যুবলীগ নেতা মিল্কি হত্যা : অভিযুক্ত ১১, বাদ পড়ছেন একাধিক আসামি

4_65903বিডি রিপোর্ট 24 ডটকম : দীর্ঘ ৯ মাস তদন্ত শেষে যুবলীগ নেতা রিয়াজুল হক খান মিল্কি হত্যাকান্ডের অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দিচ্ছে তদন্তকারী সংস্থা র‌্যাব। ২০ এপ্রিল রোববার আদালতে চার্জশিট দাখিলের দিন ধার্য করা হয়েছে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ডের ঘটনায় প্রাথমিকভাবে ১১ জনকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। হত্যাকান্ডের ঘটনায় এসএম জাহিদ সিদ্দিকী ওরফে কিলার তারেক, সাখাওয়াত হোসেন চঞ্চল ও রফিকুল ইসলাম রফিকসহ অন্যরা কীভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন, তার চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে এসেছে র‌্যাবের তদন্তে। তবে হত্যাকান্ডের পর নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় দায়ের করা এজাহারভুক্তদের মধ্যে যুবলীগ নেতা আরিফ ও টিপু অভিযুক্তদের তালিকা থেকে বাদ পড়ছেন বলে জানা গেছে। র‌্যাবের চার্জশিটের ভূমিকায় বলা হয়েছে, এলাকায় রাজনৈতিক আধিপত্য, সাংগঠনিক পদ দখল, টেন্ডারবাজিতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে তারেক যুবলীগ নেতা রিয়াজুল হক খান মিল্কিকে হত্যার পরিকল্পনা করে। ২৯ জুলাই মঙ্গলবার মধ্য রাতে গুলশানের শপার্স ওয়ার্ল্ডের সামনে ফিল্মি স্টাইলে যুবলীগ নেতা মিল্কিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই বিপণিবিতানের ক্লোজসার্কিট ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও দেখে একই সংগঠনের নেতা এইচএম জাহিদ সিদ্দিক তারেককে হত্যাকারী হিসেবে চিহ্নিত করে র‌্যাব। হত্যাকান্ডের ওই দৃশ্য দেখে অাঁতকে উঠেছিল মানুষ। ঘটনার দুই দিন পর তারেক ও তার গাড়ির চালক শাহ আলম র‌্যাবের কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। গত বছর ১ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে র‌্যাব মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে।

র‌্যাব-১ এর অধিনায়ক কিসমৎ হায়াৎ আলোকিত বাংলাদেশকে জানান, প্রাথমিকভাবে তদন্ত কার্যক্রম শেষ হয়েছে। হত্যাকান্ডের কারণ উদ্ঘাটন করেছে র‌্যাব। এখন পলাতক আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, আলোচিত যুবলীগ নেতা মিল্কি হত্যাকান্ডের রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। মামলার চার্জশিটও প্রাথমিকভাবে তৈরি করেছেন র‌্যাব কর্মকর্তারা। এখন কিছু যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। ২০ এপ্রিল আদালতে চাজর্শিট দাখিলের দিন ধার্য করা হয়েছে। তারেক, চঞ্চল, রফিক ও লোপাসহ হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত ১১ জনকে প্রাথমিকভাবে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। চার্জশিটে আসামি হিসেবে আরও থাকছেন আমিনুল ইসলাম হাবিব, আমিনুলের খালাতো ভাই আরিফ, সোহেল মাহমুদ, যুবলীগের কেন্দ্রীয় ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক রফিকুল ইসলামের গাড়িচালক চুন্নু মিয়া, দেহরক্ষী ইব্রাহিম, চঞ্চলের দেহরক্ষী শহিদুল ইসলাম ও গাড়িচালক জাহাঙ্গীর মন্ডল।

তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, মিল্কি হত্যাকান্ডে কিলার তারেক সিলভার রঙের একটি রিভলবার এবং আমিনুল একটি পিস্তল ব্যবহার করে। হত্যাকান্ডের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সিটিসেলের পাঁচটি নতুন সিম কেনা হয়। এ সিম ব্যবহার করে খুনিরা পরস্পরের সঙ্গে কথা বলেছেন। গ্রেফতার হওয়া আসামিদের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি ও র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকান্ডের অন্য আসামিদের সম্পৃক্ততা বেরিয়ে আসে। আসামিদের দেয়া ভাষ্যমতে, এসএম জাহিদ সিদ্দিকী তারেক যুবলীগ নেতা মিল্কি হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী। মিল্কির গাড়ির চালক সাগরের স্ত্রী লোপার সঙ্গে পরকীয়ার সম্পর্কের সুবাদে তারেক মিল্কির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে। তারেক চঞ্চল, টিপু ও রফিকের সঙ্গে ঘটনার রাতে একান্ত গোপন বৈঠকে মিল্কি হত্যার নীল নকশা তৈরি করা হয়। তারেক নিজ হাতে মিল্কির মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে।

খুনিদের যোগসাজশ : র‌্যাবের তদন্তে তারেক ছাড়াও অন্য ক্যাডারদের যোগাসাজশের বিষয়টি বেরিয়ে এসেছে। হত্যাকান্ডের ঘটনার রাতেই চঞ্চলের অফিসে তারেকের সঙ্গে অন্যদের গোপন বৈঠক হয়। হত্যাকান্ডের চঞ্চল তার ক্যাডার বাহিনী ব্যবহার করে-যাদের মধ্যে পিচ্চি শহীদুল, সোহেল মাহমুদ, হানিফ, জাহাঙ্গীর, পলাশ, দেবাশীষ, জাকির ও দেলোয়ারের নাম জানতে পেরেছে র‌্যাব। হত্যাকান্ডের সময় নিজ দলের সদস্য আমিনুলের গুলিতে তারেক আহত হলে চঞ্চল তাকে চিকিৎসা দেয়ার জন্য উত্তরার ফরচুন হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরের দিন ভোরে তারেক ও জাহাঙ্গীর গ্রেফতার হলে চঞ্চল দুই-তিন দিন আত্মগোপনে থেকে প্রথমে সীমান্ত দিয়ে ভারত হয়ে আমেরিকায় চলে যায়। বর্তমানে সেখানেই অবস্থান করছে। হত্যাকা-ের পরামর্শক হিসেবে কাজ করে রফিকুল ইসলাম। হত্যাকান্ডের দিন তারেকের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং তার ক্যাডার বাহিনীর সদস্য ইব্রাহিম হত্যাকান্ডে অংশ নেয়ার নির্দেশ দেন। আমিনুল ইসলাম হাবিব হত্যাকান্ডে সরাসরি অংশ নেন। গুলি করার পর মিল্কির নিথর দেহ মাটিতে পরে গেলে হাবিব আরও তিনটি গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে। এ সময় এলোপাতাড়ি একটি গুলি তারেকের শরীরে বিদ্ধ হলে ভয়ে সে পালিয়ে যায়। চঞ্চলের ক্যাডার ও দেহরক্ষী সোহেল মিল্কির গতিবিধির ওপর নজর রাখে। হত্যাকান্ডের পর চঞ্চলের পরামর্শ ও সহযোগিতায় সোহেল বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যায়। মিল্কির গাড়িচালক সাগরের স্ত্রী ফাহিমা ইসলাম লোপা তারেকের সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। হত্যাকান্ডের বেশ কিছুদিন আগে থেকেই তারেকের সঙ্গে টেলিফোনে ও সাক্ষাৎ করে মিল্কিকে হত্যার জন্য প্ররোচিত করে। ঘটনার দিন লোপা সাগরের কাছে মাঝে মধ্যে ফোন করে মিল্কির অবস্থান নিশ্চিত করে। টেলিফোনে ওই তথ্য তারেককে সরবারাহ করে মিল্কির অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত করা হয়।

হত্যাকান্ডের পর ১১ জনের নাম উল্লেখ করে থানায় মামলা করা হয়। এদের মধ্যে সাতজনকে র‌্যাব গ্রেফতার করে। এজাহারভুক্ত বাকি চার আসামি পলাতক রয়েছে। হত্যাকান্ডের পরিকল্পনাকারী ১৬ জন, বাস্তবায়নকারী ছয়জন এবং হত্যাপরবর্তী সময়ে জড়িয়ে যায় আরও ১৫ জন। দীর্ঘ তদন্ত চালিয়ে ১১ জনের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে র‌্যাব জানিয়েছে। এজাহারে নাম উল্লেখ থাকাদের মধ্যে গ্রেফতার হয়েছেন তুহিন রহমান ফাহিম, সৈয়দ মোস্তফা ওরফে রুমি, রাশেদ মাহমুদ, নুরুজ্জামান ওরফে সাইদুল ইসলাম, সুজন হাওলাদার, ডা. দেওয়ান মোঃ ফরিদউদ্দৌলা পাপ্পু ও মাহবুবুল হক হিরক। এজাহারভুক্ত পলাতক আসামি জাহিদুল ইসলাম টিপু, ওয়াহিদুল আলম আরিফ এবং সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে গ্রেফতার হওয়া শরীফ উদ্দিন চৌধুরী পাপ্পুর বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ না থাকায় তাদের চার্জশিট থেকে বাদ দেয়া হতে পারে বলে জানা গেছে।