কক্সবাজারে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে সৃজিত বনায়ন বরাদ্দে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ

indexএম.শাহজাহান চৌধুরী শাহীন, কক্সবাজার :
কক্সবাজারে উত্তর বনবিভাগের ফুলছড়ি রেঞ্জাধীন ৫০হেক্টর বনভুমিতে ২০৩-১৪ অর্থবছরে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে সৃজিত বাপার জুম বনায়ন বরাদ্দে অংশীদার নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। বনায়ন বরাদ্দে এলাকায় মাইকিং করে ফরম বিতরণ ও বাচাই কমিটির সদস্যদের উপস্থিতিতে অংশীদার চুড়ান্ত করার নিয়ম থাকলেও এখানে তা মানা হয়নি মোটেও। বনায়ন বরাদ্দে টাকা নেওয়ার কোন বিধান না থাকলেও বিশ্ব ব্যাংক প্রতিনিধি, বিভাগীয় বন কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন স্তরে টাকা দেওয়ার অজুহাতে ২০ হাজার টাকা হারে প্রতি অংশীদারদের কাছ থেকে প্রায় ২৫ লাখ টাকা উত্তোলণ করে অত্যন্ত গোপনে রাতে আধাঁরে ১২৬ জন অংশীদার নিয়োগ তালিকা চুড়ান্ত করা হয়েছে।

খোদ ফুলছড়ি সহকারী বন সংরক্ষক,রেঞ্জ কর্মকর্তা, বনবিট কর্মকর্তা ও বিশ্ব ব্যাংক প্রতিনিধি এবং স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধি বিএনপি নেতা মিলে এই বিশাল অংকের টাকা উত্তোলণ করলেও বিশ্ব ব্যাংক প্রতিনিধি তার সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন। এ ঘটনা নিয়ে পুরো ফুলছড়িসহ আশপাশ এলাকায় তোলপাড় শুরু হয়েছে।

দুর্নীতি আর বনায়ন বরাদ্দে অনিয়মের ব্যাপারে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও সচেতনমহল প্রতিবাদ করায় সহকারী বন সংরক্ষক (ফুলছড়ি) আসলাম মজুমদার গত ৯ এপ্রিল জনসম্মুখে বর্তমান সরকার ও স্থানীয় এমপিদের ব্যাপারে কটুক্তি করার ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি ইতোমধ্যে তদন্ত রিপোর্টও দাখিল করেছেন বলে জানা গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব রোধে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের ফূলছড়িরেঞ্জাধীন নাপিতখালী ও ফুলছড়ি বিটের ৫০হেক্টর বনভুমিতে “বাপার জুম” বনায়ন সৃজন করা হচ্ছে। বনায়ন বরাদ্দের জন্য সংশ্লিষ্ট এলাকা গুলোতে মাইকিং করে জনগণের মাঝে বিনামুল্যে আবেদন ফরম বিতরণ ও বাচাই কমিটির মাধ্যমে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে ফুলছড়ি বিটে ৬৩ জন ও নাপিতখালী বিটে ৬৩ জন অংশীদার চুড়ান্তের নিয়ম রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সুত্র জানান, অংশীদার বাচাই কমিটিতে রয়েছে, বিশ্ব ব্যাংক প্রতিনিধি হয়রত আলী সেলিম (সিএমও-কনসালটেন্ট,সিআরপিএআরপি-বিএফডি) , সহকারী বন সংরক্ষক (ফুলছড়ি)  আসলাম মজুমদার, রেজ্ঞ কর্মকর্তা ভুপেষ চন্দ্র মুর্খাজী, ফুলছড়ি বনবিট কর্মকর্তা মোশারফ হোসেন, নাপিতখালী বনবিট কর্মকর্তা প্রাণেশ চন্দ্র, স্থানীয় চেয়ারম্যান আবদুল কাদের মাষ্টার, স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ( বিএনপিনেতা ও ওষুধ কোম্পানী এমআর) মনজুর আলমসহ আরো কয়েকজন।

স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, সৃজিত এসব বাপার জুম বনায়ন স্থানীয় লোকজনকে অংশীদারিত্বে ভিত্তিতে বরাদ্দের কথা থাকলেও এখানে তা মানা হয়নি। প্রকাশ্যে মাইকিং কিংবা ফরমও বিতরণ করা হয়নি। ১২৬ জন অংশীদার বাচাইয়ে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি করা হয়েছে।

কয়েকজন অংশীদার বলেন, তারা জনপ্রতি একটি বনায়নের জন্য (১ একর) ২০ হাজার টাকা করে নগদে দিয়েছেন। এ হারে প্রায় ২৫ লাখ টাকা অবৈধ ভাবে উত্তোলণ করেছেন কর্মকর্তারা। আর এই সমুদয় টাকা বিশ্ব ব্যাংক প্রতিনিধি মোঃ হয়রত আলী সেলিম, বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (উত্তর) নুর-ই- আলমসহ বিভিন্ন স্তরে ভাগাভাগির করে দেওয়ার কথা বলে অত্যন্ত সুকৌশলে আদায় করেছেন ফুলছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা ভুপেষ চন্দ্র মুখ্যার্জী, বনবিট কর্মকর্তা মোশারফ হোসেন, নাতিখালী বনবিট কর্মকর্তা প্রাণেশ চন্দ্র আদায় করেছেন।

এদিকে,কৌশলে টাকা আদায়ের মাধ্যমে বনায়ন বরাদ্দে অংশীদার বাচাই চুড়ান্ত করার জন্য গত ৯ এপ্রিল ফুলছড়ি এসিএফ পাহাড়ে সভা হলেও সেখানে ঘটে লংকা কান্ড। ওই বৈঠকে কয়েকজন আওয়ামীলীগ কর্মীকে বনায়ন বরাদ্দ দেওয়ার জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল ও চকরিয়ার সংসদ সদস্য হাজী ইলিয়াছের মৌখিত সুপারিশের কথা জানালে ফুলছড়ি সহকারী বন সংরক্ষক আসলাম মজুমদার বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকারের বিরুদ্ধে কটাক্ত ও সংসদ সদস্যদেরকে “বিকাশ এমপি” বলে জনসম্মুখে হেয়পতিপন্ন করে।

এ ঘটনার পর ওই স্থানে হৈচৈ লেগে যায় এবং তাৎক্ষনিক এলাকায় নিন্দার ঝড় উঠে। খবরটি উপর মহলে চলে যাওয়া পর জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি একেএম আহম্মদ হোসেন এর নির্দেশে গঠন করা হয় একটি তদন্ত কমিটি। কক্সবাজার সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ডাঃ আবদুল কুদ্দুচ মাখন ও ইসলামপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ফরিদুল আজিম দাদাকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদনের নির্দেশ দিলে তারা ১০ এপ্রিল তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। ওই প্রতিবেদনে সরকারের বিরুদ্ধে কটাক্ত ও সংসদ সদস্যদের“ বিকাশ এমপি” বলে জনসম্মখে হেয় প্রতিপন্ন করা এবং দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও করেন জেলা আওয়ামী লীগ ভারপ্রাপ্ত সভাপতির কাছে।

তদন্ত কমিটি প্রধান ডাঃ আবদুল কুদ্দুচ মাখন ও সদস্য ইসলামপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ফরিদুল আজিম দাদা উক্ত তদন্ত রিপোর্ট দাখিলের সত্যতা নিশ্চিত করেন।

অংশীদার চুড়ান্ত কমিটির সহ-সভাপতি ও ইসলামপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মাষ্টার আবদুল কাদের মাষ্টার জানান, বনায়ন বরাদ্দে অংশীদার তালিকা বাচাই এবং চুড়ান্তে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্র্নীতি করায় আমি ফরম গুলোতে স্বাক্ষর করিনি। স্বচ্ছ ভাবে অংশীদার নিয়াগের ব্যাপারে আমি স্বোচ্চার।

সিআরপিএআরপি-বিএফডির সিএমও-কনসালটেন্ট ও বিশ্ব ব্যাংক প্রতিনিধি মোঃ হয়রত আলী সেলিম জানান, বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে সৃজিত বাপারজুম বনায়ন স্থানীয় অংশীদারদের নিকট বরাদ্দে কোন ধরনের টাকা নেওয়ার নিয়ম নেই।

অবৈধ ভাবে টাকা আদায়ের ব্যাপারে তার সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করে তিনি আরও বলেন, অংশীদার কাছ থেকে টাকা আদায়ের বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে এবং প্রমাণ মিললে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।