হিলি শুল্কগুদামে আটককৃত ৬ কোটি টাকা মূল্যের রাসায়নিক সার ফের ভালো প্রমানিত!

03নুরুন্নবী বাবু দিনাজপুর প্রতিনিধি :

রাজশাহীতে মৃত্তিকাসম্পদ উন্নয়ন ইনষ্টিটিউটের গবেষনাগারে নমুনা পরীক্ষায় ভেজাল ও নিম্নমানের বলে প্রত্যয়ন করা সার ১৫ দিন পরই একই গবেষনাগারে পরীক্ষায় ‘ভালো মানের বলা হচ্ছে’। আর গবেষনাগারের প্রতিবেদন নিয়ে হিলি সহ ১১টি শুল্কগুদাম থেকে বিপুল পরিমানের ভেজাল ও নিম্নমানের সার নিলামের মাধ্যমে  দেশের সাধারন কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ার আশংকা দেখা দিয়েছে।

হিলি স্থলবন্দরের পানামা পোর্টে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে প্রায় ৬ কোটি টাকা মুল্যের ১ হাজার ২০০ মে:টন রাসায়নিক সার। কৃষি ও বাণিজ্য মন্ত্রনালয়ের রশি টানাটানিতে রাসায়নিক সারগুলো অবিক্রিত থেকে যায়। ধ্বংস করার উদ্যোগ নিলেও অর্থ জোগানের অভাবেই তা বন্ধ থাকে। বর্ষা এলেই বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে মুছে গড়িয়ে পড়ছে পাশের শত শত বিঘা জমি ও পাাশ্ববর্তী তুলশি গঙ্গা নদীতে। ফলে একদিকে হারিয়ে যাচ্ছে জমিগুলোর উর্বরতা শক্তি অন্যদিকে নদী দূষণের ফলে মাছের প্রজনন ক্ষমতা  হ্রাস পাচ্ছে।  পানামা হিলি পোর্টের খোলা আকাশের নিচে বিশাল জায়গা দখল করে আছে সারগুলো, ফলে এখানকার পরিবেশে দুষন ছড়াচ্ছে।

দিনাজপুর ও জয়পুরহাট জেলার বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে তৎকালিন বিডিআর বর্তমানে বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশসহ আইন প্রয়োগকারি সংস্থাগুলো ভারত থেকে চোরাই পথে আসা ইউরিয়া, পটাশ, টিএসপি ও ড্যাপসার আটক করে বিভিন্ন সময়ে  হিলি কাষ্টমসে জমা দিয়ে মামলা দায়ের করে। আর ওই সব মামলার সাথে ৫৯ টি আসামী যুক্ত শুল্ক মামলাও রয়েছে। গত ২০০৪ ইং সালে এর মজুদ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১২ লাখ ৪৫ হাজার ২৬১ কেজিতে। যার আনুমানিক মুল্য দাঁড়ায় ৫ কোটি ১৫ লাখ ৬০ হাজার ৬৪৩ টাকায়।

এদিকে দিনাজপুরের হিলি শুল্ক গুদাম থেকে গত বছর আগষ্ট মাসের ১৮ তারিখে ৫২ নম্বর স্বারকে মজুদ সারগুলোর ২৯ টি নমুনা পাঠানো হয় রাজশাহীর শ্যামপুরে ‘মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনষ্টিটিউট’র আঞ্চলিক গবেষনাগারে। নমুনাগুলোর মধ্যে ছিল ১৫ টি এমওপি (পটাশ)’র , ৩ টি করে ছিল এসএসপি, টিএসপি (ফসপেট) ও ডিএপি’র এবং ইউরিয়ার ছিল ৫ টি নমুনা। ইনষ্টিটিউটের গবেষনাগারের ২৯ টি নমুনা প্রতিবেদন ৭৪৯২ থেকে ৭৫২০ নম্বরে ওই মাসের ২৮ তারিখে পাঠানো হয়। প্রতিবেদনগুলো মধ্যে ১১ টি ছিল ভালমানের এবং বাঁকী ১৮টি ভেজাল ও নিম্নমানের উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে ১৫ টি ছিল পটাশ সারের। প্রতিবেদন পাঠানোর ১৫ দিনের মাথায় গত বছর ১২ সেপ্টেম্বরে একই নমুনার ওপরে ওই গবেষনাগার থেকে অপর প্রতিবেদনে ১৫ টি নমুনাকেই‘ ইহা একটি ভালমানের সার’- বলে মন্তব্য করা হয়েছে। লালমনিরহাটের এমওপি (পটাশ) সারের ৭৪৯২ নম্বর প্রদত্ত নমুনাটিকে সার ব্যবস্থাপনা আইন ২০০৬ এর ১৭ (২) এর(ঘ) উপধারা মোতাবেক ভেজাল মন্তব্য করা হয়েছিল। পরের প্রতিবেদনে– ’ইহা একটি ভালো মানের এমওপি সার‘ বলে মন্তব্য করা হয়েছে।

হিলি কাষ্টমস কর্মকর্তা ও গুদাম কর্মকর্তা বলেন, শর্তসাপেক্ষে আমদানিযোগ্য পন্য আটক হলেই ওই সকল পন্য নিলাম যোগ্য, ২০০৯ সালের প্রথম দিকে বানিজ্য মন্ত্রনালয়ের এমনি এক প্রজ্ঞাপনের আলোকে আটককৃত মজুদ সারগুলোর মধ্য থেকে ওই বছরে জুন মাসের ২৯ তারিখে নিলামে বিক্রির জন্য হিলি কাষ্টমস ৩টি লট তৈরী করেন। সর্বমোট ৫ লক্ষ ৮২ হাজার ১৯৩ কেজি রাসায়নিক সার ৯৩ লক্ষ ৩১ হাজার ৯৪১ টাকায় তা নিলামে বিক্রিও করা হয়। ওই প্রজ্ঞাপনে আলোকে আটককৃত মজুদ গুড়ো দুধ গুলোও নিলাম দেয়া হয়। এরপর ওই বছরের শেষের দিকে কৃষি মন্ত্রনালয়ের অপর এক প্রজ্ঞাপনে আটক সারগুলো নিম্নমানের বিধায় কৃষকদের ক্ষতির দিকটি বিবেচনা করেই উক্ত আটক সার গুলো ধ্বংস করার নির্দেশনা জারি করেন এবং কি ভাবে ধ্বংস করা হবে তার একটি চিত্রও তুলে ধরা হয়েছিল ওই নির্দেশনায়। ফলে বাঁকী সারের নিলাম বন্ধ হয়ে যায়। আর সারগুলো ধ্বংস করতে  ব্যয় হবে প্রায় ৫লক্ষ টাকা, এমনও চাহিদা দিয়েছিলেন সে সময়ে হিলি কাষ্টমস কর্তৃপক্ষ। তিনিও সারের গুনগত মান নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে আরও বলেন আটকের পর থেকে সঠিক ভাবে রক্ষনাবেক্ষন না করায় সারগুলো খোলা আকাশের নিচে অযতেœ পড়ে থাকায় মান নষ্ট হতে পারে।

আরও জানা যায়, ২০০৪ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত হিলি কাষ্টমস কর্তৃপক্ষ বিষয়টি সুরাহা করতে সংশ্লিষ্ট উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে পরপর বেশ কয়েকটি পত্রও পাঠিয়েছিলেন। এর আগে গত ২০১০ সালে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের অপর এক নির্দেশে বলা হয়, যে সকল আটককারী সংস্থা সার আটক করবেন, তারাই দ্রুত ধ্বংসের ব্যবস্থা করবেন। ফলে আটককৃত সার গ্রহন করা বন্ধ করে দেয়, হিলি কাষ্টমস কতৃপক্ষ।

এদিকে সার পরীক্ষার ফলাফলের অনিয়মের কথা তুলে ধরে গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বরে কৃষি মন্ত্রনালয়ের সচিব বরাবরে লিখিত অভিযোগ করেছেন রংপুরের একজন ব্যবসায়ী। তাতে বলা হয়েছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সারগুলো কেনার জন্য শুল্কগুদাম কর্তৃপক্ষ ও মৃত্তিকা পরীক্ষা কার্যালয় তৎপর রয়েছেন। তা না হলে ভেজাল সার কি করে ভালোতে রুপান্তরিত হলো? তিনি আশংকা প্রকাশ করেছেন সারগুলো বাজারজাত হলে কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্থ হবে।

হকিমপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আজাহারুল ইসলাম জানান, সারগুলো সরবরাহ নেয়ার জন্য মো:আব্দুর রাজ্জাক ও মো: ইব্রাহিম হোসেন নামের দু’জন ব্যক্তি কাগজ পত্র নিয়ে তার কাছে এলে তিনি দিনাজপুর জেলা প্রশাসককে জানান। পরে সারগুলো যাচায়ের জন্য গত ৩ এপ্রিল নমুনা চেয়ে পাঠান জেলা প্রশাসক। এদিকে গত ৫ এপ্রিল একজন সহকারী কমিশনার ও ম্যাজিষ্ট্রেট আফরোজা বেগম হিলি পানামা পোর্টে সংরক্ষিত এলাকা থেকে ৩২ টি বয়ামে বিভিন্ন প্রকার সারের নমুনা সংগ্রহ করেছেন।

কৃষি মন্ত্রনালয় কৃষকদের ক্ষতি হবে এমন চিন্তা করেই সারগুলো ধ্বংসের কথা জানালেও এবং কিভাবে ধ্বংস করতে হবে সেদিক নির্দেশনা দিলেও শুধু অর্থাভাবে ধ্বংস করা সম্ভব হয়ে না উঠায় আজ দীর্ঘ ১০ বছর পরও সারগুলো জমিতে প্রয়োগ করলে ক্ষতিই হবে এমনই কথা বলছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা।