ছাগলের গলায় শাড়ীর আঁচল !

PIC-01বদরুদ্দোজা বুলু, পার্বতীপুর (দিনাজপুর) প্রতিনিধি :

আমার পাড়া পড়শী স্বজনেরা তোমাদের যাই বলে-‘মায়ের আচঁল’ দিয়ে দিও কাফন আমার মরণ হলে। মায়ের আঁচলের কোন দৃশ্য দেখলেই উপরের এ গানটির কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে শৈশবের কথা। আমার স্পষ্ট মনে আছে। আমার ছোট ভাই দুষ্ট প্রকৃতির ছিল। সে সময় দুস্টমি করার পর ‘মা’ আদর করে খাইয়ে দিয়ে মায়ের পরনের ‘শাড়ীর আঁচল’ দিয়ে ভাইটির মুখ মুছে দিতে দেখেছি। অনেক সময় চোখে পড়ে, এমনকি অনেকই দেখেছেন-একজন ‘মা’ তার ছেলেকে গোসল করিয়ে শাড়ীর আঁচল দিয়ে মাথার পানি মুছে দিতে। কখনও কখনও চোখে পড়ে স্ত্রীরা স্বামীর মুখে কোন কিছু লেগে থাকা শাড়ীর আঁচল দিয়ে মুছে দিতে। শুনেছি, ভাবি তার ননদকে বা ননদ ভাবিকে বলছে শাড়ীর আঁচল দিয়ে তোমার মনের মনুষকে বেঁধে রাখো ভাই-নইলে ছুটে দৌঁড় মারতে পারে। এরকম শাড়ীর আাঁচলের কথা অনেকেই জানেন বা দেখেছেন। কিন্তু ছবিতে এরকম দৃশ্য কেউ কখনো দেখেছেন কি ?

আমি দিনাজপুরের পার্বতীপুর রেল স্টেশনের রেলওয়ে পার্কে একটি দোকানে বসে একজনের জন্য অপেক্ষা করছি। ঠিক এসময় একটি মধ্যবয়সী এক মহিলা তার পরনের ‘শাড়ীর আঁচল’ ছাগলের গলায় বেঁধে ছাগলটি টেনে বাড়ীতে নিয়ে যাচ্ছে। চোখে পড়তেই দৃশ্যটি ক্যামেরা বন্দি করলাম। এরপর ওই মহিলাটির পিছু পিছু হাটতে থাকলাম। হঠাৎ একটি দোকান গিয়ে দাঁড়ালো ওই মহিলাটি। দোকান থেকে ওই ছাগলটির জন্য ভূষি (খাদ্য) ক্রয় করছে। এরপর ওই মহিলার সাথে কথা হয়। মহিলাটির নাম রিক্তা, বয়স ৪০ বছর। স্বামী আসাদুল (৪৩) একজন ভূমিহীন। বাড়ী পার্বতীপুর পৌর শহরের রেলওয়ের সাহেবপাড়া মহল্লায়। প্রায় ২০/২১ বছর ধরে এখানেই বসবাস করে আসছে। স্বামী আসাদুল উপজেলার বিভিন্ন হাটে হাটে মোরব্বা বিক্রি করে জীবকিা নির্বাহ করে। তাদের ঘরে ৫ মেয়ে ও ৩ ছেলে রয়েছে। বড় মেয়ে সাথী (২০) ঢাকায় গার্মেন্টেসে চাকরী করে। তার সাথে আরও ১ মেয়ে ও ২ ছেলে সেখানে চাকরী করে। সংসারের খরচে জন্য তারা মায়ের কাছে প্রতিমাসে টাকা পাঠায়।

রিক্তা জানায়, ওই দিন সকালে তার ছাগলটি হারিয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুজির প্রায় ৩ঘন্টা পর শহরের নতুন বাজার থেকে দুপুর ১২টায় ছাগলটি খুঁজে পায়। সঙ্গে দড়ি (রশি) ছিল না বা সঙ্গে দড়ি ক্রয়ের টাকাও ছিল না। তাই উপায় না পেয়ে রিক্তার পরনের শাড়ীর আঁচল দিয়ে ছাগলের গলায় বেঁধে বাড়ীতে নিয়ে যাচ্ছে। বাড়ীতে তার আরও বেশ কয়েকটি ছাগল আছে। ঘরে বসে থাকার চেয়ে ছাগল পালন করলেই সংসারের বাড়তি আয় হবে। এভেবেই রিক্তা তার স্বামী কষ্ট করে প্রথমে একটি ছাগল কিনে দেয় তাঁকে। বর্তমানে একটি ছাগল দিয়ে তার এখন প্রায় ৬টি ছাগল হয়েছে। তিনি বলেন, ঘরের স্ত্রীরা যদি স্বামীর উপার্জনের পাশাপাশি বাড়ীতে পশু-পাখী পালন করে তাহলে সবার সংসারেই সুখের আলোর মুখ দেখতে পাবে। সংসারে অভাব অনটন বা অসুখের সময় স্ত্রীয় আয় দিতে সংসার চালাতে কোন কষ্টই হবে না বলে রিক্তা মনে করেন। রিক্তার বাবার বাড়ী জয়পুরহাট জেলার আক্কেলপুর উপজেলার আওয়ালগাড়ী গ্রামে। স্বামী আসাদুলের বাড়ী নীলফামারী জেলার দারোয়ানী গ্রামে। বলা যেত পারে রিক্তার এখন সুখের সংসার।