অভিযোগ আমলে নিচ্ছে না ইসি

17758_f2বিডি রিপোর্ট 24 ডটকম : চতুর্থ উপজেলা নির্বাচন আয়োজন করেই দায় সেরেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কেন্দ্র দখল, প্রকাশ্যে সিল মারা, জাল ভোট, কারচুপি, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, খুন, ক্ষমতার মহড়া সহ সব অনিয়মই হয়েছে এ নির্বাচনে। পাঁচ ধাপের নির্বাচনে কমিশনে অভিযোগ এসেছে কয়েক হাজার। প্রার্থী, প্রশাসনের ও নির্বাচন কমিশনের কর্মীরা হামলা ও মারধরের শিকার হয়েছেন। এসব বিষয়ে কমিশনে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ এসেছে। কিন্তু এসব অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি কোন ব্যবস্থা নিতে পারেনি নির্বাচন কমিশন। দু’একটি ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বরাবর আবেদন করে চিঠি পাঠিয়ে দায় সেরেছে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসি সহিংসতা রোধে দায়িত্ব পালন না করে ক্ষমতা বাক্সবন্দি করে রাখে। প্রথম ধাপের থেকে শুরু করে ৫ম ধাপে আচরণবিধি লঙ্ঘন, কেন্দ্র দখল ও সহিংসতার অভিযোগে কয়েক হাজার অভিযোগ এলেও ইসি কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেয় নি। সরকার সমর্থিত প্রার্থীরা প্রকাশ্য জনসভায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সমর্থকরা ভোট দিতে গেলে আঙুলে কালির ছাপ দেখে দেখে আঙুল কেটে ফেলা হবে এবং ভোটের দিন লাশ হয়ে ফিরে এলে এর দায়িত্ব কেউ নেবে না- এমন হুমকি দিলেও ইসি সেই প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করেনি। এমনকি মন্ত্রী-এমপিরা প্রকাশ্যে নিজ দলের প্রার্থীদের জন্য প্রচারণা চালালেও ইসি তাদের সরাসরি সতর্ক না করে প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকারের কাছে নালিশ করেছে। সংসদ সদস্য, থানার ওসি সরকার দল সমর্থিত প্রার্থীর সভায় প্রকাশ্যে অবস্থান নেয়ার ছবি ও সংবাদ প্রচার হয়েছে। কিন্তু কমিশন এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। অথচ উপজেলা পরিষদ নির্বাচন আচরণবিধিমালা ২৬ এর (১) অনুযায়ী প্রার্থী বা তার নির্বাচনী এজেন্ট আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে কমিশন তাৎক্ষণিক তদন্তের নির্দেশ দিতে পারে। ২৬-এর (২)-এর উপ-বিধির (১) অনুযায়ী তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর কমিশন ওই প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করতে পারে। পুরো উপজেলা নির্বাচনেই ইসি তার ক্ষমতাকে ব্যবহার করেনি। সহিংসতা এড়াতে শুধুমাত্র কেন্দ্র বন্ধ ও দু’-চারটি চিঠি দিয়েই কাজ সেরেছে ইসি। প্রতি ধাপের উপজেলা নির্বাচনে পুলিশও ছিল বেপরোয়া। চতুর্থ ধাপের নির্বাচনের আগের রাতে পুলিশের এএসআই এমদাদের কাছে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হন মুন্সীগঞ্জের টিএনও ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার ড. এটিএম মাহাবুবুল করীম। এর আগে তৃতীয় ধাপের নির্বাচনেও বরিশালের হিজলায় সহকারী রিটার্নিং অফিসার জাহিদুল ইসলাম ওসিকে জাল ভোট দিতে বাধা দেয়ায় মারধরের শিকার হন। হিজলা উপজেলার ঘটনায় ওসিকে দুই মাসের জন্য বরখাস্ত করে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে চিঠি দেয় ইসি। সেই ওসিকে দুই মাসের জন্য বরখাস্ত করা হলেও তার বিরুদ্ধে এখনও মামলা দায়ের হয়নি। এএসআই এমদাদ এখনও বহাল তবিয়তে আছেন। তার বিরুদ্ধে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এ বিষয়ে ইসিও কোন পদক্ষেপ নেয়নি। অভিযোগ আমলে নিতে উদাসীন থাকলেও সরকারের নির্দেশে রিটার্নিং অফিসার ও প্রিজাইডিং অফিসার পরিবর্তন করতে কার্পণ্য করেনি নির্বাচন কমিশন। পরিকল্পনা মন্ত্রী আফম মোস্তফা কামাল (লোটাস কামাল) নিজে নির্বাচন কমিশনে এসে ২য় ধাপের নির্বাচনে তার নির্বাচনী এলাকা কুমিল্লার দুই উপজেলার রিটার্নিং অফিসার পরিবর্তন করার আবেদন করেন। তার আবেদনের প্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নেয় নির্বাচন কমিশন। তৃতীয় ধাপের নির্বাচনেও কয়েকটি উপজেলায় প্রিজাইডিং অফিসার বদল করা হয় ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত প্রার্থীদের আবেদনের প্রেক্ষিতে। চতুর্থ ধাপের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী পরিচালনা কমিটির সদস্য রিয়াজুল কবীর কাওসার ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবদুল মোবারকের কাছে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার ২১ জন প্রিজাইডিং অফিসারকে পরিবর্তন করার তালিকা দিয়ে যান। সে অনুযায়ী প্রিজাইডিং অফিসার পরিবর্তন করা হয়। প্রতি ধাপের নির্বাচনেই সরকারি দলের নেতাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে নির্বাচনী কর্মকর্তা রদবদল করা হয়। কিন্তু প্রার্থীদের অভিযোগ আমলে নেয়া হয়নি খুব একটা। পঞ্চম ধাপের নির্বাচনে স্থানীয় আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষ থেকে আর্জি জানানোর পর বরগুনা সদর ও আমতলী উপজেলায় ৫৯ জন প্রিজাইডিং অফিসার বদল করা হয়।
পঞ্চম ধাপের নির্বাচনে ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলায় ভোট শুরুর আগেই একটি কেন্দ্রে বাক্সভর্তি সিলমারা ব্যালট পাওয়া যায়। এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিজাইডিং অফিসারের কাছে অভিযোগ করা হলে তিনি ব্যালটের মুড়িগুলো জব্দ করেন। এরপর যথারীতি এ ভোটগ্রহণ হয়। বিষয়টি একজন নির্বাচন কমিশনারের কাছে টেলিফোনে অভিযোগ দেয়া হয়। তিনি এ বিষয়টি দেখার আশ্বাস দেন। কিন্তু যথারীতি ভোটগ্রহণ করা হয় ওই কেন্দ্রে। ভোট শুরুর আগেই কাস্ট হওয়া ভোটের বিষয়ে আর কিছু জানা যায়নি। এদিকে সাংবিধানিক ক্ষমতাপ্রাপ্ত ইসি নিজেদের দায় এড়াতে চেষ্টা করেছে বরাবর। নির্বাচনের পর ‘আলহামদুলিল্লাহ’, ‘মাশাআল্লাহ’ বলে নিজেদের অসহায়ত্বের চিত্র তুলে ধরেছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিশনাররা। পঞ্চম ধাপের নির্বাচনে জালিয়াতির উৎসবে শরিক হন নির্বাচনী কর্মকর্তা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোন কোন সদস্য। এসব খবর ও ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়। ্‌এর ফলে দেশের পুরো নির্বাচন ব্যবস্থাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। তারপরও নির্বাচন কমিশন এসব অপকর্মে দায়ী সরকারি কর্মচারীদের বিষয়ে কোন ব্যবস্থা নেয়নি। নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ মঙ্গলবার অভিযোগ আমলে না নেয়ার জন্য মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, মাঠ পর্যায় থেকে অভিযোগের প্রতিবেদন না পাওয়ার কারণেই অভিযোগ আমলে নিতে পারেনি ইসি। তবে এখন কেউ অভিযোগ করলে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে করতে হবে বলে জানান তিনি।
অভিযোগ আমলে না নেয়ার বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, কোন অভিযোগ আমলে না নেয়ার কারণেই সহিংসতাকারীরা সাহস পেয়েছে। ইসিতে কেউ অভিযোগ করলে তাৎক্ষণিক খতিয়ে দেখা এটা ইসি’র দায়িত্ব। কারণ নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। এখানে যেমন অভিযোগ করা প্রার্থীর অধিকার রয়েছে তেমনি অভিযোগ সঠিক কিনা তা-ও প্রার্থীকে ইসি’র জানাতে হবে। বিগত কমিশন সরাসরি ক্ষমতার ব্যবহার করেছে বলে ২০০৮ সালের নির্বাচনে মন্ত্রী-এমপিদের আচরণবিধি মেনে চলতে সতর্ক করেছিল। কিন্তু এই কমিশন পরোক্ষভাবে ক্ষমতার ব্যবহার করে বলেই মন্ত্রী-এমপিদের সরাসরি সতর্ক না করে প্রধানমন্ত্রী স্পিকারকে নালিশ করেছে।