ভারত-শ্রীলঙ্কা মহারণ আজ

18064_f2বাংলাদেশের মাটিতে ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে বড় আসরটির পর্দা নামছে আজ। সংশয়-শঙ্কা ছাপিয়ে নানা রঙের আলপনা আঁকা বর্ণিল এক আসরের মিলন মেলা ভাঙছে আজ। তিন সপ্তাহের লড়াই শেষে শিরোপা হাতে দেশে ফিরবে দু’টি দল। তাদের নামের পাশে শোভা পাবে ‘চ্যাম্পিয়ন’। একটি দল ছেলেদের, অপরটি মেয়েদের। ছেলেদের আসরটিই মূল আকর্ষণ। তবে আগে হবে মেয়েদের লড়াই। প্রতিপক্ষ দুই মেরুর দুই দল ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়া। গতবারও এ দু’দল ফাইনালে খেলেছে। ২০১২-তে শ্রীলঙ্কায় সেবার জিতেছিল অস্ট্রেলিয়ানরা। আয়োজক বাংলাদেশ ছাড়া অন্য সব দেশে আজ সাপ্তাহিক ছুটির দিন। ছেলেদের লড়াইয়ের দিকেই চোখ সবার। তাই ফাইনালের আয়োজনটাও এ দিনে। ছেলেদের ট্রফি জয়ের লড়াইয়ে মুখোমুখি প্রতিবেশী দুই দেশ- ভারত আর শ্রীলঙ্কা। আয়তন আর জনসংখ্যাতেই কেবল নয়, ক্রিকেটীয় অভিজ্ঞতাতেও দেশ দু’টির ফারাক অনেক। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ক্রিকেটের ২২ গজে কেউ কারে নাহি ছাড়ে সমানে সমান। আর ২০ ওভারের খেলায় পার্থক্য গড়া আরও কঠিন। সময়ের বিবর্তনে দু’দলের অবস্থান এখন অনেক কাছাকাছি। এ পর্যন্ত খেলা ফাইনালে পরস্পরের মোকাবিলায় ফলে ভারত ৯ বার আর শ্রীলঙ্কা ৮ বার জয়ী। আসরের সেরা দুটি দলও তারা। দুই গ্রুপের শীর্ষ দল হিসেবেই ফাইনালে খেলছে তারা। তবে ভারতকে এগিয়ে রাখতেই হবে অন্তত দু’টি দিকে। প্রথমত তারাই এ আসরের একমাত্র অপরাজিত দল। তা ছাড়া তারা ৫টি ম্যাচই খেলেছে এ মিরপুরের মাঠে। আর শ্রীলঙ্কা চট্টগ্রামে চারটি খেলার পর এ মাঠে প্রথম সেমিফাইনালে অংশ নেয়। তাদের সুুবিধা হলো তারা গত প্রায় দু’মাস ধরেই খেলছে ঢাকা আর চট্টগ্রাওেম। টেস্ট, ওয়ানডে সিরিজ ও এশিয়া কাপের পর টি-২০ বিশ্বকাপ। মাটি-মানুষ আর আলো-বাতাস সবই যেন চির চেনা। তবে মাঠের লড়াইয়ে এ সবই উহ্য। ব্যাটে-বলের সেরা যে শেষ হাসিটাও থাকবে তার। এখানেও কাগজে-কলমে শক্তির তারতম্যটা গৌণ। তবে কি নিয়তিই নিয়ামক? অস্বীকারের উপায় নেই। না হয়, সব অনুকূলে থাকার পরও বাংলাদেশ কেন হারবে আফগানিস্তান আর হংকংয়ের কাছে? ইংল্যান্ড কেন হারবে নেদারল্যান্ডসের কাছে? অনেক অধিনায়ক, বিশেষ করে বাংলাদেশের অধিনায়ক প্রায়ই খেলার আগের দিন বলে থাকেন, দিন যার ওয়ান ডে বা টি-২০তে ম্যাচটিও তার। ব্যাটে-বলের সুর আর ছন্দ নিখুঁত না হলে কাগজে-কলমের সব শক্তিই বৃথা।
ভারত আর শ্রীলঙ্কা বিশ্ব ক্রিকেটের দুই পরাশক্তি। বিশ্বকাপের আগে টি-২০ ফরমেটে সবার সেরা ছিল শ্রীলঙ্কা। তবে আসরের পারফরমেন্সে তাদের টপকে এক নম্বরে চলে এসেছে ভারত। লড়াইটা তাই শিরোপা জয়ের পাশাপাশি শীর্ষস্থান দখলেরও। ২০০৭ সালের ক্রিকেটের এ সংক্ষিপ্ততম অধ্যায়ের প্রথম বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়। আর সেবারই শিরোপা জিতে নেয় ভারত চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানকে হারিয়ে। সেই প্রথম সেই শেষ। ভারত আর ফাইনালে খেলওেত পারেনি। তবে শ্রীলঙ্কার দুঃখটা বেশি। তারা দু’বার ফাইনালে উঠেও কাপে হাত ছোঁয়াতে পারেনি। ২০০৯-এ ইংল্যান্ডের মাটিতে প্রথম ফাইনালে তারা হার মানে পাকিস্তানের কাছে। দ্বিতীয় দফা আরও মর্মবিদারক। ২০১২-তে আয়োজক ছিল তারা। অভিজ্ঞতা আর শক্তিতে এগিয়ে ছিল তারা। কিন্তু ওই যে, বিধির বিধান খণ্ডাতে পারেনি তারা। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ১৩৭ রানের পুঁজিও তাদের কাছে পাহাড়সম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্রথম দল হিসেবে তৃতীয়বার ফাইনালে খেলছে শ্রীলঙ্কা। ভারত জিতলে হবে প্রথম দু’বার শিরোপা জয়ের কৃতিত্ব। আর শ্রীলঙ্কা জিতলে টি-২০ বিশ্বকাপ পাবে পঞ্চম চ্যাম্পিয়ন। অপর চ্যাম্পিয়নরা হলো পাকিস্তান (২০০৯) ও ইংল্যান্ড (২০১০) ওয়েস্ট ইন্ডিজ (২০১২)। ভারত শ্রীলঙ্কা লড়াই মানেই অনেক হৃদয়ভাঙ্গার ইতিহাস। সেই ১৯৯৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ভারতের মাটিতে রানাতুঙ্গা-অরবিন্দ ডি সিলভার জয় দিয়ে উত্থান সিংহলীদের। তবে সর্বশেষ রক্তক্ষরণ লঙ্কানদেরই। ২০১১ সালের বিশ্বকাপ। সেবার ফাইনালের প্রতিপক্ষ তারা। বিস্ময় জাগানিয়া পারফরমেন্সে মহেন্দ্র সিং ধোনির দল জয় করে নেয় বিশ্বকাপ। সেটি ওয়ানডে ক্রিকেটের হলেও খেলোয়াড় প্রায় একই। তাই প্রতিশোধের আগুন কিছুটা হলেও থাকবে লঙ্কানদের গায়ে। শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটারদের আজ বাড়তি উদ্দীপক জয়াবর্ধনে-সাঙ্গাকারা। সাবেক এ দুই অধিনায়কের এটিই শেষ টি-২০ ম্যাচ। চলতি শতাব্দীতে শ্রীলঙ্কার অনেক জয়ের নায়ক এ মহান ক্রিকেটারকে স্মরণীয় উপহার হিসেবে বিশ্বকাপ তুলে দিতে চান ঘটনাচক্রে নেতৃত্ব পাওয়া লাসিথ মালিঙ্গা। তরেব কে কি চাইলো তা নিয়ে ভাবলে কি আর চলে? তাই ধোনির বাহিনী উজ্জীবিত অন্য মন্ত্রে। তারা জানেন- শেষ ভাল যার সব ভাল তার। সোয়াশ’ কোটি দেশবাসী উন্মুখ হয়ে আছে তাদের দিকে। শিরোপাটা তাদের চাই-ই। প্রতিটি খেলোয়াড়ের দেহের ভাষাও তাই বলে। মাঠের খেলায়ও তার প্রমাণ মেলে। ব্যাটে-বলে দারুণ ছন্দে তারা। টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কারটিও প্রায় কোহলির হাতে। রোহিত-রায়না, ধোনি-যুবরাজ কারও চেয়ে কেউ কম নন।  বোলারদের দুর্বলতাটাও যেন উবে গেছে। অশ্বিন-মিশ্র, সঙ্গে কুমার-মোহিত। জাদেজা-রায়না-যুবরাজ যেন বাড়তি। শ্রীলঙ্কার দুর্বলতা ধারাবাহিক পারফরমার নেই। তবে বোলরারা তাদের অসাধারণ। তারাই দলকে এগিয়ে এনেছেন এত দূর বললে বেশি বলা হবে না। মালিঙ্গা, অজান্তা, রঙ্গনা-মেন্ডিস-সেনানায়েকেদের ওপর তাই ভরসা অনেক। দিলশান, মাহেলা আর কুমারার মতো তিন দিকপাল এক দলে কমই ছিল এবার। তাদের অন্তত দু’জন ছন্দে থাকলে বিপদ যে কোন দলেরই। সব কিছু ছাপিয়ে আলাদা নজর থাকবে মালিঙ্গার বল আর কোহলির ব্যাটের দিকে তাতে সন্দেহ নেই কারও। তবে শেষ আরেকটি আশঙ্কাও আছে। তার নাম আবহাওয়া। পূর্বাভাস বলছে ঝড়ো হাওয়ার সঙ্গে বৃষ্টিরও সম্ভাবনা। টিকিট নিয়ে হাহাকার সর্বত্র। এক তাকে ধরাধরি চলছে, চলবে আজ দুপুর অব্দি। অনেকে আশ্বাসে আছেন পাবেন, অনেকে হতাশ। অনেকে পেয়েছেন তিনগুণ-চারগুণ বেশি অর্থে। তবুও প্রথ্যাশা শেষটা যেন ভাল হয়।
সম্ভাব্য একাদশ: ভারত: মহেন্দ্র সিং ধোনি, রোহিত শর্ম, বিরাট কোহলি, আজিঙ্কা রাহানে, যুবরাজ সিং, সুরেশ রায়না, রবিন্দ্র জাদেজা, রবিচন্দ্রন অশ্বিন, অমিত মিশ্র, ভবনেশ্বর কুমার ও মোহিত শর্মা।
শ্রীলঙ্কা: কুশল পেরেরা, তিলকারত্নে দিলশান, মাহেলা জয়াবর্ধনে, কুমার সাঙ্গাকারা, লাহিরু থিরিমান্নে, অ্যঞ্জেলো ম্যাথিউস, নুয়ান কুলাসেকারা, সচিত্রা সেনানায়েকে, লাসিথ মালিঙ্গা, রঙ্গনা হেরাথ ও থিসারা পেরেরা/সেক্কুগে প্রসন্ন।