নাব্যতা হারিয়ে ফেলছে কক্সবাজার জেলার প্রধান তিন নদী

coxএম.শাহজাহানচৌধুরী শাহীন, কক্সবাজার : কক্সবাজার জেলার প্রধান ৩টি নদী অনেকটাই এখন অস্থিত্ব হারাতে বসেছে। হারাতে বসেছে নদীগুলোর নাব্যতা। নিধন হচ্ছে বনভুমি। অবাধে কর্তন হচ্ছে এলাকার বনাঞ্চলের কাঠ। বিরুপ প্রভাব পড়ছে পরিবেশের ওপর। খর¯্রােতা নদীতে ধু-ধু বালুচর আর বনভুমি পরিনিত হচ্ছে আবাদি জমিতে। সংশয় বাড়ছে আগামী প্রজন্মের আবাস নিয়ে।

কক্সবাজার জেলার প্রধান প্রধান নদীর হচ্ছে বাঁকখালী, ঈদগাঁও ফুলেশ্বরী ও মাতামুহুরী নদী। নদী গুলো উৎপত্তিস্থলের বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য না থাকলেও ভারত ও মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এই তিনটি নদী। ”খর¯্রােতা বাঁকখালী নদীর কিছু অংশ জেলার কক্সবাজার সদর, রামু ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িকে ঘিরে রয়েছে। পার্বত্য এলাকা হতে সৃষ্টি হয়ে আসা প্রমত্তা মাতামুহুরী ও ঈদগাঁও ফুলেশ্বরী নদীদ্বয় কক্সবাজার জেলা চকরিয়া ,কক্সবাজার সদর, রামু ও বান্দরবানের লামা ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

এ নদী গুলো সরাসরি বঙ্গোপসাগরে সাথে মিলিত হয়েছে। কক্সবাজার জেলার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত এই তিনটি নদীই পলি জমে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ফলে গভীরতা ও প্রশস্থতা কমার পাশাপাশি কমেছে এর খর¯্রােতা। এতে পানিশূন্য হয়ে নদীগুলো হারিয়ে ফেলেছে নাব্যতা। একসময়ের প্রমত্তা বাঁকখালী, ঈদগাঁও ফুলেশ্বরী ও মাতামুহুরী নদী এখন মরা খালে পরিণত হযেছে। কোথাও কোথাও এ নদীগুলোর বুকজুড়ে দেখা দিয়েছে শুধু ধু-ধু বালুচর। ¯্রােতহীনা নদীগুলোর পাশেই অগভীর নলকূপ স্থাপন করে এখন চাষ হচ্ছে আবাদী ফসল। অথচ এক সময় নদীগুলো দিয়ে চলাচল করত বড় বড় নৌযান। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এ অঞ্চলের সাথে যোগাযোগ ও পণ্য আনা নেওয়ার জন্য এ নদীগুলোই ছিলো একমাত্র উপায়। কালের বিবর্তনে নতুন প্রজন্মের কাছে এসব নদী এখন শুধু ইতিহাস।

ফুলেশ্বরী,মাতামুহুরী ও বাঁকখালী নদী ¯্রােতহীন হয়ে পড়ায় বর্ষায় নদী বুকে জমা হওয়া পলি অপসারিত হয় না। ফলে প্রতিবছর জেগে উঠছে ছোট বড় চর। এতে নদীগুলো হারিয়ে ফেলেছে নাব্যতা। নদীর দু’পাড়ে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করে নদীগুলোর পাড় দখল করা হচ্ছে। এতেও নদীর প্রস্থতা হ্রাস পাচ্ছে। পূণরায় খাল খনন কর্মসূচীই নদীগুলো ফিরিয়ে দিতে পারে পূর্বের অবস্থায় এরকম ধারনা পরিবেশ বিশ্লেষকদের।

এক প্রশ্নের উত্তরে, কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড  নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, দেশের নদীগুলোকে রক্ষার্থে খাল খনন কর্মসূচী গ্রহনে সরকার সচেষ্ট রয়েছে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, বাংলাদেশে দুইভাবে নদী বিপর্যয় হয়। অভ্যন্তরীণ ও বহিদেশীয়। অভ্যন্তরীণ কারণগুলো হলো- নদীর বুক ও পাহাড়ে জমি দখল, চাষাবাদ, স্থাপনা নির্মাণ, পাড় কাটা, পাথর ও বালু আহরণ, বাঁক কেটে গতিপথ পরিবর্তন, সেচ খাল তৈরি, পানি সরিয়ে নেয়া, কৃষি ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের নামে বোল্ডার নির্মাণ, বিরতিহীন পাড় বাঁধাই, ঢাকা ও হবিগঞ্জের মতো শহর বা জনপদ, বিরতিহীন বাঁধ নির্মাণ, নদীর উপর বাঁধ-সেতু-জলবিদ্যুৎ প্রকল্প জলাধার বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ, নদীর পানিতে বোল্ডার ও পাথর নিক্ষেপ, গাছ-গাছালির ফাঁদ স্থাপন, পানিতে অতিরিক্ত কচুরিপানা, উন্নয়নের নামে পাড়ের গাছ কাটা, নদী পাড়ে নৌযান ভাঙ্গা ও নির্মাণ সামগ্রীর স্তূপ, নদীর পানিতে শহুরে ও গ্রামীণ শিল্প বর্জ্য, রাসায়নিক সার-কীটনাশক নিক্ষেপ ও মিশ্রণ ইত্যাদি।

আর বহিন্দেশীয় বিষয়গুলো হলো- বাংলাদেশে প্রবেশকারী প্রায় সবগুলো নদীরই ভারতীয় ও মিয়ানমার অংশে হওয়ায় সেসব দেশ নদীর উপর বৃহৎ স্থাপনা বাঁধ, সেচ বা পানি বিদ্যুৎ প্রকল্প। এই সবগুলো নদীর এখন বিপর্যন্ত অবস্থা। পানি শুকিয়ে যাওয়ার পর চাষাবাদের কারণে নদীর অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

সূত্রে আরও জানা যায়, নদীসমূহের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। সবকটি নদীই দীর্ঘমেয়াদি, অবারিত ও ক্রমবর্ধমান অবক্ষয়ের শিকার। নদীগুলোর পানির পরিমাণ ও প্রবাহ হ্রাস, নদীর কলেবর সংকোচন, তলা ভরাট, পাড় ভাঙন, দিক পরিবর্তন, নদীর বুক জুড়ে ব্যাপক চর সৃষ্টি, বর্ষায় প্লাবন ও শীতে খরা, নদী সংশ্লিষ্ট খাল-বিল-হাওর পানির পরিমাণ হ্রাস বর্তমানে নদী সংকটের সাধারণ রূপ।

এই তিনটি নদীর দুই পাশে বেশীর ভাগ স্থান সবুজের সমারোহ। নদী গুলোর দুই পাড়ে স্থায়ীভাবে বসতবাড়ি গড়ে তুলেছে মানুষ। নদীর পাশে গড়ে ওঠা সবুজ গ্রামের দুই পাশ দিয়ে পানির ¯্রােতে চকচকে টিন আর খড়ের ঘর।  নদীর পাশে স্থাপনা আর মানুষের বসতি কি কেউ চায়? কেউ চিন্তা করেননি নদী কেন শুকিয়ে গেল? পানির অভাবে নদীর বুকে বসতি গড়তে থাকলে আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ কি হবে ? জীব বৈচিত্রের কি হবে?

জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের মানচিত্রে। বদলে যাচ্ছে দৃশ্যপট। এরই মধ্যেই এসব নদীর সাথে বন্ধ হয়ে গেছে মূল নদীর সংযোগ। অনেক নদীই এখন কৃষি জমিতে পানি নেয়ার নালার মতো দেখতে। নদী ভাঙনের কবলে পড়ে নদীপাড়ের অনেকেই আজ বাড়ি হারা, জমি হারা। তবুও নদীর মতো মাতৃ¯েœহে আগলে থাকতে চায় এ অঞ্চলে সাধারণ মানুষেরা।

স্থানীয়দের ধারণা, নদী বিলীন হলে পরিবেশ ও জলবায়ুর বিপর্যয় ঘটবে। তাই পরিবেশ ও জলবায়ুর পরিবর্তনের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষন একান্ত প্রয়োজন বলে মনে করেন এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ।