত্যু হয়েছে তা-ও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ঘটনার পর ইলিয়াস আলীকে উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সংস্থা দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযানও চালায়। কিন্তু সব অভিযানই ব্যর্থ হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আলোচিত এই ঘটনার রহস্য উন্মোচন করতে না পারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক বড় ব্যর্থতা। এমনকি বিএনপি ও পরিবারের পক্ষ থেকে ইলিয়াস আলী গুমের নেপথ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাত রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়। কিন্তু এমন অভিযোগ খ-াতেও কোন তৎপরতা নেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর।
সূত্র আরও জানায়, প্রথম কয়েক দিন বাদ দিলে গত দুই বছরে তদন্তে কোন গরজই ছিল না। এই দুই বছরে তদন্তকারী কর্মকর্তারা আদালতে ৩৬টি অগ্রগতি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তবে তা নামেই। সব অগ্রগতি প্রতিবেদনের ভাষা একই। অনেকটা কাগজে-কলমের অগ্রগতি প্রতিবেদন এসব। বাস্তবের ফলাফল শূন্যের কোঠায়।
শুরুতে আদালতের নির্দেশে দুই কার্যদিবস পরপর তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন আদালতকে জানাতে হতো। পরে তদন্ত কর্মকর্তা দুই দফা আদালতের কাছে আবেদন করে প্রথমে দশ দিন ও পরে এক মাস সময় বাড়িয়ে নেন। প্রথম বছরে তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে ২৫টি তদন্ত অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করেন। দ্বিতীয় বছরে আরও ১১টি অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। তবে আদালতে জমা দেয়া তদন্ত প্রতিবেদনগুলোতে কার্যত কোন অগ্রগতির কোন তথ্য নেই এসব প্রতিবেদনে ইলিয়াস আলীর গাড়ির বর্ণনা, ঘটনাস্থলের বিবরণ, ইলিয়াস আলীর সর্বশেষ অবস্থান হোটেল শেরাটনের সিসিটিভির ফুটেজ, মোবাইলের কললিস্টের তথ্য, ইলিয়াস আলীর পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য ও গাজীপুরের পূবাইলে উদ্ধার অভিযানের তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া তদন্ত প্রতিবেদনে অন্তত ৫০ জন বিএনপি নেতাকে জিজ্ঞাসাবাদের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
আলোচিত এই ঘটনাটি প্রথম তদন্ত করেন বনানী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কাজী মাইনুল ইসলাম। তিনি বদলি হয়ে গেলে তদন্তের ভার পড়ে পরিদর্শক (তদন্ত) নাসির উদ্দিনের ওপর। তিনি বদলি হলে মামলার দায়িত্ব পান নতুন যোগ দেয়া পরিদর্শক (তদন্ত) আশরাফুল ইসলামের ওপর। আশরাফুল ইসলাম গত চার মাসে আদালতে ৩টি অগ্রগতি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। সপ্তাহ খানেক আগে তিনিও বদলি হয়ে যান। গতকাল পর্যন্ত আলোচিত এই মামলাটির তদন্ত ভার অন্য কোন কর্মকর্তার ওপর ন্যস্ত করা হয়নি। পুলিশ কর্মকর্তা লুৎফুল কবীর জানান, বনানী থানায় যিনি নতুন পরিদর্শক (তদন্ত) হিসেবে যোগদান করবেন তিনিই তার ওপরই এই মামলার তদন্ত ভার ন্যস্ত হবে।
ইলিয়াস আলীর গুমের পর বিরোধী দলের আন্দোলন চলাকালে তার মোবাইল থেকে সিলেটের এক স্থানীয় বিএনপি নেতার মোবাইলে একটি মিসকল আসে। এ নিয়ে সেসময় হইচইও শুরু হয়। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই বিষয়টিও অনুসন্ধান করেনি। গুম হওয়া ইলিয়াস আলীর মোবাইল সিমটি কে ব্যবহার করছে তা-ও জানা যায়নি। এমনকি মিসকল দাতার অবস্থানও শনাক্ত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এটিএম হাবিবুর রহমান বলেন, আলোচিত এই ঘটনাটি পুলিশের পাশাপাশি প্রথম থেকেই র‌্যাব গুরুত্ব দিয়ে অনুসন্ধান করছে। ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার আগে ও পরের অনেক বিষয় নিয়ে র‌্যাব অনুসন্ধান চালিয়েছে। তবে বলার মতো কোন তথ্য র‌্যাবের হাতে আসেনি।
উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাতে রাজধানীর বনানীর দুই নম্বর সড়কের সাউথ পয়েন্ট স্কুুলের সামনে থেকে গাড়িচালক আনসার আলীসহ রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন বিএনপি নেতা এম. ইলিয়াস আলী। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় জানা যায়, হোটেল শেরাটন থেকে বাসায় ফেরার পথে বনানীর সাউথ পয়েন্ট স্কুলের সামনে তার গাড়িতে পেছন থেকে একটি গাড়ি ধাক্কা দেয়। এ সময় চালক আনসার আলী নামলে পেছনের গাড়ি থেকে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা চালক আনসার আলী ও ইলিয়াস আলীকে নিজেদের গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। এরপর থেকে তার আর কোন সন্ধান মেলেনি।