হাইওয়ে পুলিশ : ঘাটে ঘাটে চাঁদাবাজি শিগগিরই আন্দোলনে নামছেন ড্রাইভাররা

trafique - Copyবিডি রিপোর্ট 24 ডটকম : রাত তখন ২টা। মানিকগঞ্জের তরা ব্রিজ। হাইওয়ে পুলিশের সঙ্কেতে থামানো হলো ট্রাক। হাত বাড়ালেন পুলিশ। ১০০ টাকা দিতেই ফুঁসে উঠলেন তিনি। বললেন, ৫০০ লাগবে। বললাম, স্যার, গাড়ির সব কাগজপত্র ঠিক আছে। একবার দেখে নেন। তিনি বললেন, কাগজ দেখার সময় নাই, টাকা দিয়ে চলে যা।

শুক্রবার বেলা ১১টায় রাজধানীর তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ডের বটতলায় বসে  এসব জানান ভুক্তভোগী ট্রাকচালক মাসুদুল আলম। তিনি জানান, অবশেষে ২০০ টাকায় রফা করে ওই পুলিশের কাছ থেকে ছাড়া পান। মাসুদ আরও বলেন, দেশের বেশিরভাগ মহাসড়কে প্রতি ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটারে পুলিশকে ১০০ থেকে ২০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। টাকা না দিলে বিভিন্ন মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়া হয়। বাধ্য হয়ে টাকা দিতে হচ্ছে। দেশের উত্তর, দক্ষিণ কিংবা পূর্ব-পশ্চিম যেদিকেই যান, টাকা ছাড়া গাড়ি চলে না। রাতবিরাতে প্রতি ঘাটেই চাঁদা দিতে হয়; কোনো ছাড় নেই। গাড়ির কাগজপত্র চেকিং এবং গাড়ি লোড না আনলোড, সেটি দেখারও সময় নেই পুলিশের। দেশব্যাপী সড়ক-মহাসড়কে খালি ও মালবোঝাই ট্রাক আটকে বেপরোয়া চাঁদাবাজিতে মেতেছে পুলিশ। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে কমপক্ষে ১৫টি পয়েন্টে ১৫ হাজার থেকে ২ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়। শুধু চট্টগ্রাম শহরের ভেতরই সাত থেকে আটটি পয়েন্ট রয়েছে, যেখান থেকে প্রতিদিনই প্রকাশ্যে চাঁদা নেয়া হচ্ছে। এছাড়া ঢাকা থেকে উত্তরাঞ্চলে যেতে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা ও দক্ষিণাঞ্চলে যেতে প্রায় একই পরিমাণ চাঁদা গুনতে হয়। অভিযোগ আছে, হাইওয়ে ও টহল পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারাও এভাবে নিয়মিত চাঁদা তুলছেন।

যাত্রাবাড়ীর ট্রাকচালক মোহন মিয়া জানান, ১৬ মার্চ রাতে তিনি ট্রাক নিয়ে চট্টগ্রামে রওনা হন। প্রথমেই যাত্রাবাড়ীর শহীদ ফারুক সড়ক রোডে টহল পুলিশ গাড়িটি আটকায়। পরে ৩০ টাকা দিলে গাড়ি ছেড়ে দেয়। শনির আখড়া ব্রিজের কাছে যেতে পুলিশকে দিতে হয় ১০০ টাকা, রায়েরবাগ মেডিকেলের সামনে আবার ১০০, কাচপুর ব্রিজের কাছে ১০০, মেঘনা ব্রিজে ওঠার আগে ১০০, দাউদকান্দি পাখির মোড়ে ১০০ টাকা দিতে হয়েছে। এভাবে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে কমপক্ষে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা চাঁদা দেন তিনি। সার্জেন্ট, হাইওয়ে পুলিশ, হাইওয়ে টহল পুলিশসহ অনেককেই এখন চাঁদা দিতে হয়। টাকা না দিলে সারা রাত দাঁড় করিয়ে রাখে। তার পরও না দিলে মামলা ঠুকে দেয়। হয়রানি থেকে বাঁচতে তাই টাকা দিতে হয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যেতে প্রতিটি মহাসড়কে পুলিশের কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০টি চাঁদা তোলার ঘাট (পয়েন্ট) রয়েছে। প্রতি রাতেই এসব ঘাট থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদা তুলছে পুলিশ। ঘাটভেদে চাঁদার পরিমাণ ৫০ থেকে ৫০০ টাকা। চাঁদা না দিলে চালককে অকথ্য ভাষায় গালাগাল ও মারধর করা হয়। কখনও কখনও তারা গাড়ির ব্যাটারি খুলে নেয়, আবার কখনও গাড়ির গ্লাস ও হেডলাইটে ভেঙে দেয় পুলিশ। সারা রাত দাঁড় করিয়ে রেখে সকালে মামলা দিয়ে ছেড়ে দেয়। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান মহাসড়ক ঢাকা-আরিচা সড়কে প্রতিদিন বাস-ট্রাকসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরির কয়েক হাজার যানবাহন যাতায়াত করে। পরিবহনে চাঁদাবাজির অন্যতম। রাজনৈতিক ও পরিবহন নেতা এবং পুলিশের যোগসাজশে প্রতিদিন গাড়িপ্রতি কমপক্ষে ১ হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে। এর একটি ঘাটেই প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকা চাঁদা উঠছে। প্রকাশ্যে আদায় করা হচ্ছে চাঁদা। গাড়ির চালকরাও নিয়ম মেনেই তা দিয়ে চলেছেন।

তেজগাঁওয়ে মা এন্টারপ্রাইজের মালিক আবুল কাশেম বলেন, ঢাকা-আরিচা রোডে ট্রাক চলাচলে প্রতিবার যাতায়াতে বড় বাস ও ট্রাকপ্রতি ১ থেকে দেড় হাজার টাকা চাঁদা গুনতে হয়। ট্রাকটি লোড থাক আর না-ই থাক, এ চাঁদা দিতে হয় পুলিশকে। এজন্যই ট্রাকের ভাড়া বেড়ে যায়। ধোলাইখালের ট্রাকচালক আবু সালেহ বলেন, রাতে আগে মহাসড়কে ট্রাক ডাকাতি হতো। এখন পেশাদার ডাকাতরা ডাকাতি না করলেও পুলিশ ট্রাক আটকে রেখে গণচাঁদাবাজি শুরু করেছে। ডাকাতরা মাঝে মধ্যে এক-দুটি ট্রাক ছিনিয়ে নিত, আর পুলিশ এখন প্রতিটি ট্রাক থেকে নিয়মিত চাঁদাবাজি করছে। আরেক ট্রাকচালক বাবুল হোসেন বলেন, পরিবহন চাঁদাবাজির সঙ্গে পুলিশ ছাড়াও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী জড়িত। সরকারের আন্তরিকতা থাকলে চাঁদাবাজির হাত থেকে পরিবহন সেক্টরকে বাঁচানো সম্ভব। অত্যন্ত কঠোরভাবে তা বন্ধের ব্যবস্থা করতে হবে।

মহাসড়কে চাঁদাবাজির শতাধিক পয়েন্ট : সারা দেশের মহাসড়কে চাঁদাবাজির শতাধিক ঘাট বা পয়েন্ট রয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক ও বাস-ট্রাকের বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের যোগসাজশে হাইওয়ে পুলিশের অসাধু কর্মকর্তারা এসব ঘাট নিয়ন্ত্রণ করছেন। এসব পয়েন্টের মধ্যে উত্তরাঞ্চলে যেতে ভয়ঙ্কর স্পটগুলো হলো গাজীপুরের জয়দেবপুর চৌরাস্তা, টাঙ্গাইল বাইপাস মোড়, যমুনা ব্রিজের ওপার, শেরপুর মোড়, বগুড়া মেডিকেলের সামনে, গোবিন্দগঞ্জ, সৈয়দপুর মোড়, দিনাজপুর ও পঞ্চগড় মোড় এবং বাংলাবান্ধা। দক্ষিণাঞ্চল যেতে স্পটগুলো হচ্ছে গাবতলী, টেকনিক্যাল মোড়, মানিকগঞ্জ তরা ব্রিজ, রাজবাড়ীর থানখানাপুর, ফরিদপুরের ভাঙ্গা মোড়, মাগুরার ওয়াপদা, যশোরে বাইনার মোড়, মাদারীপুরে মুশতাপুর, বরিশালে দহরিকা ব্রিজ ও বরিশালের বাসস্ট্যান্ড মোড় অন্যতম। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে কাচপুর ব্রিজ, শনির আখড়া, পোস্তগোলা, সাইনবোর্ড, চিটাগং রোড, কুমিল্লার দাউদকান্দি, ইলিয়টগঞ্জ, বিশ্বরোড রেলগেট, চৌদ্দগ্রাম, ফেনীর মহিপাল, চট্টগ্রামের মীরেরসরাই অন্যতম। চট্টগ্রাম শহরের ভেতর সিটি গেট, সাগরিকা মোড়, বড়পুল, নিমতলা বিশ্বরোড, ক্রসিং মোড়, এয়ারপোর্ট রোড, জিইসি মোড় চাঁদাবাজির অন্যতম স্পট। এসব পয়েন্টেই ৫০ থেকে ২০০ টাকা গুনতে হয় চালকদের। কোনো কোনো ঘাটে এর চেয়েও বেশি দিতে হয়। একাধিক ট্রাক শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যে রাতে পুলিশের আয় কম থাকে, সে রাতে ১০০ টাকার চাঁদা ৫০০-তে গিয়ে দাঁড়ায়। আবার কখনও কখনও ৫০ টাকা দিয়েও পার পাওয়া যায়। তবে চাঁদা তাদের দিতেই হয়।

বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান ড্রাইভার্স ইউনিয়নের সভাপতি হুমায়ুন কবীর  বলেন, মহাসড়কে পুলিশের চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছি। শিগগিরই সব সমিতি এক হয়ে চূড়ান্ত আন্দোলনের ডাক দেয়া হবে। বিআরটিএর কিছু অসাধু কর্মকর্তা একই চেসিস ও ইঞ্জিন নম্বরে একাধিক গাড়ি নিবন্ধিত করছে। এ দুর্বলতার সুযোগে পুলিশ মামলার ভয় দেখিয়ে চাঁদা নিচ্ছে। মামলা দিলেই খরচ ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা। তাই পুলিশকে চাঁদা দিয়েই চলছি আমরা। অথচ সরকারের রাজস্ব খাতে তিন বছরের জন্য গাড়িপ্রতি ৮০ থেকে ৮৫ হাজার টাকা ভ্যাট-ট্যাক্স দিচ্ছি। তারপরও ঘাটে ঘাটে চাঁদা দিতে হচ্ছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বলেন, পরিবহন সেক্টরে বিপুল পরিমাণ চাঁদাবাজি হচ্ছে। অথচ এর কোনো প্রমাণ নেই। চাঁদা ছাড়া রাস্তায় গাড়ি চলে না। এভাবে চাঁদাবাজি চলতে থাকলে পরিবহন সেক্টরে বিনিয়োগ কমে ব্যবসায় ধস নামবে।

হাইওয়ে পূর্ব বিভাগের (কুমিল্লা) পুলিশ সুপার রেজাউল করীম শুক্রবার  বলেন, হাইওয়ে পুলিশের কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেলে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেয়া হবে। রাতের মহাসড়কে হাইওয়ে পুলিশ ছাড়াও স্থানীয় থানা, ফাঁড়ি ও টহল পুলিশ কাজ করে থাকে। ঢালাওভাবে হাইওয়ে পুলিশকে দোষ দেয়া ঠিক হচ্ছে না। তবে ভুক্তভোগীদের লিখিত অভিযোগ পেলে পুলিশের দোষী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। হাইওয়ে বগুড়া অঞ্চলের পুলিশ সুপার ইসরাইল হাওলাদার বলেন, পুলিশের প্রতিটি কাজেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়। দায়িত্বে অবহেলার জন্য অনেকের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেয়া হয়। পুলিশের কারও বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ থাকলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।