গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা প্রতিনিয়তই হচ্ছে

19295_f3ব্রাড এডামস : এক দশক ধরে লর্ড অ্যাভিবুরি হাউজ অব লর্ডসে বাংলাদেশ নিয়ে নিয়মিত শুনানি আয়োজন করে আসছেন। শুনানিগুলো বিভিন্ন গোষ্ঠীসহ আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে প্রকাশ্য আলোচনা করার ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়। ফলে এগুলো প্রায়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দুঃখজনক হলো- বাংলাদেশে এ ধরনের আলোচনা সহসা হয় না। এ রকম অনেক শুনানিতেই আমাকে ডাকা হয়েছে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলার জন্য- বিএনপির সর্বশেষ সরকার থেকে শুরু করে সামরিক সমর্থনপুষ্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পর্যন্ত। আর এ আলোচনাগুলো প্রায়ই আলোর থেকে উত্তাপ ছড়িয়েছে বেশি। কেননা বৈঠকগুলোতে উভয় দলের প্রতিনিধিদের উচ্চস্বরে কথা, একে অন্যের বক্তব্যের মধ্যে ব্যাঘাত ঘটানো, যা কিনা রীতিমতো হাতাহাতির পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছায়। তবে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে তাদের অবস্থান কি অন্তত তারা সেটা জনগণের কাছে পরিষ্কার করেছে। গত সপ্তাহে এমন একটি শুনানিতে প্রতিনিধি পাঠায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ই। বিএনপি ও অন্য দলগুলোর নির্বাচন বর্জন এবং বর্তমান সংসদ রাজনৈতিক বিতর্কের স্থান না হওয়ায় শুনানিটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ভাল সংবাদ হলো এ দফায় তেমন একটা দ্বন্দ্ব হয়নি। চেয়ার ছোড়াছুড়ি বা হাতাহাতি ছিল না। শেষ কয়েক মিনিট ছাড়া কোন চিৎকার-চেঁচামেচিও হয়নি। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ই শুনানিটি গুরুত্ব সহকারে নিয়েছে এবং বর্ষীয়ান নেতাদের পাঠিয়েছে। আওয়ামী লীগ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মন্ত্রিপর্যায়ের রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম। আর বিএনপি দলের নেতৃত্ব দেন খালেদা জিয়ার পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তার সাবেক ব্যক্তিগত সচিব সাবিহউদ্দিন আহমেদ। তিনি যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত। উভয়ই যুক্তিসঙ্গত বক্তব্য তুলে ধরেছেন। সেখানে স্পষ্ট হয়েছে তাদের নিজ নিজ দলের দৃষ্টিভঙ্গি। মূলত নির্বাচনের ওপরই প্রাধান্য ছিল। উভয় দলের অন্য প্রতিনিধিরাও বক্তব্য রেখেছেন। (কারও বক্তব্য অন্যদের তুলতায় অপেক্ষাকৃত বেশি অকপট ও বিশ্বাসযোগ্য ছিল)। নির্বাচন বর্জন ও অংশগ্রহণ নিয়ে উভয় পক্ষই তাদের অবস্থান কেন সঠিক এবং প্রতিপক্ষের অবস্থান কেন ভুল সে বিষয়ে নিজস্ব অভিমত প্রকাশ করেছে। উভয় পক্ষই সফলতার সঙ্গে প্রতিপক্ষের ভ-ামি আর অসঙ্গতি তুলে ধরেছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে কিছুদিন আগে ঐকান্তিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে ছিল। সে সময় বিরোধিতা করেছিল বিএনপি। আওয়ামী লীগ এখন ১৯৭১-এর ঘটনাপ্রবাহের জন্য জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে চায় কিন্তু নব্বইয়ের দশকে তারা জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছিল। বিএনপি এখন র‌্যাব ও অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সোচ্চার, কিন্তু র‌্যাব তারাই গঠন করেছিল (আর কিছু বিএনপি কর্মকর্তারা গোপনে স্বীকার করেন, প্রথম থেকেই উচ্চপর্যায়ের অপরাধী নির্মূল করার উদ্দেশ্যে ডেথ স্কোয়াড হিসেবে র‌্যাব গঠন করা হয়েছিল)। মিডিয়া ও এনজিও’র বিরুদ্ধে দমন-পীড়নের অভিযোগ করছে কিন্তু তারা যখন ক্ষমতায় ছিলেন সে সময়কে গ্রেপ্তার, হামলা আর নাগরিক সমাজে ভীতিপ্রদর্শনের সময় হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। বাংলাদেশে দোষ চাপানোর খেলা হলো তলাবিহীন কূপের মতো। আমি ও অন্যরা দিনে দিনে অবনতি হতে থাকা মানবাধিকার পরিস্থিতির বিবরণ দিয়েছি। র‌্যাব ও যৌথবাহিনীর হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই গল্পে সাজানো ক্রসফায়ার হত্যাকা- চর্চা আবারও বেড়েছে। গুম প্রতিনিয়ত ঘটছে। হাজারে না হলেও শ’য়ে শ’য়ে ঢালাও গ্রেপ্তার হচ্ছে। আদালত ‘ফিল ইন দ্য ব্ল্যাংক্স’ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ইস্যু করছে, যা পরে বিরোধী সমর্থকদের নাম দিয়ে পূরণ করা হচ্ছে। জামায়াত আর বিএনপির সমর্থকরা বাসে অগ্নিসংযোগ করে নিরপরাধ জনগণকে হত্যা করছে। নিহত হয়েছেন অনেক পুলিশ কর্মকর্তা। উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সম্পদ ধ্বংস হয়েছে। হিন্দু সমপ্রদায় সাংঘাতিক হামলার শিকার হয়েছে। মানবাধিকার কর্মী আদিলুর রহমানের গ্রেপ্তার ও তার বিরুদ্ধে চলমান একাধিক মামলা ও তার পরিবারকে হয়রানির বিষয়গুলো বাংলাদেশের মানবাধিকার নিয়ে কোন আলোচনাতেই এড়িয়ে যাওয়া যায় না। বিষয়টি মর্মঘাতী এবং প্রভাবশালী সমালোচক গোষ্ঠীর বাকরোধ করে দিতে এগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও ঘটনাপ্রবাহের আলোকে এক ধরনের শীতল প্রভাব অনুভব করছে। কেননা জামায়াত ও হেফাজতের বিরুদ্ধে সরকারি বাহিনীর নিপীড়নের প্রমাণ ধারণ করার সাহস দেখিয়েছিল ‘অধিকার’। সরকার মিথ্যা দাবি করে আসছে যে আদিলুর রহমান ওই উভয় দলের সমর্থক। আমি আদিল ও তার পরিবারকে ভালভাবে জানি। ফলে তার বিরুদ্ধে যেসব কথা বলা হয় এর থেকে মিথ্যা আর কিছু হতে পারে না। তিনি জঙ্গিবাদের কঠোর বিরোধী। বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে এ ধরনের অভিযোগ শুধু অন্যায় নয় ভয়াবহ এবং শোভনতার কারণে অভিযোগগুলো প্রত্যাহার করে নেয়া উচিত। সরকার যদি কোন মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্টের সঙ্গে একমত পোষণ না করে তবে তাদের জবাব দেয়ার অধিকার রয়েছে এবং তার প্রক্রিয়াও আছে। তবে তা অপরাধ আইন ব্যবহার করে নয়। নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যদের পাঠিয়ে পরিবারকে হেনস্তা করে নয়। আমি যখন শুনানিতে কথাগুলো উল্লেখ করি, পুরো ঘর নিশ্চুপ হয়ে যায়। আওয়ামী লীগ সমর্থকসহ উপস্থিত প্রত্যেকেই মাথা নাড়িয়ে সায় দেন। বিষয়টি আশাব্যঞ্জক। তারা হয়তো স্মরণ করতে পারেন বিগত সরকারগুলো যখন মানবাধিকার কর্মীদের টার্গেট করেছিল সে সময়ের কথা যাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গও ছিল। আমি একটি আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য শেষ করেছিলাম। সেটা হলো, দোষ দেয়ার খেলা বন্ধ করুন আর দীর্ঘদিন ধরে বাকি হয়ে থাকা কিছুটা অন্তঃদর্শন শুরু করুন। উভয় দলই একে অপরের মানহানি করতে এতটাই ব্যস্ত, নিজেরা কি খারাপ করেছে বা উন্নতি সাধনের জন্য কি পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে তা বিবেচনা করার অল্পই ক্ষমতা আছে বলে মনে হয়। অথবা বিবেচনা করার কোন ক্ষমতা নেই হয়তো। বছরের পর বছর ধরে লর্ড অ্যাভিবুরি’র আহ্বানে আয়োজিত শুনানিগুলো এতটা সাদৃশ্যপূর্ণ যে, বিষয়টা সত্যিই তাক লাগার মতো। যেই ক্ষমতাসীন হোক না কেন, অমার্জনীয় বিষয়গুলোর পক্ষে অবস্থান নেবে। যেমন ক্রসফায়ার হত্যাকা-। আর যারা বিরোধীতে থাকে তারা হয়ে ওঠে উদ্বুদ্ধ মানবাধিকার রক্ষাকারী। এর সব থেকে উৎকৃষ্ট উদাহরণ র‌্যাব নিয়ে তাদের অবস্থান। বিরোধী দলে থাকাকালে আওয়ামী লীগ সদস্যরা র‌্যাবের হাতে নিহত হন। আর তারা র‌্যাব বিলুপ্তিসহ এর পেছনের কুশীলবদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ২০০৯ সালের প্রথম দিকে ক্ষমতায় আসার পরপরই তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলের কাছে গিয়েছিলেন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার জন্য ‘শূন্য সহনশীলতা’ (জিরো টলারেন্স) নীতির ঘোষণা দিয়েছিলেন। আমরা ও অন্যরা ওই ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছিলাম। কিন্তু হত্যাকা- চলছেই। লন্ডনে নির্বাসিত থাকাকালে শেখ হাসিনা আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি র‌্যাবকে নিয়ন্ত্রণ করবেন এবং নিশ্চিত করবেন যে নতুন কোন নিপীড়ন যেন তাদের হাতে সংঘটিত না হয়। তারপরও র‌্যাব হত্যা করেই যাচ্ছে। এটা এখনও একটি চলমান ইস্যু। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার ৫ বছর পরও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে বাহিনীর একজন সদস্যকেও বিচারের আওতায় আনা হয়নি। ১৪ বছরের লিমনকে গুলি করার মতো নির্মম অন্যায় যখন হয় তখন দোষীদের বিচারের আওতায় আনাসহ ক্ষতিপূরণে পরিবর্তে তাকে অপরাধ মামলায় অভিযুক্ত করে ভীতিপ্রদর্শন করা হয়। সৌভাগ্যবশত পরে ওই অভিযোগগুলো প্রত্যাহার করা হয়েছে। তা-ও হয়েছে দীর্ঘ প্রচারণার পর। আওয়ামী লীগের সিনিয়র ব্যক্তিরা এখন জোর গলায় র‌্যাবের পক্ষে অবস্থান নেন। তারা দাবি করেন র‌্যাব মানবাধিকার লঙ্ঘন করে না। এটা নিতান্তই হাস্যকর। বাংলাদেশের একজনও এ অর্থহীন ধারণা পোষণ করে না। এমনকি যারা মনে করেন দেশের অপরাধ ও জঙ্গিবাদ ঠেকাতে র‌্যাব কার্যকর ভূমিকা পালন করছে, তারাও নয়। হাউজ অব লর্ডসে আমি আমার বক্তব্য শেষ করি এ কথা বলে, একে অপরকে দোষারোপ করার জন্য আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাদের এত দূর পথ সফর করে লন্ডন আসাটা অর্থহীন। অথচ দেশের পরিস্থিতির জন্য কোন দায়ভার নেয়া নয়। বিরোধীতে থাকার সময় অন্তঃসারশূন্য বক্তব্য আর ক্ষমতায় থাকাকালীন স্পষ্ট বিষয়বস্তু অস্বীকার করার চর্চা অব্যাহত রাখলে কেউ তাদের বিশ্বাস করবে না। কূটনীতিক আর দাতারা ব্যক্তিগত পরিসরে যতই বিনয়ী হোক না কেন বাস্তবতা হলো আন্তর্জাতিক মহলে উভয় দলের বিশ্বাসযোগ্যতা শূন্যের কাছাকাছি। এটা দেশটির ওপর বিভিন্নভাবে প্রভাব ফেলবে। সহায়তা, বিদেশী বিনিয়োগ থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে অংশগ্রহণ পর্যন্ত। এটা দুঃখজনক, গুরুত্বপূর্ণ একটি রাজনৈতিক আলোচনা করতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাদের লন্ডন সফর করতে হয়েছে। এ আলোচনায় ঢাকায় হলে এটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা হতো। অবশ্য সেটা যদি শ্রদ্ধামূলক পরিবেশে আয়োজন হয়। কিন্তু নেতারা তাদের ভুল স্বীকারে অসম্মত হলে সেটা কি আদৌ হতে পারে? একটিমাত্র আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, ব্যক্তিগতভাবে আমি যত বাংলাদেশীর সঙ্গে কথা বলেছি প্রায় প্রত্যেকেই একমত পোষণ করেছেন, সব সরকারের অধীনেই মানবাধিকার পরিস্থিতি খারাপ থাকে এবং তারা যদি জনগণের আস্থা আবার অর্জন করতে চান এবং নিজেদের স্বার্থের পরিবর্তে দেশের স্বার্থ পূরণ করা শুরু করতে চান তাহলে প্রত্যের দলেরই প্রয়োজন নিজেদের ভেতরে দেখা। উভয় দলের প্রতিনিধিরা ঢাকায় তাদের দলনেতাদের কাছে এ বার্তা নিয়ে গেছেন- এটাই আমার প্রত্যাশা।
ব্রাড অ্যাডামস হিউম্যান রাইট ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক পরিচালক। তার এ লেখাটি হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ওয়েবসাইট থেকে অনূদিত