সাঈদীর নাম শিকদার ছিল মর্মে রাষ্ট্রপক্ষ কোনো ডকুমেন্ট দিতে পারেনি : আইনজীবী

19678_Saidyবিডি রিপোর্ট 24 ডটকম : যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিল মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেছেন। মঙ্গলবার সকালে আসামিপক্ষে এস এম শাহজাহান যুক্তি পেশ শেষ করেন।

সকালে অ্যাডভোকেট শাহজাহান মাওলানা সাঈদীর নাম পূর্বে শিকদার থাকার অভিযোগ এবং তার যশোরে অবস্থান বা প্লি অব এলিবাই বিষয়ে যুক্তি পেশ করেন। প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ শুনানি গ্রহণ করেন।

শিকদার প্রসঙ্গ

মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ- আগে তার নাম দেলাওয়ার হোসেন শিকদার ছিল। স্বাধীনতার পরে তিনি শিকদার নাম পরিবর্তন করে সাঈদী নাম ধারণ করেন এবং এ নামেই বর্তমানে পরিচিত।

অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ দীর্ঘ সময় নিয়ে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে তদন্ত করেছে এবং অনেক কাগজপত্র জমা দিয়েছে তার বিষয়ে। কিন্তু মাওলানা সাঈদীর নাম আগে শিকদার ছিল- এ মর্মে একটি ডকুমেন্টও তারা দেখাতে পারেনি। বরং তাদের জমা দেয়া ডকুমেন্টেই উল্লেখ আছে মাওলানা সাঈদীর নাম সবসময়ই সাঈদী ছিল। রাষ্ট্রপক্ষ মাওলানা সাঈদীর ১৯৫৭ সালের দাখিল সনদ জমা দিয়েছে। সেখানে তার নাম দেলাওয়ার হোসেন সাঈদী লেখা রয়েছে। তার পিতার নামের শেষেও সাঈদী (মাওলানা ইউসুফ সাঈদী) লেখা রয়েছে। তাছাড়া রাষ্ট্রপক্ষ মাওলানা সাঈদীর আলিম সনদ জমা দিয়েছে এবং সেখানেও তার নামের শেষে সাঈদী লেখা রয়েছে। তার পিতার নামের শেষেও সাঈদী শব্দটি রয়েছে।

কাজেই রাষ্ট্রপক্ষের জমা দেয়া ডকুমেন্ট থেকেই প্রমাণিত মাওলানা সাঈদী কখনো শিকদার ছিলেন না। তিনি সবসময়ই সাঈদী। দেলোয়ার শিকদার নামে পিরোজপুরে একজন রাজাকার ছিল এবং স্বাধীনতার পর সে জনতার হাতে নিহত হয়। সেই দেলোয়ার  শিকদারের পিতার নাম ছিল রসুল শিকদার আর মাওলানা সাঈদীর পিতার নাম ইউসুফ শিকদার। কাজেই দুজন সম্পূর্ণ আলাদা ব্যক্তি।

অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের ১ নম্বর সাক্ষী মামলার বাদী মাহবুবুল আলম হাওলাদার এবং ৬ নম্বর সাক্ষী মানিক পসারী ২০০৯ সালে পিরোজপুরে যে মামলা করেছে তাতেও তারা আসামির নাম  উল্লেখ করেছে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী হিসেবে। সেখানে তাদের কেউ লেখেনি যে দেলোয়ার হোসেন শিকদার বর্তমানে সাঈদী।  তাছাড়া তদন্ত কর্মকর্তাও জেরায় স্বীকার করেছেন দেলোয়ার হোসেন শিকদার পিতা রসুল শিকদার নামে অন্য এক ব্যক্তি ছিল।

যশোরে অবস্থান প্রসঙ্গ

শিকদার বিষয়ে যুক্তি পেশের  আগে সকালে অ্যাডভোকেট শাহজাহান মাওলানা সাঈদীর যশোরে অবস্থান বিষয়ে যুক্তি পেশ করেন। তিনি বলেন, যশোরে অবস্থান বিষয়ে আসামী পক্ষে পাঁচজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছে। তাছাড়া রাষ্ট্রপক্ষের ১৫, ১৬ এবং ২৪ নম্বর সাক্ষীও যাশোরে অবস্থান বিষয়ে সমর্থন করেছে। কিন্তু এর কোনো কিছুই ট্রাইবুন্যনালের রায়ে বিবেচনায় নেয়া হয়নি।

এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ৫টি পুলিশ প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। তার একটিতে উল্লেখ আছে স্বাধীনতার পর মাওলানা সাঈদী খুলনা থাকেন।

অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা সত্য হলে তার পালিয়ে থাকার কথা ছিল। কিন্তু তিনি দেশের ভেতরেই প্রকাশ্যে স্বাভাবিক জীবনযাপন করেছেন।

অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, মুক্তিযুদ্ধের যে সময়ে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে পিরোজপুরে সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে সে সময় তিনি যশোরে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকেই তিনি যশোরে বাড়িভাড়া করে থাকতেন, সেখানে ওয়াজ করতেন।

অ্যাডভোকেট শাহজাহানকে যুক্তি উপস্থাপনে সহায়তা করেন ব্যারিস্টার তানভির আহমেদ আল আমিন। এসময় অন্যান্য আইনজীবীর মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নজরুল ইসলাম, গিয়াসউদ্দিন মিঠু, নুরুল আমিন মিয়ান, তারিকুল ইসলাম, মহিনুর রহমান, মতিয়ার রহমান প্রমুখ।

রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তিপেশ

দুপুর ১২টায় অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেন। তিনি ৬ নম্বর অভিযোগ পাড়েরহাট বাজারে লুটপাট বিষয়ে যুক্তি উপস্থান শুরু করেন। অ্যাটর্নি জেনারেল যুক্তি উপস্থাপনের শুরুতে প্রধান বিচারপতি মোজাম্মেল হোসেন বলেন, আপনিও প্রস্তুতি ছাড়াই এসেছেন? আপনি আমাদের সময় নষ্ট করছেন। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আমি পূর্ণ প্রস্ততি নিয়ে এসেছি।

তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে এপ্রিল মাসের শেষের দিকে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, দানেশ মোল্লা মোসলেম মাওলানা প্রমুখের নেতৃত্বে শান্তি কমিটি গঠিত হয় পাড়েরহাট। পরে তারাই রাজাকার বাহিনী গঠন করে ওখানে। ৬ নম্বর সাক্ষীও এ বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়েছে।

এসময় একজন বিচারপতি বলেন, আসামিপক্ষ দাবি করেছে মাওলানা সাঈদীর নাম আগে শিকদার ছিল- এ মর্মে আপনারা একটি ডকুমেন্টও দাখিল করতে পারেননি।

অ্যটর্নি জেনারেল বলেন, আমরা তার দাখিল ও আলিম সনদ জমা দিয়েছি। সেখানে তার নাম শুধু দেলোয়ার হোসেন ছিল। পরে সাঈদী নাম যোগ করেছে।

এসময় একজন বিচারপতি বলেন, সাঈদীর নাম শিকদার ছিল- এটি আপনারা ডকুমেন্ট দিয়ে দেখাতে পারেননি।

৬ নম্বর অভিযোগ প্রমাণের জন্য ১৯ (২) ধারায় যেসব সাক্ষীর  জবানবন্দী বিবেবচনা করা হয়েছে তাদের মধ্যে আবদুল লতিফ হাওলাদারের জবানবন্দী থেকে পড়ে শোনানোর সময়  একজন বিচারপতি প্রশ্ন করেন তাকে সাক্ষী হিসেবে কেন আনা হয়নি?

তখন অ্যাটর্নি জেনারেল  ট্রাইব্যুনাল আইনের ১৯.২ ধারা পড়ে বলেন, সাক্ষী মারা গেলে বা তাকে আনতে সময় সাপেক্ষ ব্যয়বহুল এবং অসম্ভব হলে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে প্রদত্ত তার জবানবন্দী সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা যায়।

তখন একজন বিচারপতি প্রশ্ন করেন পিরোজপুর থেকে ঢাকায় আসতে কতক্ষণ লাগে? পিরোজপুর তো বিদেশ নয়। আরেক বিচারপতি প্রশ্ন করেন, কেন তাকে হাজির করা অসম্ভব ছিল।

তখন ১৯(২) ধারায় ১৫ জনের জবানবন্দী গ্রহণ করে ট্রাইব্যুনাল যে আদেশ দিয়েছিল তা পড়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, সাক্ষীদের একটি মহল থেকে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। তারা বাড়িছাড়া। তাদের বাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না। আইউব আলী হাওলাদারের ছেলে মেয়েরা তদন্ত কর্মকর্তাকে অনুরোধ করেছে তার পিতাকে যেন সাক্ষ্য দিতে ঢাকায় না নেয়া হয়। বাড়িতে দুজন লোক এসে তাদের হুমকি দিয়ে গেছে ।

এ পর্যায়ে ১টা বেজে যায়। প্রধান বিচারপতি অ্যাটর্নি জেনারেলকে উদ্দেশ করে বলেন, আগামীকাল পড়ে দেখে আসবেন। না হলে আপনাকে বসিয়ে দেয়া হবে।