খাগড়াছড়িতে আদিবাসী-বাঙালি সংঘর্ষে আহত ৬, এলাকায় উত্তেজনা

khagracgari pic -2,25-02-2014খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি :
আদিবাসী গৃহবধু হত্যাকান্ডকে কেন্দ্র করে খাগড়াছড়ি সদরের কমলছড়ি গ্রামে মঙ্গলবার দুপুরে আদিবাসী ও বাঙালি সংঘর্ষে ৬ জন আহত হয়েছে। পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের কারণে সংঘর্ষ ব্যাপক আকার ধারণ করতে করেনি।

খাগড়াছড়ি সদরের কমলছড়ি গ্রামের আদিবাসী গৃহবধু সবিতা চাকমাকে (৩০) গত ১৫ ফেব্রুয়ারি গ্রামের অদূরে চর এলাকার সীমগাছের ঝোপের নীচ থেকে রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার সাথে ঐ চর এলাকা থেকে বালু উত্তোলনের কাজের নিয়োজিত ট্রাক্টর চালক ও শ্রমিকদের সন্দেহ করা হয়। এ ব্যাপারে থানায়ও মামলা দায়ের করা হয়েছে।

নিহত সবিতা চাকমার সাপ্তাহিক ক্রিয়া (ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার অনুষ্ঠান) অনুষ্ঠান মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ উপলক্ষ্যে কমলছড়ি গ্রামের লোকজন নিহতের বাড়িতে জড়ো হয়েছিলো।

অপরদিকে বাঙালি ছাত্র পরিষদ আদিবাসী গৃহবধুর হত্যার দায় বাঙালিদের দোষারোপ করার প্রতিবাদে খাগড়াছড়ি সদরে মানববন্ধন করে। মানববন্ধন অনুষ্ঠানে কমলছড়ি গ্রামের পার্শ্ববর্তী ভূয়াছড়ি গুচ্ছগ্রামের লোকজন বেশী অংশগ্রহণ করে। এই মানববন্ধন থেকে বাঙালিরা ফেরার পথে সংঘর্ষ বাঁধে। সংঘর্ষে ছয় জন আহত হয়েছেন। আহতরা হলেন অর্ণব চাকমা (৩৫), আনন্দ লাল চাকমা (৫৫), জাহাঙ্গীর আলম (৪২), আশরাফুল আলম রনি (১৮), মো: শামীম (১৮) ও সাইদুর রহমান (২৫)। এর মধ্যে অর্ণব চাকমা ও আনন্দ লাল চাকমা মাথায় আঘাত পান এবং তাদের আঘাতও গুরুতর।

কমলছড়ি গ্রামের অবপ্রাপ্ত সরকারী কমৃচারী বৃদ্ধ নিবারণ চাকমা (৭০) বলেন, আজ নিহত সবিতা চাকমার সাপ্তাহিক ক্রিয়া অনুষ্ঠান। এ উপলক্ষে গ্রামের লোকজন নিহতের বাড়িতে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন। দুপুর ১২টার দিকে তিনটি জীপগাড়ি নিয়ে বাঙালীরা শ্লোগান দিতে দিতে কমলছড়ি গ্রামের মধ্যে চলে আসে। তাদের শ্লোগান ছিল উত্তেজনাকর, উষ্কানীমূলক ও আপত্তিকর। এ অবস্থায় অনুষ্ঠানে আসা লোকজনও উত্তেজিত হয়ে মিছিলকারীদের উত্তেজনাকর শ্লোগান না দেওয়া জন্য কথাটা বলতে গাড়ি আটকিয়ে দেয়। পরে গ্রামের মুরুব্বীদের হস্তক্ষেপে মিছিলকারীরা চলে যায়। এরপর বাঙালীরা সংঘব্ধ হয়ে কমলছড়ি গ্রামে হামলা চালায় এতে দুই আদিবাসী আহত হন। তিনি আরো বলেন, বাঙালীরা সুপরিকল্পিত ভাবে সংঘর্ষ বাধানোর উদ্দেশ্যে গ্রামের মাঝখানে এসে উষ্কানীমূলক শ্লোগান দিচ্ছিল। অথচ মানববন্ধন কর্মসূচিতে যাওয়ার সময় তারা এই পথে আসেনি।

একই গ্রামের বাসিন্দা প্রিয় রঞ্জন খীসা অভিযোগ করেন, বাঙালীদের হামলায় যে দু’জন আদিবাসী আহত হন তারা পুলিশ সেনাবাহিনীর সন্মুখে বাঙালীদের হামলার শিকার হয়েছিলেন। এছাড়াও বাঙালীরা আদিবাসীদের রবিশষ্যে অনেক ক্ষেত নষ্ট করে দিয়েছে।

এদিকে সেটেলার বাঙ্গালী সেনাবাহিনীর তারা খেয়ে চলে যাওয়ার পর ভূয়াছড়ি চাকমা পাড়ায় পরিজ্ঞান চাকমার টমটম ভেঙে দিয়ে যায়।

মানববন্ধন শেষে বাড়ি ফেরার সময় জীপ গাড়িতে ছিলেন ভূয়াছড়ি গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রহিম (২৪) ও আব্দুল মতিন লিডার (৭০)। তারা বলেন, মানববন্ধন শেষে ফেরার পথে কমলছড়ি গ্রাম থেকে উপজাতিরা আমাদের গাড়ি প্রথমে আটকিয়ে দেয়। পরে ছেড়ে দেওয়া হলেও গাড়িতে ইট নিক্ষেপ করে। আমরা কমলছড়ি গ্রামের শ্মশান এলাকায় এসে জড়ো হই। সেখানেও উপজাতিরা আমাদের ওপর হামলা চালাতে উদ্যত হয়। এক প্রশ্নের জবাবে আব্দুর রহিম স্বীকার করেন, তারা মানববন্ধন কর্মসূচিতে যাওয়ার সময় কমলছড়ি গ্রামের পাশদিয়ে যাওয়া রাস্তা দিয়ে যাননি। ফেরার সময় তারা কমলছড়ি গ্রামের রাস্তাদিয়ে ফিরছিলেন।

কমলছড়ি গ্রামের আদিবাসী-বাঙালী সংঘর্ষের ঘটনার খবর চর্তুরদিকে ছড়িয়ে পড়লে আশেপাশের গ্রামের উভয় সম্প্রদায়ের লোকজন জড়ো হয়। উদ্ভুত পরিস্থিতির খবর পেয়ে প্রশাসন পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে প্রেরণ করে। এতে পরিস্থিতি শান্ত হলেও উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছিলো।

ঘটনার পর পর পরিস্থিতি সামাল দিতে কমলছড়ি গ্রামে মহালছড়ি সেনা জোনের কমান্ডার লে.কর্ণেল শহীদুল ইসলাম, খাগড়াছড়ি সদর সেনা জোনের কমান্ডার লে. কর্ণেল আলী রেজা, খাগড়াছড়ি পৌর মেয়র রফিকুল আলম উপস্থিত হন।

এরআগে সকাল ১১টায় খাগড়াছড়ি শহরের শাপলা চত্ত্বরে পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদ আদিবাসী নারী সবিতা চাকমার হত্যাকান্ডের দায় বাঙালীদের ওপর চাপানোর প্রতিবাদে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। এ মানববন্ধন কর্মসূচি চলার সময় বক্তারা অভিযোগ করে বলেন, তদন্ত না করে আদিবাসীদের হত্যাকান্ডের জন্য বাঙালীদের দায়ী করা হচ্ছে এবং কমলছড়ি গ্রাম দিয়ে কোন গাড়ি চলাচল করতে দেওয়া হচ্ছে না। বক্তারা হুমকী দিয়ে বলেন, যদি দুই ঘন্টার মধ্যে কমলছড়ি গ্রাম দিয়ে গাড়ি চলাচল করতে দেওয়া না হয় তাহলে এর পরিনাম ভয়াবহ হবে।

মানববন্ধন কর্মসূচিতে সংহতি বক্তব্য রাখেন খাগড়াছড়ি পৌরসভার মেয়র রফিকুল আলম, বাঙালি ছাত্র পরিষদের সভাপতি শাহাজুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক মাসুম রানা ও পানছড়ি উপজেলার বাঙালি ছাত্র পরিষদের নেতা মো. এরশাদ।

বাঙালি ছাত্র পরিষদের মানববন্ধন কর্মসূচি থেকেই এই হুমকী দেওয়ার এক ঘন্টার মধ্যেই কমলছড়ি গ্রামের আদিবাসী ও বাঙালিদের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে।

এদিকে এ ঘটনা আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন ইউপিডিএফ নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে