নাটোরে জয়-পরাজয়ে প্রভাব ফেলতে পারে চেয়ারম্যান বাবু হত্যা

NATORE-13.03.14-1শেখ তোফাজ্জ্বল হোসাইন, নাটোর প্রতিনিধি  :
নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রচারণা ক্রমেই জমজমাট হয়ে উঠেছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৯ দলীয় জোট ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এ নির্বাচনকে অস্তিত্বের লড়াই হিসাবে নিয়েছেন। প্রার্থীদের বিরামহীন পদচারণায় সরগরম হয়ে উঠেছে উপজেলার প্রতিটি এলাকা। প্রতীক পাওয়ার সাথে সাথেই আগের চেয়ে প্রচারণায় আরো বেশী ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন প্রার্থীরা। চতুর্থধাপের এই নির্বাচনের জয়-পরাজয়ে বিএনপির উপজেলা চেয়ারম্যান সানাউল্লা নুর বাবুকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যার বিষয়টি ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সাধারন ভোটাররা। প্রার্থীরা নাওয়া-খাওয়া ভুলে ভোটারদের মন জয় করতে রাত-দিন মাঠে ব্যস্ত সময় পার করছেন। দুইজন চেয়ারম্যান, ছয়জন ভাইস চেয়ারম্যান ও তিনজন মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে গ্রাম-গঞ্জ, পাড়া-মহল্লা, হাট-বাজার আর শহর-বন্দর চষে বেড়াচ্ছেন। মোটর সাইকেল শোডাউন, মাইকিং, পোষ্টারিং, মিছিল-মিটিং, পথসভা ও কর্মীসভার পাশাপাশি ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ছুটে বেড়াচ্ছেন তারা। বড়াইগ্রাম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে উপজেলার দু’টি পৌরসভা ও সাতটি ইউনিয়নের মোট এক লাখ ৯০ হাজার ২৯০ জন ভোটার ৮১টি কেন্দ্রে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এবারের নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ১৯ দল ও আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী হওয়ায় হাড্ডা-হাড্ডি লড়াই হবে বলে সবার ধারনা। তবে আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী হলেও বাস্তবে তাতে খুব একটা ফল হবে বলে মনে করছেন না সাধারণ ভোটাররা। এর কারণ হিসেবে তারা বলছেন, তৃণমূল আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী ডাঃ সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারীকে হুমকির মুখে মনোনয়ন প্রত্যাহার করানো হয়েছে বলে উপজেলা জুড়ে জনশ্রুতি রয়েছে। তাই তার সমর্থকরা ভোট দেয়া নিয়ে বিভ্রান্তিতে রয়েছেন। এছাড়াও স্থানীয় রাজনীতির কারণে জাতীয় পার্টির একটি বড় অংশের ভোট আওয়ামী লীগ নাও পেতে পারেন বলে কারো কারো ধারনা। গোটা উপজেলায় বিএনপি, জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের মজবুত সাংগঠণিক অবস্থান রয়েছে। তবে এবিষয়টিকে মোটইে গুরুত্ব দিচ্ছেন না আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। সেদিকে বিবেচনায় আওয়ামী লীগের প্রার্থীর চেয়ে ১৯ দলের প্রার্থী রয়েছেন অনেকটাই সুবিধাজনক অবস্থানে। এই সুবিধাজনক অবস্থানে থেকে ১৯ দলের প্রার্থী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও বনপাড়া ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ একরামুল আলম তার ঘোড়া প্রতীক নিয়ে এবং আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিজানুর রহমান মিজান তার আনারস নিয়ে নির্বাচনী মাঠ সরগরম করে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। আওয়ামী লীগ ও ১৯ দল চেয়ারম্যান পদে একক প্রার্থী দিতে সক্ষম হওয়ায় জেলার মধ্যে বড়াইগ্রাম উপজেলাতেই সবচাইতে জমজমাট ভোটের লড়াই হবে বলে মনে করছেন ভোটাররা। সাবেক সংসদ সদস্য ও বনপাড়া পৌর সভার মেয়র অধ্যক্ষ একরামুল আলম ১৯ দলের চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে উপজেলার প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় এক নামে পরিচিত। এছাড়াও উপজেলার শীর্ষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসাবে সব এলাকাতেই তার ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। এদিকে, বিগত উপজেলা নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেও বনপাড়া পৌর বিএনপির সভাপতি সানাউল্লা নূর বাবু (৪১) বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছিলেন। কিছুদিন পর ২০১০ সালের ৮ অক্টোবর বনপাড়া বাজারে ক্ষমতাসীনরা তাকে প্রকাশ্যে পিটিেিয় হত্যা করেছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ভিডিও ফুটেজ দেখে বিচারের প্রতিশ্রুতি দিলেও আজ পর্যন্ত সেই বিচার শুরুই হয়নি। উপজেলার শান্তিপ্রিয় হাজার হাজার মানুষের হৃদয়ের সেই পুরনো ক্ষত এখনো শুকায়নি। চেয়ারম্যান প্রার্থী অধ্যক্ষ একরামুল আলমসহ ১৯ দলের তিন প্রার্থীর ব্যাপক বিজয়ের মাধ্যমে সে ক্ষতের খানিকটা উপশম লাভের সুযোগ এবার তারা হাতছাড়া করতে চাননা। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৯ দল তিনটি পদে একক প্রার্থী দিলেও আওয়ামী লীগ চেয়ারম্যান ছাড়া দুই ভাইস চেয়ারম্যান পদে একক প্রার্থী দিতে না পারাটাও তাদের ক্ষতির কারণ হতে পারে। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের কর্মী সমর্থকরা মনে করছেন তাদের সাত মনোনয়ন প্রত্যাশীর মধ্যে যে ভাবেই হোক একটা সমঝোতা করেই শেষ পর্যন্ত অ্যাডভোকেট মিজানকে একক প্রার্থী দেয়া হয়েছে। গত উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেয়া ছাত্রজীবন থেকেই সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িত থাকায় উপজেলার প্রতিটি প্রান্তে তার পরিচিতি রয়েছে। এছাড়া এবারের নির্বাচনে স্থানীয় এমপি সাবেক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আব্দুল কুদ্দুস তাকেই সমর্থন দিয়েছেন। ফলে এবার মিজানই বিজয়ী হবেন বলে মনে করছেন তারা। চেয়ারম্যান প্রার্থীর সাথে ১৯ দলের ভাইস চেয়ারম্যান পদে সার্বক্ষণিক প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন বনপাড়া পৌরসভার দুইবারের নির্বাচিত কাউন্সিলর জেলা জামায়াত নেতা সুবক্তা প্রভাষক আব্দুল হাকিম (চশমা)। এ ছাড়াও ভাইস চেয়ারম্যান পদে ভোটের লড়াইয়ে রয়েছেন জাতীয় পার্টির উপজেলা সাংগঠণিক সম্পাদক আবু সাঈদ (উড়োজাহাজ), মাঝগাঁও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রহমান (টিয়া পাখি), আওয়ামী লীগ নেতা হাশেম আলী মৃধা (টিউবওয়েল), বিএনপির বহিস্কৃত বিদ্রোহী প্রার্থী আব্দুল মুন্নাফ খান (তালা) এবং জাসদের উপজেলা সেক্রেটারী ডি এম রনি পারভেজ (বই) মাঠ-ঘাট চষে বেড়াচ্ছেন। এছাড়া মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে নতুন মুখ উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ন সম্পাদক শেখ ইয়াকুব আলী হীরার সহধর্মিনী মৌটুসী আক্তার মুক্তা (ফুটবল), সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মরহুম এশারত আলীর সহর্ধমিনী বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান মমতাজ এশারত (কলস) এবং ১৯ দলের একক প্রার্থী হেলেনা পারভীন (হাঁস) প্রতীক নিয়ে এবারের ভোট যুদ্ধে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। তবে শেষ পর্যন্ত কে হাসবেন বিজয়ের হাসি তা দেখার জন্য সবাইকে আগামী ২৩ মার্চ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে।