কথা মানছেন না নেতারা থামানো যাচ্ছে না বিদ্রোহ

coxএম.শাহজাহান চৌধুরী  শাহীন, কক্সবাজার  : কক্সবাজার সদর, উখিয়া, টেকনাফ, রামু ও কুতুবদিয়া উপজেলার নির্বাচন আগামী ২৩ এবং ৩১ মার্চ অনুষ্ঠিত হবে। একাধিক বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী নিয়ে বিপাকে পড়েছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। এই কোন্দলের কারণে গত দুইটি উপজেলা নির্বাচনে হতাশ আওয়ামীলীগ। কক্সবাজার সদর, কুতুবদিয়া ,রামু , উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায়চেয়ারম্যান পদে বিএনপির পাশাপাশি আওয়ামী লীগের একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছে।

সম্প্রতি সম্পন্ন হওয়া নির্বাচনে বিদ্রোহের কারণে পেকুয়া উপজেলায় বিএনপির শেফাইয়েত আজিজ রাজু নির্বাচিত হন। মহেশখালীতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগে একাধিক বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী ছিল। তবে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হোসেন ইব্রাহিম নির্বাচিত হন। চকরিয়ায় আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী জাফর আলম ( বিএনঅনার্স এমএ ) নির্বাচিত হন বিপুল ভোটে।

তবে ক্ষমতাসীন দলের চেয়ে বিরোধী দলগুলো রয়েছে ভাল অবস্থানে। কক্সবাজার জেলায় গত দুই দফায় নির্বাচনী ফলাফলে একটু হতাশ আওয়ামী লীগ। তাই দলীয় কোন্দল মিটিয়ে তৃণমূলে আরও বেশি জয় পেতে চায় দলটি। এ লক্ষ্যে আওয়ামী লীগের ৭ জন সাংগঠনিক সম্পাদক তৎপর রয়েছেন। পরিস্থিতি নজরে রেখেছেন জেলা ও বিভাগের দায়িত্বে থাকা আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা। কিন্তু কথা মানছেন না নেতারা। থামনো যাচ্ছে না বিদ্রোহ।

কক্সবাজার সদর উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ও চার বার নির্বাচিত পৌরসভার চেয়ারম্যান নুরুল আবছার, কক্সবাজার সদর উপজেলায় আওয়ামীলীগ সমর্থিত প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আবু তালেব , বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নাসিমা বকুল থাকলেও তিনিশেষ পর্যন্ত মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিলে বিএনপির একক প্রার্থী সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি সুবেদার মেজর (অব) আবদুল মাবুদ ।

একই ভাবে ভাইস চেয়ারম্যান পদে আওয়ামীলীগে বিদ্রোহী প্রার্থী নেই এখানে।

বিএনপি মনোনীত একক প্রার্থী জেলা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক নেজাম উদ্দিন এবং বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ঈদগাঁও সাংগঠনিক উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম ।

উখিয়া উপজেলায় বিএনপি ঘোষিত চেয়ারম্যান প্রার্থী উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সরওয়ার জাহান চৌধুরী। তবে এই উখিয়া উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে বিএনপিতে বিদ্রোহী প্রার্থী নেই। তবে আওয়ামী লীগে রয়েছে একাধিক বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী। বিআরডিবি’র চেয়ারম্যান আওয়ামীলীগ সমর্থিত প্রার্থী হুমায়ুন কবির চৌধুরী মন্টু, আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী প্রার্থী উপজেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি আবুল মনসুর চৌধুরী , আওয়ামীলীগ নেতা আশরাফ জাহান কাজল ।

ভাইস চেয়ারম্যান পদেও বিএনপির একক প্রার্থী উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সুলতান মাহমুদ চৌধুরী । আওয়ামী লীগে একই অবস্থা। জেলা যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম , রাজাপালং ইউনিয়ন আলীগ সাধারণ সম্পাদক নুরুল আলম নুরু , উপজেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট জমির উদ্দিন, আওয়ামীলীগ নেতা সাদেক হোসেন খোকা।

টেকনাফ উপজেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি ও আওয়ামীলীগের একক প্রার্থী সাবেক সাংসদ অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী ও টেকনাফ সদর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী প্রার্থী জাফর আহমদ । বিএনপি মনোনীত একক প্রার্থী উপজেলা বিএনপির সভাপতি সরওয়ার কামাল চৌধুরী ও উপজেলা বিএনপির সাধারন সম্পাদক বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মোঃ আব্দুল্লাহ  ও আওয়ামী লীগ নেতা জাফর আহমদের ছেলে মোস্তাক আহমদ ।

এখানে ভাইস চেয়ারম্যান পদে আওয়ামীলীগে রয়েছে একাধিক ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী। বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান আওয়ামীলীগ নেতা মোঃ ইউনুচ বাঙ্গালী , উপজেলা কৃষকলীগ সভাপতি এবিএম আবুল হোসেন রাজু , আওয়ামী লীগ নেতা সোনা আলী , বিএনপি নেতা ওমর হাকিম , উপজেলা যুবদল সভাপতি রাশেদুল করিম মার্কিন।

একই ভাবে কুতুবদিয়ায় .আওয়ামীলীগের একক প্রার্থী শফিউল আলম, বিদ্রোহী প্রার্থী মনোয়ারুল ইসলাম মুকুল। রামু উপজেলায় রয়েছে । রামুতে আওয়ামী লীগথেকে সোহেল সরওয়ার কাজল ও  বিদ্রোহী প্রার্থী আবদুল মাবুদ।

এদিকে, পার্চ উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে উভয় দলের মধ্যে একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় দুই দলের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থীরাই আছেন অস্বস্তিতে।

এদিকে, কক্সবাজার সদরের চেয়ারম্যান প্রার্থীঘোষণার জন্য তৃণমুলেরভোট গ্রহণ করা হলেও তৎসময়ে ৪ জন আওয়ামীলী সমর্থিত প্রার্থী বিভিন্ন কারণে তৃণমলের ভোট থেকে সরে পড়েন। এছাড়া একক প্রার্থী নির্বাচনে শরীক দল গুলোরও কোন মতামত না নেয়ায় ‘শরিকদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের দূরত্ব বেড়ে যায়। ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদ ছাড়া বাকি দলগুলোকে কখনোই তেমন মূল্যায়ন করা হয়নি বলে অভিযোগ তাদের (জোটের অন্যান্য দল)। সদরের আওয়ামীলীগের একক প্রার্থী হিসেবে আবু তালেবকে ঘোষণা করা হলে শরীক দল ছাড়াও খোদ আওয়ামী গরনার লোকজনও বিগড়ে যায়। ফলে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী জনমানুষের নেতা নুরুল আবছারের পক্ষে আওয়ামীলীগ, যুবলীগ, ছাত্র লীগ, মহিলা লীগ, জাসদ, যুবজোট, ন্যাপ সহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন নুরুল আবছারের সাথে সংহতি প্রকাশ করেন। এছাড়া এসব দলেরনেতা কর্মীরা নুরুল আবছারকে আওয়ামীলীগের একক প্রার্থীঘোষণা করার জন্য আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় হাই কমান্ডে লিখিত আবেদনও করেছে। তা না হলে এদিক দিয়ে বিরোধী দলগুলো নিশ্চিন্ত থাকতে পারে। সদরের চেয়ারম্যান পদটি বিএনপি কিংবা জামায়াতের ঘরে চলে যাওয়ার আশংকা করেন তারা। একই ভাবে রামু, উখিয়া ওটেকনাফের একই অবস্থার কারণে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের ভরাডুবি হওয়ার শংকায় রয়েছে বেশীর ভাগনেতা কর্মী।

কাজেই যারা আওয়ামী লীগের সত্যিকার শুভাকাক্সক্ষী এবং আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে অবস্থান করছেন তাদেরকে এখন একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসতে হবে।

রাজনৈতিক বুদ্ধাদের মতে, কক্সবাজার জেলায় আওয়ামীলীগ হচ্ছে ‘অসংগঠিত দল । তৃণমূলের নানা কোন্দল নিয়ে ইতোপূর্বে উপজেলা নির্বাচনে খেসারত দিতে হয়েছে আওয়ামী লীগকে। সম্মেলন নেই এক যুগ ধরে। সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙ্গে পড়েছে বিভিন্ন উপজেলায়। এমপি- নেতাকর্মী দূরত্ব। কেন্দ্র ও জেলার নেতাদের সমন্বয়ের অভাবে বিদ্রোহী দমনে কড়া হুঙ্কারেও কাজ হয়নি। কেন্দ্রের শত চেষ্টাও পর্যবসিত হয়েছে প-শ্রমে।

কিছুতেই বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকাতে পারছে না আওয়ামী লীগ। অধিকাংশ স্থানেই আওয়ামী লীগের মুখোমুখি এখন আওয়ামী লীগই।

তাদের মতে, বাইরের শক্তির চেয়ে আওয়ামী লীগ পরিচয়ধারী নিজেরাই নিজেদের সবচেয়ে বড় শত্র“তে পরিণত হয়েছে। আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য কেউ এগিয়ে না এলেও আওয়ামী লীগ নিজেরাই নিজেদেরকে পথে নামানোর জন্য যথেষ্ট।

কয়েক জন সিনিয়র আওয়ামীলীগ নেতা জানান, আগে নিজেদের অবস্থান সু-সংহত করার পাশাপাশি জাতিকে একটি শক্তিশালী জাতিসত্ত¦া হিসেবে গঠনের লক্ষ্যে আগে নিজেদেরকে সকল বিবেদ-ব্যবধান ভুলে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। যারা সুবিধাভোগী এবং কেন্দ্রীয় কম্যান্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে, দলের আদর্শ পরিপন্থী কাজে লিপ্ত হয় এসব নামধারী আওয়ামী লীগকে শক্ত হাতে প্রতিহত করতে হবে।

তারা আরো বলেন, আওয়ামী লীগকে টিকে থাকতে হলে নিজেদেরকে আওয়ামী লীগের সত্যিকার আদর্শের উপর ঐক্যবদ্ধ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করার মত বড় আর কোন চ্যালেঞ্জ আওয়ামী লীগের সামনে নেই। সুতরাং আওয়ামী লীগকে অন্যান্য বিষয়ের চেয়ে গুরুত্বের তালিকায় ঐক্য এবং শৃঙ্খলাকে প্রাধান্য দিয়ে ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে হবে।

তা না হলে প্রান্তিকেও সহিংসতা বাড়ার আশংকা রয়েছে।

এক জন প্রবীণ আওয়ামী লীগনেতা অত্যন্ত আক্ষেপ করে বলেন, আওয়ামী লীগের মত সুপ্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী দল আজকে ক্ষমতার আসনে আসীন হয়েও প্রতিনিয়ত ক্ষমতাচ্যূত হওয়ার আতঙ্ক নিয়ে বেঁচে আছে।